১৯৬৮ সালে জন্মসূত্রে যিনি ছিলেন মহান মিত্র, তিনি এখন সবার কাছে মহান মহারাজ
ধর্ম ও বিজ্ঞানকে কি পাশাপাশি রাখা সম্ভব? মুম্বইয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ-এর অধ্যাপক মহারাজের মতে, “আমার জীবনে এই দুই-এর মধ্যে কোনও অসঙ্গতি নেই।” তাঁর নাম মহান মহারাজ। গণিতের যুগান্তকারী বহু ধারণার উৎসভূমি যে ভারত, সেই ভারতই একুশ শতকের বিশ্বকে উপহার দিল গণিতের আকাশে আরেকটি নক্ষত্র। বিমূর্ত গণিতের দুরূহ রহস্যে মজে আছেন গেরুয়াবসন ব্যতিক্রমী সন্ন্যাসী মহান মহারাজ।
অগাস্ট, ২০১০। হায়দ্রাবাদ শহর। ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেস অব ম্যাথমেটিশিয়ানস। চার বছর অন্তর গণিতজ্ঞদের বিশ্বসম্মেলন। যা উদ্বোধন করেন আয়োজক দেশের রাষ্ট্রপ্রধান। তিন বা চার জন নবীন গণিতজ্ঞের হাতে তিনি তুলে দেন সেরা শিরোপা। ফিল্ডস মেডেল। ‘গণিতের নোবেল’। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সাক্ষী কয়েক হাজার গণিতজ্ঞ। রাজসূয় যজ্ঞ। ন’দিন ব্যাপী সম্মেলনে পৃথিবীর রথী-মহারথীদের ভিড়ে এক ভারতীয়ের দিকে নজর পড়ল ডেলিগেটবৃন্দের। কারণ দু’টি। প্রথম অবশ্যই তাঁর বেশভূষা। তিনি সন্ন্যাসী। গেরুয়াবসন। যে ভারত একদা ছিল গণিতচর্চার পীঠস্থান, যার উর্বর ভূমিতে জন্মেছিল শূন্য বা ‘জিরো’-র মতো যুগান্তকারী ধারণা, সে দেশ গণিতশাস্ত্রকে একবিংশ শতাব্দীতে উপহার দিচ্ছে এক জন ‘স্টার’। তিনি ওই গেরুয়াবসন সন্ন্যাসী।
নাম স্বামী বিদ্যানাথানন্দ। নাহ্, সন্ন্যাস-নামে তেমন পরিচিত নন ওই গণিতজ্ঞ। ১৯৬৮ সালে জন্মসূত্রে যিনি ছিলেন মহান মিত্র, তিনি এখন সবার কাছে মহান মহারাজ। বেলুড়ে রামকৃষ্ণ মিশন বিবেকানন্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের পর এখন তাঁর স্থায়ী ঠিকানা মুম্বইয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ।
ক্লাস টেন এবং টুয়েলভ সেন্ট জেভিয়ার্সে। আইআইটি এনট্রান্স। র্যাঙ্ক ৬৭। কানপুর আইআইটি-তে ভর্তি ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ। কিন্তু, মহান যে স্কুলেই ভালোবেসে ফেলেছেন এক বিষয়। গণিত। তাঁর পড়া শেষ বহু গণিতজ্ঞের জীবনী। ব্রিটিশ গণিতজ্ঞ গডফ্রে হ্যারল্ড হার্ডি-র লেখা ‘আ ম্যাথমেটিশিয়ান’স অ্যাপোলজি’। থার্ড সেমেস্টারে ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং অসহ্য মনে হল মহানের। কারা যেন বলেছিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়েও গণিত আছে। তা আছে, তবে তাতে মন ভরে না যে।
থার্ড সেমেস্টারের আগেই হঠাৎই মহান ঠিক করলেন ইঞ্জিনিয়ারিং তাঁর বিষয় নয়। শুরু করলেন কানপুর আইআইটি-তেই গণিত নিয়ে পড়াশুনা। ১৯৯২। কানপুর আইআইটি থেকে গণিতে এমএসসি। তার পর পিএইচ ডি করতে বার্কলে শহরে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিষয় জ্যামিতি। ১৯৯৭ সালে পিএইচ ডি।
বিদেশবাসকালে জীবনের আর এক সিদ্ধান্ত। আসলে ডাকটা মনের মধ্যে ছিল আইআইটি-তে ছাত্রাবস্থাতেই। আহ্বান আধ্যাত্মিকতার। স্বামী বিবেকানন্দের। সন্ন্যাস জীবনের। দেশে ফেরার পর মাত্র কয়েক মাস চেন্নাইয়ের ইনস্টিটিউট অব ম্যাথমেটিকাল সায়েন্সেস-এ। ১৯৯৮ সালে মহান যোগ দিলেন রামকৃষ্ণ মিশনে। ২০০৮-এ পুরোদস্তুর গেরুয়াবসন সন্ন্যাসী। তিনি মনে করেন – জ্যামিতির জ্ঞান ছাত্রদের বিলিয়ে দেওয়া উচিৎ, যা সেবামূলক কাজ। আর সন্ধান? তা আত্মিক প্রচেষ্টা। ক্রমাগত সত্যের খোঁজ। গভীরে, আরও গভীরে।
মহানের সত্যসন্ধান গণিতের যে শাখায়, যেখানে বীজগণিত হাত ধরেছে টপোলজি-র। প্রয়াত মার্কিন গণিতজ্ঞ উইলিয়াম থার্সটন চার দশক আগে পেশ করেছিলেন এক অনুমানঃ ‘থার্সটন জিয়োমেট্রাইজেশন কনজেকচার’। সে অনুমান অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছেন মহান। দেখিয়েছেন, তা প্রয়োগ করা যায় অনেক ক্ষেত্রে। মহানের সাফল্যকে বিশ্ববরেণ্য গণিতজ্ঞ শ্রীনিবাস বরাদান বলেছেন ‘ইম্পর্ট্যান্ট মাইলস্টোন’। কৃতিত্বের জন্য মহান ২০১১ সালে পেয়েছেন শান্তি স্বরূপ ভাটনগর পুরস্কার। ভারতে বিজ্ঞানের সেরা শিরোপা। ২০১৫ সালে ইনফোসিস প্রাইজ। অর্থমূল্য ৬৫ লক্ষ টাকা। সেই অর্থ মহান দান করেছেন ত্রিবেণী ট্রাস্টকে। যে ট্রাস্ট গড়েছেন পদার্থবিজ্ঞানী অশোক সেন।
(তথ্যঋণ – ফেসবুক)