বজবজে মণ্ডলদের জমিদারি শুরু হয়েছিল মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে
বজবজ দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক সমৃদ্ধ জনপদ। অন্তরালে থাকা এই জায়গাটির ইতিহাস নিয়ে চর্চা খুব বেশি হয় না। এক সময়ে গঙ্গা-ভাগীরথী নদী ব্যান্ডেলের কাছে ত্রিবেণীতে ৩টি শাখায় ভাগ হয়ে যেত। দক্ষিণ পশ্চিম দিকে সপ্তগ্রামের পাশ দিয়ে বজবজ, ফলতা, ডায়মন্ডহারবার হয়ে সমুদ্রে মিশত সরস্বতী নদী। যমুনা নদী বয়ে যেত দক্ষিণ-পূর্ব দিয়ে। এই যমুনা অবশ্য উত্তর ভারত এবং বাংলাদেশের যমুনার থেকে আলাদা। সরস্বতী আর যমুনার মাঝখানে বয়ে যেত হুগলি নদী। এই হুগলি নদীর আদি খাতটিকে বলা হত আদিগঙ্গা। বজবজ এক সময়ে ছিল সুন্দরবনের অংশ। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতি বিজড়িত খুকি মার মন্দির, ১৮৯৭ সালে স্বামী বিবেকানন্দের স্মৃতিবাহক পুরোনো বজবজ স্টেশন তুলে ধরে বজবজের ঐতিহাসিক মাহাত্ম্যকে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বজবজ ঐতিহ্যকে ধারণ করে আছে বাওয়ালি রাজবাড়ি। কলকাতা থেকে ৩৩.৪ কিলোমিটার দূরে বজবজ রেলস্টেশন। স্টেশন থেকে রিক্সা করে কিছুটা পথ গেলেই দেখা মিলবে এই রাজবাড়ির।
আরও পড়ুন
রহস্যে ভরা হাজার বছরের পুরোনো জটার দেউল
নাম ‘বাওয়ালি’ হলেও শব্দটির তাৎপর্য খুব গভীর। কয়েকশো বছর আগে এই অঞ্চলটির নাম ছিল বাওয়ালি। এখানকার অধিবাসীদের বলা হত বাওল সম্প্রদায়। বন-জঙ্গলের ওপরই ছিল তাঁদের জীবন নির্ভরশীল। মাছ ধরা, মধু সংগ্রহ করা ছিল তাঁদের প্রধান জীবিকা। বাঘের দেবতা দক্ষিণ রায়, বনের দেবী বনবিবির পুজো করতেন তাঁরা।

মোটামুটি চারশ বছর আগের কথা, তখন রাজত্ব করতেন মুঘল সম্রাট আকবর। তাঁর প্রধান সেনাপতি ছিলেন দোর্দণ্ডপ্রতাপ মান সিংহ। মান সিংহের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছিলেন সেনা আধিকারিক বাসুদেব রাম রাই, যাঁর আদিনিবাস উত্তরপ্রদেশ এলাকা। সফলভাবে কৃষক বিদ্রোহ এবং দস্যুবৃত্তি দমন করার জন্য তাঁকে মুঘল প্রশাসন থেকে পুরস্কৃত করা হয়েছিল। সুদূর বাংলায় ৩ লক্ষ একর জমি এবং ‘মণ্ডল’ উপাধি। এইভাবেই বাওয়ালিতে মণ্ডল বংশের জমিদারি শুরু হল।
আরও পড়ুন
ক্যানিং-এ মাতিয়ে রাখছে মাতলা
এই জমিদার পরিবার ছিল কৃষ্ণের উপাসক, বাওয়ালিতে তাঁরা স্থাপনা করেছিলেন বেশ কয়েকটি মন্দির। সম্ভবত ১৭৭২ সালে গড়ে ওঠে শ্রী শ্রী রাধাকান্ত জিউর মন্দির। শ্রী শ্রী গোপীনাথ মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয় ১৭৯৯ সালে। এছাড়াও আছে, নবরত্ন মন্দির, দ্বাদশ শিবমন্দির – প্রত্যেকটি মন্দিরেই প্রাচীনতার ছাপ রয়েছে। মোটামুটি ২৫০ বছর আগে গড়ে উঠেছিল বাওয়ালি রাজবাড়ি। বিশালতাই সেই প্রাসাদের মূল আকর্ষণ। ঢোকার মুখে বড়ো সিঁড়ি, জমকালো থাম, প্রশস্ত উঠোন, বারান্দা যে কোনো মানুষের মনকে নিয়ে যাবে অন্য এক রূপকথার যুগে। সেই প্রাসাদ এখন হেরিটেজ রিসর্ট।