All That Breathes : ধ্বংসের আবহেও প্রতিটি জীবন গুরুত্বপূর্ণ, প্রমাণ করলেন শৌনক সেন

অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও রাজনৈতিক অস্কার মনোনীত এই তথ্যচিত্র

মাদের চেনা পরিবেশ অনেকটা বদলে যেতে শুরু করেছে। এই বদলের গোড়া পত্তন হয়েছিল বহুদিন আগেই, কিন্তু তার প্রকাশ বা অবস্থানের পূর্ণতা বোধহয় আমরা এখন অনেক বেশি প্রত্যক্ষ করতে পারছি। বিশ্ব উষ্ণায়নের কুফল স্বরূপ নানাবিধ রোগব্যাধি, মানব দেহের জন্য হানিকারক জীবাণুর বাড়বাড়ন্ত, অযাচিত ঝড়-ঝঞ্ঝা, বন্যা, খড়া আমাদের যাপনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে দিনে দিনে। সেই লড়াইটা কীভাবে জীবজন্তু ও মানুষ নিজের নিজের মতো করে লড়ে চলেছে তারই একপ্রকার নিদর্শন হচ্ছে শৌনক সেন-এর ‘অল দ্যাট ব্রিদস’ (All That Breathes – 2022)। কিন্তু এই তথ্যচিত্র কি শুধুই পরিবেশের বদলে যাওয়ার উপাখ্যান? নাকি আমাদের দেশে রাজনৈতিক হাওয়া বদলের ফলে যে শ্বাসরোধের প্রক্রিয়া চলছে এক বিশেষ ধর্মাবলম্বী গোষ্ঠীর জন্য, তারও প্রকাশ বুঝি এই তথ্যচিত্র!

তথ্যচিত্র বহুল প্রকারের হয়। মূলত কোনো বিশেষ বিষয় অবগত করার কারণেই তথ্যচিত্রের নির্মাণ হয়। সেইভাবে দেখলে ছোটোবেলায় ডিসকভারি বা ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলে যে অনুষ্ঠানগুলো দেখতাম, তা সবই আদতে তথ্যচিত্র। আমাদের দেশে এককালে প্রচুর তথ্যচিত্র নির্মাণ হয়েছে এবং তার একটা ধারাবিবরণীর ব্যাপার ছিল। কিন্তু যেমন বদলে যাচ্ছে জলবায়ু তেমনি বদল হচ্ছে তথ্যচিত্রের ভাষা। সেই ভাষায় তথ্যচিত্রের যে নিরস অনাড়ম্বর একটা দিক ছিল, যার কাজ ছিল শুধুমাত্র কিছু তথ্য দেওয়া, সেই খোলস থেকে বেরিয়ে তথ্যচিত্র ক্রমাগত একটা দার্শনিক দিকও ফুটে উঠছে, শৌনক সেনের মতো নতুন পরিচালকদের হাত ধরে।

শৌনক সেনের এই ছবি অবসেশন থেকে বেরিয়ে এসে একটা বড়ো ক্যানভাসকে ধরার চেষ্টা করে। তাই ন্যারেটিভের আনাচে কানাচে ঢুকে পড়ে একটি শহরের ভিতর ক্রমাগত বিপন্ন হতে থাকা অন্যান্য বন্য জীবন।

লেখার শুরুতেই বললাম যে তথ্যচিত্র দেখার প্রাথমিক অভিজ্ঞতা হয়েছে ডিসকভারি আর ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলে। সেখানে মূলত যে ধরনের তথ্যচিত্র দেখা যেত তা মূলত জঙ্গলের প্রাণীদের জীবনের কথা বলতো, যাকে বলে ‘ওয়াইল্ড লাইফ ডক্যুমেন্টেশন’। সেই ভাবনাকেই একপ্রকার ভিন্ন আঙ্গিকে উস্কে দিল ‘অল দ্যাট ব্রিদস’। ছবির শুরুতেই আছে একটা লম্বা শট যেখানে আমরা দেখতে পাই, দিল্লি শহরের ভিতরে এক আস্তাকুড়ে ইঁদুরদের দৌড়। দেখে মনে হয়েছিল ক্যামেরা যেন একটা অশরীরী এবং যাদের ফ্রেমে দেখা যাচ্ছে তারা যেন জানেই না যে তাদেরকে ক্যামেরা বন্দি করা হচ্ছে। এই ছবিটি মূলত মানুষের গড়ে তোলা কংক্রিট জঙ্গলের কথাই বলতে চেয়েছে।

