আমাদের মুখ আমাদের পুজো : ছকভাঙা থিম সোনাগাছির দুর্গাপুজোয়

দুর্বার মহিলা দুর্গোৎসব কমিটির ১১তম বর্ষ

কটা সিনেমার দৃশ্য। জমিদার বাড়িতে দুর্গাপুজোর আয়োজন করা হয়েছে। চৌধুরীগিন্নি পার্বতী দুর্গাপুজোর মাটি সংগ্রহের জন্য যৌনপল্লিতে যান। সেখানে চন্দ্রমুখীর সঙ্গে আলাপ হয় তাঁর। চন্দ্রমুখীকে তাঁর বাড়ির পুজোয় আমন্ত্রণ জানান তিনি। এরপর চন্দ্রমুখীর পরিচয় লুকিয়ে রেখে চৌধুরীগিন্নি তাঁকে পুজোর অনুষ্ঠানে জুড়ে নেন। কিন্তু সমাজে চাপা থাকে না চন্দ্রমুখীর আসল পরিচয়। শুরু হয় গুঞ্জন, নিন্দার ঝড়। সিনেমার নাম ‘দেবদাস’। পরিচালক সঞ্জয় লীলা বনশালী।

এ দৃশ্য শুধু সিনেমা বা সাহিত্যের প্রেক্ষাপটের সমাজ নয়, বাস্তবের সমাজও বটে। তাই তো অতীতে এশিয়ার সর্ববৃহৎ যৌনপল্লি সোনাগাছি-তে একটা সময় উৎসবের আনন্দে অন্ধকারে থাকত কতগুলি মুখ। এমনকি পরবর্তী কালে যৌনকর্মীদের সংগঠন দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি যখন দুর্গাপুজো শুরুর উদ্যোগ নেয়, সমাজ তা মেনে নেয়নি। অনেক বিরোধিতা শুরু হয়েছিল। তারপর রীতিমতো আইনি ও সামাজিক লড়াই করে মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশ নিয়ে শুরু হয়েছিল সেই পুজো। তারপর সময় কেটেছে স্রোতের মতো। যাঁদের একটা সময় পুজো দেখা, মণ্ডপে প্রবেশ, অঞ্জলি দেওয়া বা সিঁদুর খেলার অধিকার ছিল না, তাঁরাই এখন একটা আস্ত পুজোর আয়োজক, সংগঠক। রাস্তায় মণ্ডপ বেঁধে আর পাঁচটা সাধারণ পুজোর মতো করেই হইহই করে চলে পুজোর কয়েকটা দিন। ভোগ রান্না, অঞ্জলি দান, মঞ্চ বেঁধে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠেন সোনাগাছি চত্বরের প্রমীলারা।

এবার দুর্বার মহিলা দুর্গোৎসব কমিটি ১১তম বর্ষে পুজোর থিম করেছে, আমরাই আমাদের পুজোর মুখ। এ প্রসঙ্গে দুর্বারের সভানেত্রী বিশাখা লস্কর বলেন, “কলকাতা শহরে অনেক পুজো হয়। সেগুলোর প্রচারও হয়। পুজোর কয়েক মাস আগে থেকেই শহরজুড়ে পোস্টার-ব্যানার সাজিয়ে পুজোর প্রচার চলে। এবার মনে হল, আমাদেরও পোস্টার ব্যানার দিয়ে প্রচার করা উচিত। আমাদের মুখ, আমাদের পুজো, এ বছর আমাদের এটাই থিম।”

এমনিতে কুমোরটুলিতে প্রতিমা তৈরির ঢের কাজ বাকি থাকে এই সময়টাতে। তাও কুমোরটুলির আনাচেকানাচে সেলফি স্টিক বা ক্যামেরা হাতে নিয়ে বহু মানুষ দেখা যায়। এবার তাঁদের মতো দুর্বার বাহিনীর ফটোশ্যুট দেখা গেল কুমোরটুলিতে। পুজো পাবলিসিটির এ এক নয়াপন্থা।

