
বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ – পর্ব ৫
চতুর্থ পর্বের পর
একটু আগে জাহাজে ফিরে, প্রথমেই এক কাপ গরম দার্জিলিং চায়ে দুটো থিন এরারুট বিস্কুট মাহেন্দ্র মুহূর্ত অবধি ডুবিয়ে রেখে, খুব সন্তর্পনে মুখে পুরে, চিঠি লিখতে বসেছি। এই বিস্কুট চোবানোটা এক অদ্ভুত মুনশিয়ানার কাজ। কম চোবালে কেঠো কেঠো ঠ্যাকে, আবার বেশি চোবালে কাপের চায়ে নিমজ্জনের আশঙ্কা। এর ঠিক মাঝ বরাবর একেবারে ব্রাহ্ম-মুহূর্তে বিস্কুট চা থেকে তুলে ভারসাম্য রক্ষা করে মুখের ভেতর পুরতে বহু বছরের অনুশীলন লাগে।

চায়ে গরম
তা সেদিন যখন গ্রেহাউন্ড বাসে চেপে অরল্যান্ডো পৌঁছলাম তখন প্রায় দুপুর বারোটা বাজে। স্টেশনের বাইরে গুটিকতক ট্যাক্সি ছাড়া আর কোনো যানব্যবস্থা নেই। পথে আসতে আসতে বেশ কয়েকটা হোটেল চোখে পড়েছিল, যে রাস্তার তার নাম ছিল ইন্টারন্যাশনাল ড্রাইভ। ট্যাক্সি চালককে বললাম সেখানে নিয়ে যেতে। মিনিট দশেকের পরে যে টাকা খরচ করে বাসে চেপে টাম্পা থেকে অরল্যান্ডো এসেছিলাম তার সমমূল্যে ট্যাক্সি চেপে পৌঁছলাম বাস টার্মিনাস থেকে ইন্টারন্যাশনাল ড্রাইভের মোটেল ট্রাভেলজ।
এর আগে কখনও নিছক বেড়াতে গিয়ে একা কোনো হোটেলে উঠিনি। একটু সংকোচ বোধ হচ্ছিল। যাই হোক, দেখলাম পরিচ্ছন্ন মাঝারি মাপের হোটেল। একতলায় ঘর। সামনে ছোটো সুইমিংপুল। ঘরে দুটো খাট, একটা ছোটো ফ্রিজ, একটা মাইক্রোওয়েভ, মূল্যবান জিনিস রাখার জন্য একটা সেফ, একটা হেয়ার ড্রায়ার, একটা ইস্তিরি আর একটা টিভি রয়েছে।
বেশ হাসিমুখ সবুজ রঙের বাসগুলি। বাসে উঠলেই ২ ডলার লাগে৷ এক স্টপের জন্য যা লাগে, প্রথম স্টপ থেকে শেষ স্টপ পর্যন্ত বাসে বসে থাকলেও একই খরচ৷ খুবই দূরত্ব নিরপেক্ষ ভাড়া ব্যবস্থা৷
হোটেলের লবিতে যেসব পর্যটন বিষয়ক কাগজপত্র হাতে তুলে নিয়েছিলাম সেগুলো বিছানার ওপরে পেতে আগামী ৪৮ ঘণ্টার একটা ছক কষে ফেললাম। এটা একেবারে বিয়েবাড়ির পাকা খাইয়েদের স্ট্রাটেজি। খাদ্য তালিকার মধ্যে সবচেয়ে সরেশ পদগুলি বেছে নিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে সেগুলি গলাধঃকরণ। হাবিজাবি ভুসিমালে সময় নষ্ট করা চলবে না কোনো মতেই। অরল্যান্ডোয় এতগুলি দ্রষ্টব্য বিষয় রয়েছে যে খুবই নির্দয় সম্পাদক না হতে পারলে ভারি মুশকিল। আমার সময় সীমিত৷ ওদিকে আমাকে ছাড়াই জাহাজ ছেড়ে চলে যাবে আমি যদি ঠিক সময়ে না ফিরতে পারি।
ঠিক করলাম প্রথমে যাব ইউনিভার্সাল রিসর্টে (Universal Resort) যার দুটো ভাগ রয়েছে : আইল্যান্ডস অফ অ্যাডভেঞ্চার (Islands of Adventure) আর ইউনিভার্সাল স্টুডিও (Universal Studio)।

