বাংলার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যদের বুনছেন তিনি
মনে হয়, শিকড়ই আমাদের আমার শিরা হ’য়ে
আমাকে করেছে প্রবাহিত মানুষের দিকে। অথচ কে যেন বলল শিকড় খুঁজে নে…
(কবি নির্মল হালদার : আমার চোখের জল লোহা হয়ে যায়)
বাড়ির কাছে আরশিনগর। পথ দিয়ে ঘুরতে ঘুরতেই বিকেলের অসমাপ্ত আলোয় সীমা সেনের চোখ খুঁজে নেয় মানুষের জীবন যাপনের দৃশ্যপট, হঠাৎ দেখা অববয়ব, সহজতার ভাষা, আশ্চর্য বুননের শিকড়-সন্ধান। খুঁজে খুঁজে ঠিক যেন পরশপাথর তুলে আনেন সীমাদি। সেইসব বাড়ি নিয়ে ফেরেন। তারপর, ঘষামাজা করে বুনন করেন অদেখা অন্তর্জগৎ। সীমাদির বুনন-যাপনে প্রাণের স্পন্দন মেলে। নির্জন মৌনতায় তিনি দৃশ্যে দৃশ্যে কথকতার জলসিঞ্চন করেন। বুননের এক-একটা রেখা সীমাদির শিল্পে আনে মৌনতা, আখ্যাননের অদ্ভুত জগৎ, সহজ মানুষের অববয়ব, নির্জন নির্সগের দৃশ্য।

বুননশিল্পী সীমা সেন। যাঁর সেলাই মুগ্ধতায় আমাদের ঘিরে ধরে বারবার। যাঁর বুনন-শিল্পের আখ্যানে ভরে ওঠে শান্ত নীরবতা।
নদীয়ার শান্তিপুরের সবাই চেনেন সীমাদি’কে। থাকেন শান্তিপুরের ভারতমাতা মোড়ের কাছে। ছোটবেলা থেকে সেলাই শিখেছেন। বাবা ফণীময় কাষ্টের কাছে শিখেছেন বুনন, রং-সেলাইয়ের টানাপোড়েন। জামদানি শাড়ি বুননের জন্যে পুরস্কৃত হয়েছিলেন সীমাদির বাবা ফণীময় কাষ্ট। সেলাই দেখে বোঝাই যায় উত্তরাধিকারের এই সূত্রটি বাহিত হয়েছে সেলাইয়ের মধ্যেও। স্বামী প্রর্বতক সেন। মেয়ে শ্রীদত্তা সেন। সেনবাড়ি এখান খুব ঐতিহ্যে্র। কারণ, বিখ্যাত চিত্রশিল্পী ললিতমোহন সেন এ’বাড়িতে থেকেছেন। তাঁর ছোটবেলা এই বাড়িতেই কেটেছে। ললিতমোহন সেন সম্পর্কে সীমাদির দাদাশ্বশুর।
আরো পড়ুন
মণিমালার আশ্চর্য জগৎ
সীমাদির কাজকে অনেকগুলি ভাগে ভাগ করা যায়। মানে, আমরা নিজেদের প্রয়োজনেই ভাগগুলি করেছি। যেমন-

ক. শিশুমনন ও শিশুজগৎ: সেলাইয়ের মধ্যেই শিশুদের জন্যে বুনেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা সহজপাঠ, যেখানে নন্দলাল বসুর কল্পলোক। যে কল্পলোকে আশ্রয় করে সীমাদি আবার তাঁর বুননকে শিশুপাঠ্যের অন্তর্জগতের কাছে নিয়ে গেলেন। আমরা আধুনিকতার মোহে পরে যেন শিশুপাঠ্যগুলি ভুলতেই বসেছিলাম। সীমাদি বুননের মাধ্যমে আরেকবার আমাদের সামনে চিত্রশিল্পী নন্দলালের কল্পলোকটি হাজির করলেন। এই সিরিজটি তিনি মুক্তমঞ্চে এককভাবে প্রদর্শনীও করেছেন। লক্ষ্য করেছি, সীমাদি খুব শিশুপ্রিয়। বাচ্চাদের ভুলেও বকেন না। আদর যেন সবসময় ওঁর মধ্যে বাসা বেঁধে আছে।

