আজ ৮ মে, ঠিক ৫০ বছর আগে এইদিন মুক্তি পাচ্ছে ‘গুগাবাবা’

ভূতের রাজা এবং একটি শাসন পরিকাঠামোর পর্যালোচনা

‘ভূতগুলি কিন্তু তাদের কিছু করল না। তারা গানবাজনা শুনে ভারি খুশি হয়ে এসেছে, তাদের রাজার ছেলের বিয়েতে গুপির আর বাঘার বায়না করতে। গান থামতে দেখে তারা নাকি সুরে বলল, ‘থামলি কেন বাপ? বাজা, বাজা, বাজা!’’

১৯১৫ সালে সন্দেশের পাতায় যখন প্রকাশিত হচ্ছে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ‘গুপি গাইন ও বাঘা বাইন’, সেই গল্পে ভূতের রাজার উল্লেখ কেবল এই একটি লাইনেই। ভূতেরা অবশ্য তাদের রাজাকে ‘গোদা’ বলে সম্বোধন করছে, তারই ‘ব্যাটার বে’তে যাওয়ার জন্য গুপি-বাঘাকে সাধাসাধি করছে তারা, এমনকি খুশি করার লোভও দেখাচ্ছে। ভূতের রাজার শরীরী, থুড়ি অশরীরী উপস্থিতি কিন্তু সেখানে নেই। কয়েক দশক পরে ‘ভূতের রাজা দিল বর’ নামক যে মাদকতা ভরিয়ে রাখবে আট থেকে আশি সকলকে, গল্প অনুযায়ী সেই তিনটি বরও কিন্তু ওই ভূতেরাই গুপি-বাঘাকে দিয়েছিল। উপেন্দ্রকিশোরের গল্পে তাই ভূতের রাজা কেবলমাত্র একটি নেপথ্য-চরিত্র, যাকে তেমন কোনও গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি গল্পকার।

চুয়ান্ন বছর পরে খোদ উপেন্দ্রকিশোরেরই নাতি সত্যজিৎ রায় যখন ‘গুগাবাবা’ বানাচ্ছেন, এই ভূতের রাজাই হয়ে উঠছেন ছবির একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, যাঁর আবির্ভাবে মোড় ঘুরছে ঘটনাক্রমের। পরিচালকের চিত্রনাট্যেও তাঁর উপস্থিতি দীর্ঘক্ষণের নয়। নাচ শুরুর আগে কুড়ি সেকেন্ড, এবং তারপরে বর দেওয়ার দৃশ্যে দেড় মিনিট, অর্থাৎ সব মিলিয়ে দু’মিনিটেরও কম। তার মধ্যেই প্রসাদ মুখার্জির চরিত্র চিত্রায়ন এবং স্বয়ং সত্যজিতের কণ্ঠদানের যুগলবন্দিতে ভারতীয় শিশু চলচ্চিত্রের ইতিহাসে পাকাপাকি জায়গা করে নিলেন প্রেত-সম্রাট।

এ তো গেল শৈল্পিক আঙ্গিক। কিন্তু ‘গুগাবাবা’ ছবির শুরু থেকে ঘটনা প্রবাহ যদি লক্ষ্য করা যায়, তাহলে অন্যরকম কিছু প্রতিচ্ছবিই যেন উঠে আসে দৃশ্যাবলির পরতে পরতে। গুপি গান গাইতে ভালোবাসে, কিন্তু গান শেখেনি, ফলে গলায় সুরও তৈরি হয়নি। কিন্তু গরিব গ্রামীণ সংসারে শিল্পসাধনার সুযোগ থাকে না, গুপিরও ছিল না। রাজাকে গান শোনাতে গিয়ে রাজার আদেশে গ্রাম থেকে বিতাড়িত হচ্ছে গুপি। এই যে রাজার পছন্দ না হওয়ায় একটি সরল গ্রাম্য তরুণকে ভিটেছাড়া করা হচ্ছে, এবং তা নিয়ে সমাজপতিদের উচ্ছ্বাসের শেষ নেই, তা কি কোনোভাবেই স্বৈরাচারী শাসনের ইঙ্গিতবাহী নয়?