হাসিখুশি সবুজ বাসগুলি
জানতে পারলাম যে আমার হোটেলের সামনের বাসস্টপ থেকে মোটামুটি সব জায়গায় যাবার বাস ধরা যায়। বেশ হাসিমুখ সবুজ রঙের বাসগুলি। বাসে উঠলেই ২ ডলার লাগে৷ এক স্টপের জন্য যা লাগে, প্রথম স্টপ থেকে শেষ স্টপ পর্যন্ত বাসে বসে থাকলেও একই খরচ৷ খুবই দূরত্ব নিরপেক্ষ ভাড়া ব্যবস্থা৷ আমি একটা বাসে উঠে ২ ডলার খরচা করে পৌঁছে গেলাম ইউনিভার্সেল রিসর্টে। প্রথমেই বলে রাখি এই থিম পার্কগুলিতে ঢোকার টিকিট খুবই মহার্ঘ্য। তাই চেষ্টা করছিলাম অন্য খরচগুলিতে মিতব্যয়ী হতে। সেখানে পৌঁছে দেখি জনস্রোত একেবারে। বহু মানুষ এসেছে ছানাপোনা বগলে আনন্দের সন্ধানে।

ইউনিভার্সাল
আইল্যান্ডস অফ অ্যাডভেঞ্চার বলে যে থিম পার্কে প্রথম ঢুকলাম, সেখানে গিয়েই যে কথাটা প্রথম মনে পড়ল সেটা হল বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী। প্রচুর পশরা, প্রচুর বিক্রেতা, প্রচুরভাবে প্রচুর টাকা খরচ করার প্রলোভন চারিদিকে। নানারকম ইউনিভার্সাল স্টুডিওর চরিত্রের লোগো বসানো জামা জুতো থেকে আরম্ভ করে খাওয়া-দাওয়ার হরেক সম্ভার। এতরকম বিক্রিবাটার তোরজোরে প্রথমটা একটু হকচকিয়ে গিয়েছিলাম। বড়ো বেশি নিয়নের আলো, শব্দ আর বিজ্ঞাপন।
আরও পড়ুন: ভালোবাসার কথা বলতে এলাম : হলুদ বনে বনে
‘একলা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি
তোমার জন্য গলির কোণে
ভাবি আমার মুখ দেখাব
মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’
এক বিশাল টিভি স্ক্রিনে স্পিলবার্গ স্বয়ং আমাদের এই অনুরোধ জানালেন। আমরা তখন সেই সিনেমায় দেখা ম্যাজিক সাইকেলের মতো একটা সাইকেলে উঠে পড়লাম। একে একে ধীরে ধীরে আমাদের সাইকেল এক বিশাল মহাকাশের দিকে হাওয়ায় ভেসে চলল যেখান থেকে পৃথিবী ও তার সংশ্লিষ্ট দুঃখ-কষ্টদের খুবই ক্ষুদ্র মনে হয়।
ভিড়ভাট্টায় খানিক ঘোরাঘুরি করে ঢুকে পড়লাম পাশে লাগোয়া ইউনিভার্সাল স্টুডিওর চত্বরে। পুরো এলাকাটা পরিচিত সিনেমার সেটের আদলে তৈরি। মনে হচ্ছিলো কোনো পুরোনো শহরের সদর রাস্তায় এসে পড়েছি যেন। দোকানে নানারকম পণ্যদ্রব্য সাজানো। কেক, পেস্ট্রি, জামাকাপড়… যা যা পছন্দ কিনে নাও, কিনে নাও, কিনে নাও। যে যে সিনেমা অবলম্বন করে বিশেষ বিশেষ এলাকা সাজানো হয়েছে, তারা হল জস (Jaws) টুইস্টার (Twister) শ্রেক (Shrek) মেন ইন ব্ল্যাক (Men in Black) ইত্যাদি৷ আমি পৌঁছে গেলাম আমার পছন্দের সিনেমার সেটে — ই.টি. (E.T.)।