কেমন সেই জঙ্গল। কারা থাকে সেই জঙ্গলে এবং কীভাবে তারা বেঁচে আছে এই ক্রমশ বদলে যাওয়া পৃথিবীতে? সেই জঙ্গলের নাম দিল্লি। ভারতের রাজধানী। সেই জঙ্গলের নির্মাণ হয়েছে ইট, কাঠ, ইলেকট্রিক তারের জটিল প্যাঁচে, অদূরে কলকারখানার চিমনি দিয়ে অনর্গল নিষ্কাশিত হওয়া কালো বিষাক্ত ধোঁয়া। সেই জঙ্গলে থাকে একটি পরিবার। পরিবারে তিন ভাই। তাদের আছে এক অদ্ভুত নেশা। অবলা প্রাণীদের প্রাণ রক্ষার নেশা। যে প্রাণ দিনে দিনে বিপন্ন হয়ে পড়ছে, দূষিত জলবায়ুর কারণে। এই ছবির দ্বিতীয় শটেই দেখা যায়, আকাশে উড়ে যাচ্ছে একটি একাকী চিল। তার সঙ্গে এই ছবির একজন মুখ্য পাত্র তার মনের ভাবনা ব্যক্ত করে, অন্যান্য পাখিদের ওড়া দেখলে তাদের কসরত বোঝা যায়। ছোটোবেলা থেকেই এই তিন ভাইয়ের চিলের প্রতি এক অদ্ভুত নেশা জন্মায় এবং বর্তমানে তা এক অবসেশনে পরিণত হয়েছে। প্রথম যে চিলটিকে তারা বাঁচিয়ে আনে, তাকে নিয়ে স্থানীয় চিকিৎসা কেন্দ্রে গেলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। বলা হয়, চিল মাংসাশী পাখি।

শৌনক সেনের এই ছবি অবসেশন থেকে বেরিয়ে এসে একটা বড়ো ক্যানভাসকে ধরার চেষ্টা করে। তাই ন্যারেটিভের আনাচে কানাচে ঢুকে পড়ে একটি শহরের ভিতর ক্রমাগত বিপন্ন হতে থাকা অন্যান্য বন্য জীবন। তার মধ্যে আছে আস্তাকুড়ের ইঁদুর, আকাশের চিল, ফ্যানায় ভরা যমুনার মধ্যে দাঁড়িয়ে বিহ্বল শিশু সারস, জলের ওপর মশার পাল, আবর্জনায় ঘুরে বেড়ানো কচ্ছপ – এই সবকিছুই ঠাঁই পেয়েছে ছবির চিত্রপটে। পরিচালক শৌনক সেনের চিলের মতো শ্যেনদৃষ্টির পরিচয় পাওয়া গিয়েছে সেই সব নিখাদ শটের মাধ্যমে।

তবে এই তথ্যচিত্রের একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দিকও আছে, যা পরিচালক কোনো ভান না করে সহজভাবে বলেছেন ছবির চলনের মধ্যে। আমরা দেখি একটি ভারতীয় মুসলমান পরিবার বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ করার চেষ্টা করছে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি অনুসারে মুঘল আমলকে যখন কলমের খোঁচায় বাদ দেওয়া হল, সেই সময় এই তথ্যচিত্রের গুরুত্ব অনেকটাই বেড়ে গেল। বর্তমান রাজনৈতিক বাতাবরণে, আমাদের দেশের মুসলমান জনতাদের এক বিশেষ আতসকাচে দেখার বা দেখাবার যে কদর্য খেলা শুরু হয়েছে, সেখানে এই ছবি নিঃসন্দেহে দর্শককে একটা অন্য দৃষ্টিভঙ্গিতে ভারতবর্ষের মুসলমান জনগণকে বুঝতে সাহায্য করবে। সেইসঙ্গে ধর্মের অন্ধ আতসকাচের বাইরে বেরিয়ে ভাবতে বাধ্য করবে।

