খোলামেলা কথাবার্তা ও বইপড়ার অভিনব সুযোগ করে দিচ্ছে ‘মেয়েদের লাইব্রেরি’

যেখানে শুধুমাত্র নারীবাদ নয়, তাঁরা গর্জে উঠবেন লিঙ্গসাম্যের পক্ষে

বাহান্নটি বই দিয়ে হুগলির উত্তরপাড়ায় সাজিয়ে গুছিয়ে শুরু হল ‘মেয়েদের লাইব্রেরি’। এই উদ্যোগ শুরু করতে পেরে রীতিমতো আহ্লাদিত কৃত্তিকা চক্রবর্তী এবং ঋত্বিজা দত্ত। দুজনেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। কৃত্তিকা পড়ছেন তুলনামূলক সাহিত্য নিয়ে এবং ঋত্বিজা পড়ছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে। এই লাইব্রেরি আদতে মেয়েদের নিয়ে বই, মেয়েদের লেখা বই এবং মেয়েদের চালিত বইঘর।

‘মেয়েদের লাইব্রেরি’ তাদের বয়ানে জানাচ্ছে, যে সমাজ ‘মেয়ে’ কথাটিকে নির্মাণ করেছে লিঙ্গের অজুহাতে এক শ্রেণিকে দমন করে রাখতে, যেখানে ‘মেয়েরা’ দ্বিতীয় লিঙ্গ, যেখানে ‘মেয়েলি’ শব্দের মধ্যে  অপমানসূচক শ্লেষ, সেখানে এই লাইব্রেরিকন্যা  নিয়ে আসুক এতদিনের মূক বধিরতার পরিবর্তে প্রতিবাদের স্বর। চিৎকারে ছিঁড়ে ফেলুক সব নির্মিত সুশীলতা, শালীনতার পট্টি; ভেঙে দিক সমাজের ঘুণধরা অচলায়তন। প্রতিগর্জনের ভাষার নতুন অভিধান লেখা হোক ঋতুস্রাবের অক্ষরে। ছোট্ট বইয়ের পাতা থেকেই উদ্বুদ্ধ হোক আগামীর রোকেয়া, প্রীতিলতা, রোজ়া, ফুলো ঝানু, ক্লারা, ফ্রিদা, আশাপূর্ণারা। একযোগে তাঁরা এই মেয়েদের লাইব্রেরিকে বড়ো করে তোলার শপথ নিয়েছেন।

জুন মাসের প্রথম থেকে এই পরিকল্পনা করেন কৃত্তিকা এবং ঋত্বিজা। কৃত্তিকা আমাদের জানান, “আমি যখন নিজে ফেমিনিস্ট রিসার্চ করার জন্য বইপত্র ঘাঁটছি, তখন দেখছি যে পরিমাণে পুরুষদের লেখা বই অ্যাভাইলেবল পাচ্ছি, সেই তুলনায় মেয়েদের লেখা বই তেমন পাচ্ছি না। আমি দর্শনশাস্ত্রের কিছু বই খুঁজছিলাম। সেখানে দেখলাম পুরোটাই পুরুষকেন্দ্রিক। সেখানে মহিলা দার্শনিকদের নিয়ে খুব বেশি হলে একটা অধ্যায় রয়েছে। এইভাবে হয়তো প্রচুর মহিলা লেখকদের লেখা প্রকাশই করা হয়নি। প্রকাশ পেলেও সেটা অনামী কোনো প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছে। আমরা আসলে এই অল্টারনেটিভ স্পেসটাই খুঁজছিলাম।” এমন একটা জায়গা যেখানে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে রচনা করবে লিঙ্গের ঊর্দ্ধে গিয়ে সাম্যের বিজয় গান। সেখানে বই পড়ার সঙ্গে বই নিয়ে আলোচনা হবে, তর্ক হবে, বিপদে পড়লে মেয়েদের লাইব্রেরি পাশে থাকার চেষ্টা করবে। এই ভাবনার সুযোগটায় হয়তো ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।

কৃত্তিকা আরও জানান, “আবার বোনের একটা ঘটনা বলি। বোন সুকুমার রায় পড়ে ফেলেছে। কিন্তু লীলা মজুমদারের লেখা পড়েনি। কারণ ওকে সবাই সুকুমার রায়, সত্যজিৎ রায় পড়তে বলছেন, কিন্তু লীলা মজুমদারের নামটাই কেউ বলছেন না। এমনকি আশাপূর্ণা দেবীর নামও শোনেনি আমার বোন।” কৃত্তিকারা বিভিন্ন লাইব্রেরিতে গিয়ে যখন সিমোন ব্যুভোর-এর ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’ চাইছেন, তখন তাঁদের সার্ত্রে পড়তে বলা হচ্ছে কিংবা বলা হচ্ছে ব্যুভোর অ্যাভাইলেবল নেই।

লাইব্রেরির প্রধান দুই সম্পাদককে এই চিন্তাগুলোই তাড়া করল। তাঁদের মনে হল, মেয়েরা যে স্বাধীনভাবে খোলামেলা কথা বলবে, সেই জায়গাটা এই ২০১৯ সালেও পাচ্ছে না। তাই এই লাইব্রেরি তৈরি করার সিদ্ধান্ত। যেখানে শুধুমাত্র নারীবাদ নয়, তাঁরা গর্জে উঠবেন লিঙ্গসাম্যের পক্ষে। শুধুমাত্র মেয়েরাই নন, ছেলেরাও আসতে পারেন; অর্থাৎ যে কেউ আসতে পারেন এই লাইব্রেরিতে। এই মুহূর্তে লাইব্রেরিতে ৫২টি বই রয়েছে। এই সংখ্য বাড়তে থাকবে ক্রমশ।

আপাতত বই লাইব্রেরিতে বসেই পড়তে হবে, বাড়ি নিয়ে যাওয়া যাচ্ছে না। প্রত্যেপক রোববার দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত লাইব্রেরি খোলা থাকছে। শ্যাওড়াফুলি স্টেশন থেকে অটোতে মল্লিকবাগান মিষ্টির দোকান অথবা রিক্সায় বা পায়ে হেঁটে বিবেকানন্দ স্কুলের কাছে যেতে হবে। সব কিছু কলকাতা কেন্দ্রিক না করে একটু মফস্‌সলেই শুরু করলেন এই উদ্যোগ। লাইব্রেরি চালানোর জন্য যথেষ্ট খরচ আছে। তাই শুভানুধ্যায়ীদের কাছে কৃত্তিকা আর ঋত্বিজার অনুরোধ আর্থিক অনুদানে এই লাইব্রেরি আরও সমৃদ্ধ হয়ে উঠুক।

Developed by DXDasia