ই.টি. অ্যাডভেঞ্চার

মহাকাশ ভ্রমণ
সেটের চৌহদ্দির ভেতরে ঢুকতেই ঘোষণা শোনা গেল যে ই.টি-র নাকি ভীষণ বিপদ। মহাকাশে ওর গ্রহ ধ্বংসের মুখোমুখি। আমাদের ওপর দায়িত্ব পড়ল যে আমরা যেন ই.টি-কে ওর গ্রহে পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করি যাতে ও জাদুস্পর্শে গ্রহকে বিপদমুক্ত করতে পারে। এক বিশাল টিভি স্ক্রিনে স্পিলবার্গ (Spielberg) স্বয়ং আমাদের এই অনুরোধ জানালেন। আমরা তখন সেই সিনেমায় দেখা ম্যাজিক সাইকেলের মতো একটা সাইকেলে উঠে পড়লাম। একে একে ধীরে ধীরে আমাদের সাইকেল এক বিশাল মহাকাশের দিকে হাওয়ায় ভেসে চলল যেখান থেকে পৃথিবী ও তার সংশ্লিষ্ট দুঃখ-কষ্টদের খুবই ক্ষুদ্র মনে হয়। অন্ধকার মহাকাশে সেই অদ্ভুত আলো, অন্ধকার আর আওয়াজের ভেতর দিয়ে আমরা ই.টি-র সাথে ম্যাজিক সাইকেলে চড়ে এক বিশাল চাঁদের সামনে দিয়ে অনেকটা পথ অতিক্রম করে ওকে পৌঁছে দিলাম ওর গন্তব্যস্থলে। চমৎকার লাগলো আলো-আঁধারিতে অনেক বছর আগে দেখা প্রিয় সিনেমার স্মৃতি রোমন্থন।

সুইট টোমাটোস
সবকিছু দেখে শুনে আবার দু-ডলার খরচ করে যখন ইন্টারন্যাশনাল ড্রাইভে ফিরলাম তখন বেশ একটা খিদে খিদে ভাব। দেখলাম হোটেলের কাছে একটা রেস্তোরাঁ আছে যার নাম সুইট টোমাটোস (Sweet Tomatoes)। নামে আকৃষ্ট হয়ে দোকানে ঢুকে দেখি সেটা একটা পেট চুক্তি স্যুপ আর স্যালাডের দোকান। ৭ ডলার খরচ করলে যত খুশি স্যুপ আর স্যালাড খাওয়া যায়। স্যালাড বলতে শুধু পেঁয়াজ, লেবু, লঙ্কা নয়… রয়েছে নানা জাতের লেটুস, টমেটো, কিসমিস, ডিম সেদ্ধ, মুরগি সেদ্ধ, চিজ, পাস্তা, ফল ইত্যাদি ইত্যাদি। হরেক রকম সুস্বাদু স্যুপের পাশে তৈরি হচ্ছে গরম রসুন দেওয়া পাউরুটি। সারাদিন বাস জার্নি আর হাঁটাহাঁটির পর গরম স্যুপ খেয়ে হাড়ে বাতাস লাগলো যেন। এছাড়া নানারকম মিষ্টিমাষ্টা ছিল। খুকখুকে কাশিকে মর্যাদা দিয়ে আইসক্রিম উপেক্ষা করে যেটা খেলাম সেটা হল গরম আপেল কবলার৷ টকমিষ্টি গরম বেকড আপেলের ওপরে সুস্বাদু মিষ্টি ক্রাস্ট সবে আভেন থেকে বেরিয়েছে দারচিনির গন্ধ ছড়িয়ে। আর যায় কোথা!

আপেল কবলার
এরপর সারাদিনের শেষে মোটেল ট্রাভেলজে ফেরা। একতলায় ঘর। সামনে ছোটো সুইমিংপুল। ঘরে দুটো খাট, একটা ছোটো ফ্রিজ, একটা মাইক্রোওয়েভ, মূল্যবান জিনিস রাখার জন্য একটা সেফ, একটা হেয়ার ড্রায়ার, একটা ইস্তিরি আর একটা টিভি। হাঁটুর মালাইচাকিকে অবশেষে রিটায়ার করিয়ে বিছানায় শুয়ে, এক মায়াবী সাইকেলে চেপে, রুপোর থালার মতো গোল চাঁদের সামনে দিয়ে উড়ে যাওয়া…
‘মুছে নিতে চায় তার জীবনের শেষ অপমান
ভাষাহীন শরীরের উড়ে যাওয়া ম্লান ইশারাতে
বৃষ্টি হয়েছিল বুকে সেদিন অনন্ত মধ্যরাতে’
ক্রমশ…
*বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ করেছেন আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস মেরিটাইম অ্যাকাডেমির অধ্যাপিকা মধুবাণী ঘোষ। অবিশ্বাস্য সেই ভ্রমণ কাহিনি ধারাবাহিকভাবে প্রতি সোমবার বেলা ১২টায় প্রকাশিত হবে বঙ্গদর্শনে। আগের পর্বগুলি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।

