কোচবিহারে শখের থিয়েটারের জায়গা এখন গ্রুপ থিয়েটার নিয়েছে
কোচবিহারের নাট্যচর্চার ইতিহাস বেশ পুরানো। জানা যায়, কোচবিহারের মহারাজা নরনারায়ণের আমলে (১৫৩৩-১৫৮৭) বৈষ্ণব ধর্মগুরু শংকরদেব কোচবিহারে নাটকের প্রবর্তন করেন। তারপর তোর্ষা, জলঢাকা দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। রাজতন্ত্রের অবসানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কোচবিহারের শখের থিয়েটারের জায়গা নিয়েছে গ্রুপ থিয়েটার। কয়েক দশক ধরে এই থিয়েটার মানুষকে আনন্দ দিয়ে এসেছে।
কোচবিহার শহরে প্রায় ২০টির মতো গ্রুপ থিয়েটার দল রয়েছে, কমবেশি সব দলই প্রতিবছর নিজস্ব প্রযোজনা করে দর্শকদের সামনে পরিবেশন করেন। এমনটা কয়েক বছর আগেও ছিল না, দু-তিনটি দল ছাড়া বাকি দলগুলি প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল, থিয়েটারে ছিল কর্মীর অভাব, তার সঙ্গে উপদলীয় কোন্দল, যার সরাসরি প্রভাব পরেছিল থিয়েটারের মানের এবং দর্শকের সংখ্যার উপর। এর থেকে বেরিয়ে এসে কোচবিহারের গ্রুপ থিয়েটার এখন উত্তরবঙ্গের মধ্যে নাট্যচর্চায় অন্যতম জায়গা দখল করেছে। দর্শকের সংখ্যাও বেড়েছে কয়েক গুণ, নতুন নতুন মুখ গ্রুপ থিয়েটারের দলগুলিতে ভিড় জমাচ্ছেন।

এমনটা কোনো জাদুবলে সম্ভব হয়নি। এর পেছনে রয়েছে গ্রুপ থিয়েটারগুলির উদ্যোগ। নিজেদের তাগিদে তারা তৈরি করেছেন সম্মিলিত নাট্যকর্মী মঞ্চ, কোচবিহারের সবকটি নাটকের দল এই মঞ্চের সদস্য। বিভিন্ন সময় যৌথভাবে নাট্যমেলা বা প্রতিযোগিতার আয়োজন করে এরা। নাট্যদলগুলি আগের থেকে তাদের ব্যবহারেও অনেক উদারতা দেখাচ্ছে। কোনো দলে অভিনেতার সমস্যা দেখা দিলে অন্য দল থেকে অভিনেতারা এসে সাহায্য করছে, কোনো দলের অনুষ্ঠানের টিকিট অন্যদল বিক্রি করে দিচ্ছে, এই সবের মাধ্যমে একটা সৌহাদ্যপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হয়েছে কোচবিহারের গ্রুপ থিয়েটারের জগতে। তবে অনেকেই মনে করেন এই সৌহাদ্য নিতান্তই বাহ্যিক, কারণ এখনো বিভিন্ন দল গুলির মধ্যে অল্পবিস্তর সমস্যা আছেই। একসময় গ্রুপ থিয়েটার ছিল নিতান্তই শখ অথবা অনেকের আদর্শগত দিক। বর্তমানে এই জায়গার পাশাপাশি অনেক নাট্যকর্মীদের একটা সামান্য হলেও রোজগারের জায়গা করে দিয়েছে গ্রুপ থিয়েটারগুলি। ‘ইন্দ্রায়ুধ’, ‘কম্পাস’, ‘আইপিএ’, ‘অনুভব’-এর মতো দলগুলি কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের প্রকল্পের মাধ্যমে কয়েকজন নাট্যকর্মীর ভাতা বেতন বাবদ টাকা পাচ্ছে। এছাড়াও নাট্য উৎসবের জন্য আর্থিক অনুদানও পাচ্ছেন তারা। এর ফলে নাটকের মান বৃদ্ধিতে অনেকটাই সফল হয়েছেন তারা। গ্রুপ থিয়েটারগুলিতে আগে যে অর্থের সমস্যা ছিল তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে।
কোচবিহার ‘কম্পাস’ নাট্যদলের পরিচালক দেবব্রত আচার্য্য মনে করেন, সাধারণ মানুষ টেলিভিশন সিরিয়ালের একঘেয়ে দাপাদাপিতে ক্লান্ত, তাই তারা ভালো নাটক দেখতে আসছেন, এছাড়াও কোনো দলের উৎসবের সময় অন্য দলগুলি কিছুটা হলেও টিকিট বিক্রি করে সাহায্য করে, তাতে দর্শক বেড়েছে নাটকের। যা সার্বিকভাবে কোচবিহারের নাটকের মানের উন্নয়নের কাজ করেছে।

তবে, কোচবিহার ‘ইন্দ্রায়ুধ’-এর পরিচালক তথা নাট্যকার দীপায়ন ভট্টাচার্য মনে করেন, নাটকের দর্শক আগেও ছিল, তবে বর্তমানে নাট্যকর্মীদের ঐকান্তিক চেষ্টায় এবং নাট্যদলগুলির নিয়মিত বাৎসরিক নাট্য উৎসব এর ফলে দর্শকের সংখ্যা বেড়েছে, মানুষের মনে ভালো নাটক দেখার অভ্যাস তৈরি হয়েছে।