 

 

বর্তমান রাজনৈতিক বাতাবরণে, আমাদের দেশের মুসলমান জনতাদের এক বিশেষ আতসকাচে দেখার বা দেখাবার যে কদর্য খেলা শুরু হয়েছে, সেখানে এই ছবি নিঃসন্দেহে দর্শককে একটা অন্য দৃষ্টিভঙ্গিতে ভারতবর্ষের মুসলমান জনগণকে বুঝতে সাহায্য করবে।

এই ছবি খুব সহজভাবে আমাদের দেশের একটি মুসলমান পরিবারের অদ্ভুত এক প্রাণী সেবার কথা বলে। তিন ভাইয়ের ব্যবসা। আর তাদের ছাদে ঠাঁই নেওয়া গড়ুর জটায়ুর দল। ভাইদের মধ্যে কলহও বাঁধে নতুন গজিয়ে ওঠা পরিবারকে নিয়ে। কারণ সেই পরিবারে সদস্য অনেক এবং তাদের ভরণপোষণের দায়ও তিন ভাইয়ের। তাদের প্রধান কাজই হল বিপন্ন চিলদের শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাঁচিয়ে আনা এবং যত্নের সঙ্গে তাদের শুশ্রূষা করা। কিন্তু শুধু ব্যবসা থেকে আসা অর্থে আসল পরিবার সামলে পক্ষীকুলের সেবা করা কঠিন। তাই ভাইয়েরা বিভিন্ন বিদেশি তহবিলের খোঁজ করতে থাকে, যাতে আরও ভালোভাবে এই সেবাকার্য চালিয়ে যেতে পারে। কিন্তু প্রাথমিক সেই আর্জি মঞ্জুর হয় না। ইতিমধ্যে সরকার বাহাদুরের হুংকারে দেশের মুসলমানদের ওষ্ঠাগত প্রাণ। সিএএ, এনআরসি-র প্রকোপে তখন বেশ একটা ডামাডোল চলছে দেশে। ছবির শেষে দেখানো হয় ২০২০ সালে দিল্লি শহরের কুখ্যাত দাঙ্গা। সেই ডামাডোলের মাঝে এই পরিবার চায় না দেশ ছাড়তে। কিন্তু তাদের মুখেও শোনা যায়, দেশ ছেড়ে দিলেও পাকিস্তানে যাবে না।

এরকম একটা কাজ কীভাবে অস্কারের দরবারে গিয়ে পুরস্কৃত না হয়ে ফিরে আসে! বিশ্বজুড়ে মুসলিম বিদ্বেষের ফলেই কি এই ছবিটি পিছিয়ে পড়লো? কারণ দুই দেশেই মুসলমান কর্তৃক নাশকতার ফলে যে কড়া নৈতিকতা আপন করেছে, তাতে আদতে তারা ইসলাম ধর্মাবলম্বী সাধারণ জনগণদের জীবন ও যাপনকে নাকচ করে দিচ্ছে। শৌনকের এই ছবি সারা বিশ্বের কাছে ইতিমধ্যেই পৌঁছে গিয়েছে। বর্তমানে HBO-র ওটিটিতে সম্প্রচারিত হচ্ছে ‘অল দ্যাট ব্রিদস’।

ধ্বংসের আবহেও প্রতিটি জীবন গুরুত্বপূর্ণ, শৌনক সেনের তথ্যচিত্র ‘অল দ্যাট ব্রিদস’ বারবার সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়। মহম্মদ সৌদ এবং নাদিম শেহজাদের এই অদম্য লড়াইয়ের কথা আজ বিশ্বের ঘরে ঘরে পৌঁছে গিয়েছে। পাখির সঙ্গে মানুষের যে বহমান সম্পর্ক, তা সুন্দরভাবে ক্যামেরাবন্দি করেছেন শৌনক সেন এবং তাঁর টিম।
____

অল দ্যাট ব্রিদস রিভিউ (All That Breathes Review)
পরিচালকঃ শৌনক সেন

Developed by DXDasia