কৃত্রিম চুলেই নাকি রয়েছে অলৌকিক শক্তি
শাস্ত্রীয় বা ক্লাসিক নৃত্য থেকে লোকনৃত্যের শৈলী অনেকটাই আলাদা। গ্রামীন মানুষের দুঃখ, ভালোবাসা, অভিমান, যন্ত্রণার প্রকাশ ঘটে লোকনৃত্যে, সেখানে ছন্দের কঠোর বাঁধনের চেয়ে স্বতঃস্ফূর্ততা গুরুত্ব পায় অনেক বেশি। যে কোনো দেশেরই লোকনৃত্য গড়ে উঠেছে ধর্মবিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে। বাংলার লোকনৃত্যেও হিন্দু আর ইসলাম ধর্মের বিশেষ প্রভাব দেখা যায়। তবে গ্রাম বাংলায় যে কোনো অনুষ্ঠানে সব ধর্মের মানুষরাই সমানভাবে অংশগ্রহণ করে, ফলে, এখানকার সংস্কৃতি বরাবরই অসাম্প্রদায়িক। বাংলার লোকনৃত্যও তার ব্যতিক্রম নয়। দেখা যায়, বাংলার একেক অঞ্চলে একেক ধরনের লোকনৃত্য বিকশিত হয়েছে এবং জনপ্রিয় হয়েছে। পরে সেগুলোর খ্যাতি হয়তো দেশের গণ্ডী পেরিয়ে বিদেশেও পৌঁছেছে, তা সত্ত্বেও আঞ্চলিক সংস্কৃতি থেকে সেগুলোকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। ছৌ নাচ যেমন পুরুলিয়ার সম্পদ। আবার কোচবিহার, মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান, বীরভূম অঞ্চলের জনপ্রিয় নাচ হল টুসু।
আরও পড়ুন
বিষ্ণুপুরের ঐতিহ্য রাবণকাটা লোকনৃত্য
তেমনই হাজারি নাচের দেখা মেলে গাঙ্গেয় রাঢ় অঞ্চলে, বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ জেলায়। তবে ছৌ, টুসু, রায়বেশের মতো হাজারি নাচ এখনও খুব একটা প্রচারের আলোয় আসেনি। গাজনের সময় মুর্শিদাবাদের কয়েকটি গ্রামে, মূলত রাধারঘাট, ঘোষপাড়া, গোয়ালজানের মতো এলাকায় হাজারি নাচের দেখা মেলে। স্থানীয় যুবকরাই সাধারণত অংশ নেয় এই নাচের অনুষ্ঠানে। তাদের বয়স মোটামুটি ২০-২৫ থেকে শুরু করে ৪০-৪৫’এর মধ্যেই। এদের মধ্যে রবিদাস, রকি, সুব্রত হালদারের মতো কিছু শিল্পীদের বেশ নামডাক রয়েছে। চরকের আগের রাতে অভ্র, রং, চিটেগুড় দিয়ে সেজে এরা নৃত্য পরিবেশন করতে থাকে। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, অসুরের অলৌকিক শক্তি ভর করে নৃত্যশিল্পীদের ওপর। বড়ো করে কৃত্রিম চুল লাগাতে হয়, তাতেই নাকি ভর করে অসুর। তখন নাকি এরা হাতের কাটারি দিয়ে কেটেও দিতে পারে সামনের মানুষজনকে। এটা পুরোটাই আঞ্চলিক বিশ্বাস। তবে, বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা নিশ্চয়ই রয়েছে।
আরও পড়ুন
জল সইতে যাওয়ার গান
যাই হোক, তারপর লম্ফজম্ফ, খেলা চলতে থাকে। একে মারছে, ওকে মারছে – এরকম ভাব দেখায়, তবে সত্যি কাউকে মারে না। একটা সময়ে ওদের চুলগুলো খুলে নেওয়া হয়, আর মন্দিরে পোড়াকালীর পুজো শুরু হয়, ওই পুজো দিলেই নাকি ভর নেমে যায় আস্তে আস্তে। তখন স্বাভাবিক মেজাজে ফিরে আসে নৃত্যশিল্পীরা। আগে এদের সাজগোজ নিজেরাই করত। কিন্তু এখন প্রতিযোগিতার একটা ব্যাপার চলে এসেছে, তাই দেখা যাচ্ছে আলাদা শিল্পী এনে তাদের দিয়ে করানো হচ্ছে সাজগোজ এবং আঁকার কাজ।
তথ্য সহায়তা ও ছবি সৌজন্যে – পার্থ দে
বিশেষ কৃতজ্ঞতা স্বীকার – আমরা মনভাসি