খ. নাট্যদজগৎ: শান্তিপুর নাটকের জায়গা। প্রতিনিয়ত এখানে নাটক নিয়ে চর্চা হয়। সে জগৎ-ও সীমাদির সেলাইয়ে বাদ যায়নি। সেলাইতে ওঠে এসেছে নাটকের নানা মুহূর্ত। উৎপল দত্ত, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, মনোজ মিত্রের মুখাবয়ব, বিখ্যাপত নানা নাটকের মুহূর্ত। এসব বুননশিল্পের নিদর্শন নাট্যদগুণী মানুষদের হাতেও তুলে দিয়েছেন সীমাদি।

গ. নারীর অন্তরঙ্গতা বা অন্দরযাপন : সীমাদির কাজে নারীচরিত্র বিশেষ এক জায়গা নিয়ে আছে। সেলাইয়ের চিত্রপট জুড়ে নারীরা যেন নিজেদের অন্দরমহলের কথা বলে। নারী চরিত্রগুলির মধ্যে বিষাদ, আনন্দ, কারুণ্য, অতীতচারিতা–এমন নানা অভিব্যক্তি আমরা দেখতে পাই। সীমাদি খুব নিখুঁতভাবে ছোট ছোট রান সেলাই-এ বোনেন নারী চরিত্রগুলিকে। মেয়েদের অন্দরযাপনও ছবিতে এসেছে। কেশবিন্যাসে ব্যস্ত একটি মহিলা, যার পশ্চাদদৃশ্য আমরা দেখি। মহিলার আপন খেয়ালে চুল পরিচর্যায় এই দৃশ্যভাবনা আমাদের অবাক করে। প্রতিটা দেখা থেকে তিনি বুননের রসদ জোগাড় করেছেন আর কাপড়ের ওপর সযত্নে, সুকৌশলে বুনে গেছেন। আরেকটি ব্যাপার হল বুননের রং। রং নির্বাচনেও অসামান্য্ প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। কেশবিন্যাসের দৃশ্যটির রঙের কাজ ভোলার নয়।

ঘ.প্রকৃতি বা নৈসর্গ: সীমাদির দেখায় প্রকৃতি ধরা পড়েছে অন্যভাবে। যেখানে বৃক্ষনিধনের দৃশ্যকল্প এসেছে, আবার মানবসমাজের করণীয় দিকগুলি কেমন হওয়া উচিৎ, তিনি তাও দেখিয়েছেন। এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় বলার। প্রকৃতির ছবি সব থেকে বেশি সময় নিয়ে নিয়ে বুনেছেন তিনি। সেলাই দেখলেই তা স্পষ্ট বোঝা যায়।
বুননশিল্পী সীমা সেন উত্তরাধিকার সূত্রে যেমন বাপেরবাড়ি থেকে সেলাইয়ের নানা গুণ পেয়েছেন, তেমনই আবার ললিতমোহন সেনের কাজ দেখে পেয়েছেন দৃশ্যকল্পর সন্ধান। যে দৃশ্যকল্প তাঁকে বিষয় নির্বাচনে বৈচিত্র বুনতে প্ররোচিত করে। অভিব্যক্তির এক অদ্ভুত স্বতন্ত্রতায় নিয়ে যায়।

সীমা সেন ইতিমধ্যে একক প্রদর্শনী করেছেন শান্তিপুরে কলাতীর্থ প্রদর্শনশালায়। রান্না করতে পারেন অসাধারণ। বাড়ির হেঁসেল সামলাতে সামলাতেও তিনি দৃশ্যকল্প ভাবেন, ভাগ করে নেন মেয়ে শ্রীদত্তার সঙ্গে। এই শিল্পবোধের অন্তরঙ্গতা থেকেই হয়তো সেলাইয়ে তাঁর আত্মউন্মোচন ঘটে। বর্তমানে তিনি বাংলার হারিয়ে যাওয়া নানা ঐতিহ্যে নিয়ে সেলাই-এ মেতে আছেন। কথা বললে মনে হয়, অদ্ভুত এক কল্পলোকে ডুবে আছেন। আমরাও তাঁকে বলি– ডুবে থাকুন। হয়তো এই কল্পলোকের রূপসাগরে ডুব দিয়েই তিনি আরো অমূল্য রত্ন খুঁজে নিয়ে আসবেন আমাদের জন্য।