কিন্তু এবার এমন ছকভাঙা থিমেরই বা দরকার হল কেন? আসলে সময় অনেক এগিয়ে গেলেও সমাজের ভাবনা চিন্তা বেশি এগোয়নি। পুজোর পোস্টারে অনেক জায়গাতেই ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হিসেবে দেখা যায় তারকাদের ছবি। দুর্বার সদস্যদেরও সেরকম করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু কারো তাতে সম্মতি মেলেনি। তাই নিজেরাই এগিয়ে আসেন। এটা একধরনের প্রতিবাদই।

দুর্বারের বিশাখা লস্কর, চম্পা মিত্র, বাসন্তী বিশ্বাস, রাফিজা বিবিরা মুর্শিদাবাদ সিল্ক, শান্তিনিকেতনী কাঁথা স্টিচ ইত্যাদি শাড়িতে সেজে, নিজেদের অর্ডার দেওয়া প্রতিমায় মাটি ছুঁইয়ে ফটোশ্যুট করেন। সহযোগিতায় ছিল সোনাঝুরি হাট প্রকল্প। সংস্থার তরফে রাজর্ষি দাস বলেন, “সোনাঝুরি হাট এই ফটোশ্যুটের জন্য আমাদের শিল্পী, কারিগরদের হাতে তৈরি জুয়েলারি এবং শাড়ি দিয়ে সাহায্য করেছে।” প্রসঙ্গত দুর্বারের মহিলাদের সঙ্গে ২০১৭ সাল থেকে এই সংস্থাটি যুক্ত। প্রায় আড়াই হাজারের বেশি কারিগর ও তাঁতশিল্পী এই সংস্থার সঙ্গে জড়িয়ে।

মৃন্ময়ী জননীর সঙ্গে ‘আমাদের মুখ, আমাদের পুজো’ থিমে দুর্বারের মহিলাদের ছকভাঙা ফটোশ্যুটের ক্ষণ কলকাতার ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকল।

প্রতিবছরই দুর্বারের তরফে থিম করে পুজো হয়। পরিবেশ রক্ষার বার্তা থেকে নিজেদের প্রতিবাদ- সব বিষয় নিয়েই তাঁরা থিম করেন। সেই থিমে পরিষ্কার করে বলা থাকে তাঁদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের কাহিনি।

কিন্তু এবার এমন ছকভাঙা থিমেরই বা দরকার হল কেন? আসলে সময় অনেক এগিয়ে গেলেও সমাজের ভাবনা চিন্তা বেশি এগোয়নি। পুজোর পোস্টারে অনেক জায়গাতেই ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হিসেবে দেখা যায় তারকাদের ছবি। দুর্বার সদস্যদেরও সেরকম করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু কারো তাতে সম্মতি মেলেনি। তাই নিজেরাই এগিয়ে আসেন। এটা একধরনের প্রতিবাদই। শহর জুড়ে ফ্লেক্স, পোস্টারে দুর্বারের দুর্গাদের দেখা মিলেছে। গত ৩০ অগাস্ট দুর্বার প্রমীলাবাহিনী বাংলার শ্রেষ্ঠ উৎসবের আনুষ্ঠানিক খুঁটিপুজো করে। এতে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের শিশু ও নারী কল্যাণ সমিতির মন্ত্রী শশী পাঁজা, বিধায়ক মদন মিত্র-সহ আরও অনেকে। শশী পাঁজা বলেন, “দুর্বারের দীর্ঘদিনের এই লড়াইকে কুর্নিশ জানাই।” বাস্তবিকই দুর্বারের লড়াই অপ্রতিরোধ্য। এ বছর দুর্বার ২৮ বছরে পড়ল। এর মধ্যে এই সংগঠন হারিয়েছে প্রতিষ্ঠাতা ডঃ স্মরজিৎ জানা এবং পুজোকমিটির সম্পাদক কাজল বসুকে। লকডাউন, করোনার মতো পরিস্থিতি সামলে দুর্বারের দুর্গাপুজো আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠতে চলেছে।

শারদোৎসবে দুর্বার দুর্গোৎসব কমিটিকে শুভেচ্ছা জানান বিধায়ক মদন মিত্র। তিনি বলেন, “দুর্বারের খুঁটি পুজো মানেই বাংলার দুর্গা পুজো শুরু।”

Developed by DXDasia