বিতাড়িত হয়ে যে বনে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে গুপি, এবং বাঘাও, সেই বনের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে সিনেমার ইতিহাসে এই ছবির সর্বাধিক আলোচিত দৃশ্যটি। সাড়ে ছ’মিনিট ধরে ঘটে চলা ভূতেদের নাচ। সিনেমাপ্রেমীরা সকলেই জানেন, কীভাবে শ্যুট করা হয়েছিল, বা কতরকম বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হয়েছিল স্বপ্নালু দৃশ্যের পরিস্ফুটনে। ঘাটাম, মৃদঙ্গম, কাঞ্জিরা-সহ মোট চারটি দক্ষিণ ভারতীয় বাদ্যযন্ত্রের তালে গড়ে উঠছে বিভিন্ন শ্রেণির ভূতেদের নৃত্যশৈলী। ভারতীয় হিন্দু সমাজের চারটি শ্রেণিকে ধরা হচ্ছে পরলোক সমাজেও। কিন্তু গূঢ় অর্থটি আসলে পার্থক্যের জায়গায়। এখানে সর্বোচ্চ স্তরে থাকছে সভানর্তকগণ, যারা আসলে মধ্যবিত্ত ও মেহনতি সমাজের প্রতিনিধি, আর সর্বনিম্ন স্তরে থাকছে শাসকগোষ্ঠী ও ধর্মীয় নেতা। তবে শুধু এই দুই স্তরের পরিবর্তিত অবস্থানই নয়, সৈন্যদল ও বিদেশী বণিকশ্রেণির (বা অনুপ্রবেশকারী) অবস্থানও লক্ষণীয়। সৈন্য উঠে আসছে সাধারণ মধ্যবিত্ত সমাজ থেকেই, কিন্তু যেহেতু সে সরাসরিভাবে রাষ্ট্রীয় শাসনের একজন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, তাই তার অবস্থান কিছুটা শাসকের কাছাকাছি। বিদেশি শ্রেণির অবস্থানও বুঝিয়ে দিচ্ছে, দেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাদের কোনওরকম সম্পর্ক নেই, তারা অনেক বেশি দেশীয় শাসকের পাণিপ্রার্থী। এই যে সকলের মাথার উপরে সাধারণের অবস্থান, তা যেন সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোকেই চিহ্নিত করছে।

ছবি মুক্তি পাচ্ছে ৮ মে, ১৯৬৯। দু’বছর বাদেই জন্ম নেবে স্বাধীন বাংলাদেশ। অর্থাৎ, সেইসময়ে ছিন্নমূল নিরপরাধ মানুষের স্রোত অব্যাহত। ‘রাজা দিল দূর করে, ঠাঁই নেই ঠাঁই নেই/কোথা যাবি কী বা খাবি, জানা নেই জানা নেই জানা নেই।’ শিশু চলচ্চিত্রের চারিত্রিক হালকা মেজাজটিকে অক্ষুণ্ণ রেখেও গুপি-বাঘাও যে সর্বহারা উদ্বাস্তু, এই সার সত্যকে ভূতের রাজার মুখ দিয়ে প্রায় সরাসরিই বলিয়ে নিচ্ছেন সত্যজিৎ। তাই প্রথম বর হিসাবে তারা চাইছে খাওয়া-পরা। বেঁচে থাকার ন্যূনতম প্রয়োজনটুকু। আমরা যদি এই জায়গায় উপেন্দ্রকিশোরের গল্পের দিকে তাকাই, সেখানেও কিন্তু একই ভাবনা। উপেন্দ্রকিশোরের বহু গল্পেই আমরা ক্ষুধা-নিপীড়িত চরিত্রদের পেয়েছি। ব্রিটিশ-শাসনাধীন ভারতবর্ষে ঊনবিংশ শতকের শেষদিককার দুর্ভিক্ষ বা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন তীব্র অর্থসংকটের প্রেক্ষাপট মজুত।

গুগাবাবার প্রসঙ্গে ফিরি। বর চাওয়ার ক্রমটি যদি লক্ষ্য করি- প্রথম বরে তারা চাইছে খাওয়া-পরা, সেই সমস্যা মিটলে দ্বিতীয় বরে দেশভ্রমণের শৌখিনতা, এবং এই দুবারই রাজামশাইয়ের বাচনভঙ্গি মোটামুটি একই, খুব বেশি অসাধারণত্ব নেই। কিন্তু যেই মুহূর্তে দু’জনে বলছে তারা গানবাজনা করেই বেঁচে থাকতে চায়, সেখানে কিন্তু ঘটছে বাচনভঙ্গির অভাবনীয় পরিবর্তন। আশীর্বাদের আড়ালে গানের সুর, তাল, লয় প্রত্যেকটি অলঙ্কারকেই নিখুঁত করে তুলতে পরামর্শ দিচ্ছেন উচ্ছ্বসিত রাজামশাই। মনেপ্রাণে তাদের সাফল্যও কামনা করছেন। স্পষ্টতই, সংস্কৃতি-মনষ্ক রাজা এখানে হয়ে উঠছেন দুই অসহায় শিল্পীর প্রকৃত অভিভাবক, পৃষ্ঠপোষক।

৩০ জুলাই, ২০১৮। ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেন্স অফ ইন্ডিয়ায় ভারতীয় নথিভুক্তিকরণ। চল্লিশ লক্ষ সত্তর হাজার সাতশো সাতজন বাদ। উদ্বাস্তু-বিদ্বেষ, মুসলিম-বিদ্বেষ, বাঙালি-বিদ্বেষের জাঁতাকলে পড়ে যাওয়া কয়েকটা নাম। অসমে একের পর এক বাঙালির আত্মহত্যার খবর। হুঁশ নেই। ওদিকে শিক্ষাক্ষেত্রটিকে সুপরিকল্পিত ভাবে ধ্বংসের চেষ্টা চলছে বিগত কয়েক বছর ধরে, সংস্কৃতির অঙ্গনে পদলেহনকারী মধ্যমেধার ভিড়। খ্যানখেনে গলায় কেউ যদি একবার ভরসা দিয়ে বলে উঠত- ‘আমি আছি, আমি আছি…’

Developed by DXDasia