আজ উনিশে এপ্রিল, ঋতুপর্ণর প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবির ২৫ বছর

১৯৯৪, উনিশে এপ্রিল, ঋতুপর্ণ পালাচ্ছেন ঋতুপর্ণর থেকে

তারিখ কখনও মুছে যায় না। প্রতিদিন সকাল হলে ক্যালেন্ডার জানান দেয়, আজ যেন কত তারিখ! বড়ো বড়ো লালকালির দাগ দিয়ে রাখা তারিখ, ডায়েরিতে নোট করে রাখা তারিখ, মোবাইলে রিমাইন্ডার দিয়ে রাখা তারিখ- আমাদের ক্লান্ত করে না একটুও। এই তো সেদিন, আপনাকে একজন ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছিলেন ফেসবুকে। আপনি কোনোভাবে সেটি দেখতে পাননি। প্রায় একমাস পর সেই রিকুয়েস্ট অ্যাক্সেপ্ট করলেন। অতঃপর তাঁর প্রোফাইল ঘেঁটে জানতে পারলেন, সেই ব্যক্তি বর্তমানে আর জীবিত নেই। কয়েকদিন আগেই তিনি দেহ রেখেছেন। তাঁর ফেসবুক ওয়াল উপচে পড়ছে ‘রেস্ট ইন পিস’-এ। আপনি হতবাক হলেন, চমকে উঠলেন। ভাবলেন, এমনও হয়? যে মানুষটা একমাস আগেও বেঁচে ছিলেন, আপনাকে বন্ধুত্বের জন্য আবেদন পাঠিয়েছিলেন, তিনি আজ আর নেই। আপনার রিকুয়েস্ট অ্যাক্সেপ্ট করার নোটিফিকেশন তিনি দেখতে পেলেন না, অথচ ভার্চুয়াল বন্ধু হয়ে রইলেন দু’জনে।

আজ কোনো বিশেষ দিন নয়। আজ কি কোনো পুজো আছে? লক্ষ্মী, কালী কিংবা নারায়ণ? কোনো ব্রত উদযাপন? না না, এসব কিছুই নয় আজ। আজ একটি স্মরণযোগ্য দিন। যা সিনেপ্রেমী বাঙালি ভুলতে চাইলেও ভুলতে পারে না। হয়তো সকাল থেকে ফেসবুকের দেওয়াল ভিড় জমাবে এই স্মৃতিতে, স্ট্যাটাসে উপচে পড়বে একটি নাম এবং একটি তারিখ। নামটি ঋতুপর্ণ ঘোষ এবং তারিখটি উনিশে এপ্রিল। যে ছবি পাল্টে দিয়েছিল বাঙালির একলা চলার দুপুর। সিনেমার পর্দায় দগদগে রিলেশনশিপ। কিংবা ঘর-গেরস্থালির যাপন। ঋতুপর্ণ পাল্টে ফেলছেন রূপোলি পর্দার ম্যাজিক। দর্শক তাঁদের এতদিনের চিন্তাভাবনাকে আরেকটু শার্প আর যুক্তিযুক্ত করে ফেলছেন। দর্শকদের মধ্যমণি হয়ে উঠছেন ঋতুপর্ণ, হয়ে উঠছেন তথাকথিত ‘প্রান্তিক’ মানুষের আইডল।

‘উনিশে এপ্রিল’ ১৯৯৪ সালে মুক্তি পাচ্ছে। ঋতুপর্ণর প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি। ২০১৯ সালেই সেই ছবির নিঃশব্দ পঁচিশটা বছর কেটে যাচ্ছে। সরোজিনী চরিত্রে অপর্ণা সেন, অদিতি চরিত্রে দেবশ্রী রায়, সোমনাথ চরিত্রে দীপংকর দে, বেলা চরিত্রে চিত্রা সেন এবং সুদীপ চরিত্রে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। কয়েকটি চরিত্র, একটি বাড়িতে অধিকাংশ দৃশ্যের চিত্রায়ন এবং ঘটনার ঘনঘটা না থাকা সত্ত্বেও ছবিটি কখনো একঘেঁয়ে হয়ে ওঠে না বা শ্লথ গতির বলেও মনে হয় না। বরং দর্শক উন্মুখ হয়ে উপভোগ করে মা-মেয়ের সম্পর্কের টানাপোড়েন। ঋতুপর্ণ আজ আর জীবিত নেই, তাঁর ছবি জীবিত হয়ে আছে। জীবিত হয়ে আছে উনিশে এপ্রিল, একটি সম্পর্ক বোনার তারিখ। সেই সম্পর্ক মা-মেয়ের হতে পারে, পরিচালক-দর্শকের হতে পারে, ঋতুপর্ণ-ঋতুপর্ণর হতে পারে। ১৯৯৪, উনিশে এপ্রিল, ঋতুপর্ণ পালাচ্ছেন ঋতুপর্ণর থেকে। আর পালকের মতো পাশে রেখে দিচ্ছেন একটি তারিখ।

Developed by DXDasia