
এই ছবি এক ঘণ্টা ছাব্বিশ মিনিটেই থেমে যায় না
"-তুই কারে বেশি ভালোবাসিস রে?
-আমি? তোরে, মারে, বাবারে…
-সবচেয়ে বেশি কারে ভালোবাসিস?
-মারে… এই না না, তোরে। তুই?
-…বাবারে।"
রোজ হাঁটতে হাঁটতে একটু থেকে আরও একটু ক্লান্ত হতে হতে যখন পদ্মপাতায় বিন্দু বিন্দু জলের ফোঁটা দেখতে পাওয়া যায়; বিম্বিসার আর অশোকের ধূসর পায়রা যখন আমাদেরই বাড়ির এককোণে তাদের আশ্রয় খুঁজে পায় কিংবা বিষাদবৃক্ষ রাতের দু'মুঠো নিশ্বাস তুলে আনে পরিবারের মাথায় তখন সরু একটা রাস্তা ধরে ছেলেবেলা হাতড়ে এগিয়ে যায় অবেলার শিশু। কাঁধে হাত রাখে, হাতের মুঠো শক্ত করে, ক্লান্ত হলে ঘাম মুছিয়ে দ্যায় আর পেয়ারা ভাগ হয় ক্রমশ। মানস মুকুল পালের প্রথম ছবি 'সহজ পাঠের গপ্পো' পাঠ করতে করতে কবিতার আশ্রয় নিতে হয়। রূপকথা আর মেলোড্রামার বাইরে সম্পূর্ণ অন্য একটা জগত, যেখানে দু'টো শৈশব আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে, সংসার টানতে শিখছে, এমনকি মা যখন নিজের ছেলের জন্মের তারিখটুকুও বলতে পারে না তখন একটুও অবাক না হয়ে মা'কে জড়িয়ে ধরে নতুন একটা সকাল হওয়া দেখে ফেলছে প্রতিদিন। এমন 'সহজ পাঠের' গল্প ক'জনই বা বুনতে পারেন! শহুরে পুঁজিবাদের বাইরে গিয়ে গ্রাম্য অথবা প্রান্তিক কাহিনি সহজ ভাবে বলতে পারা বাংলা ছবির বাইরে গিয়ে আন্তর্জাতিকতার কথা বলে ওঠে। গুটিকয়েক প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়া এই ছবি 'হাউজফুল' তকমা আনতে না পারলেও বাংলা ছবির জাত চিনিয়েছে অনায়াসে, তার নিজস্ব একটা অবস্থান দর্শকদের কুড়ে কুড়ে খেয়েছে। তাই এই ছবি এক ঘণ্টা ছাব্বিশ মিনিটেই থেমে যায় না। শেষের পরেও যে নতুনের শুভ সূচনা সম্ভব তা পরতে পরতে জানান দ্যায়। এখানেই জিতে যায় দু'টো বাচ্চার মায়াবি চোখ আর তাদের মায়ের আকুতি।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখছেন, "যে জীবন অশ্রুকে জানে না, আশাহত ব্যর্থতাকে জানে না সে জীবন মরুভূমি।" তাঁর এই কথাই যেন দেখাতে পরিণত হয়। বিভূতিভূষণের 'তালনবমী' গল্প অবলম্বনে নির্মিত এই ছবির দুই ভাই গোপাল আর ছোটু অভাবের সংসারে বেড়ে ওঠে। বাবার অ্যাক্সিডেন্টের পর কোনওরকমে তাদের মা সংসার চালান। গোপাল জানে সে বাড়ির বড় ছেলে, তাই সংসারের হাল তাকেই ধরতে হবে। কখনো পুকুর পাড়ের শাকপাতা আর তাল তুলে এনে বাজারে বসে ভাইকে নিয়ে, কখনও বা বড় বাড়ির জন্মাষ্টমীর পুজোয় তাল বিক্রি করার কথা পাকা করে আসে। ছোটটি জানে না সব প্রজাপতি মধু পায় না, সে স্বপ্ন দ্যাখে বিনে পয়সায় তাল দিলে পুজোয় তাদের নেমন্তন্ন করে ভালোমন্দ খাওয়াবে। সমাজ রাজনীতির রূঢ় বাস্তব সে জানে না। অতএব ফুঁপিয়ে কাঁদা ছাড়া তার যে আর কিছুই করার থাকে না। এই ভাবে ছবির গল্প এগোয়, মূলগল্প থেকে খানিক অন্য রাস্তা ধরে। অর্থ বৈষম্য, শ্রেণি বৈষম্য প্রকট হয়ে ওঠে ছবির কেন্দ্রবিন্দুতে। বিভূতিভূষণের লেখা অনায়াসেই জায়গা পেয়ে যায় সমসময়ে। মিড ডে মিলের প্রসঙ্গ থেকে অন্য পাড়ার কাকিমার বাড়িতে কুয়োর শ্যাওলা পরিষ্কার করতে গিয়ে কন্ডোমকে বেলুন হিসাবে আবিষ্কার করা; কিংবা কম টাকায় তাল বিক্রি করে দেওয়া থেকে একঝাঁক তাল কুড়িয়ে পাবার অকৃত্রিম আনন্দ – আমাদের এ কোন সময়ে নিয়ে এলেন পরিচালক?
ছবিতে স্বপ্নদৃশ্য আলাদা মাত্রা পেয়েছে। বড় ছেলে গোপাল দ্যাখে বাবার মৃতদেহ উঠোনে শোয়ানো। দুই ভাইকে ফেলে রেখে মা ছুটছেন একা হতে, আরও একা। মায়ের পিছনে ছোটে বাড়ন্ত শৈশব, কখনো আঁচল টেনে ধরে। তবুও মায়ের জ্বালা জুড়োয় না। ট্রেনে মাথা দিচ্ছেন মা আর গোপালের ছলছল চোখের চিৎকারে একজায়গায় বসে থাকতে পারেন না দর্শক। স্বপ্ন ভেঙে যায়। গোপাল এক নিমেষেই অনেকটা বড় হয়ে যায়, বুঝে নিতে চায় সংসারের যাবতীয় খুঁটিনাটি। আর ছোটটি তখনও জানলার শিকে মুখ গলিয়ে আকাশ দ্যাখে, বলে, "আমাদের নেমন্তন্ন করবে তো ঠাকুর!"
'সহজ পাঠের গপ্পো' দেখতে দেখতে বারবার মনে হয় 'তালনবমী' গল্প সার্থক রূপ পেয়েছে। সাহিত্য নির্ভর ছবিতে চিরকাল জায়গা করে নিয়েছেন বিভূতিভূষণ। বাংলা চলচ্চিত্র আবিষ্কার করেছে 'ব্যতিক্রমী' পরিচালকদের। মানস মুকুল পাল ছত্রে ছত্রে বুঝিয়ে দিতে পেরেছেন বাংলা ছবির দর্শকদের অনেক কিছু দেখার বাকি থেকে গেছে। শিশুকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের তালিকায় এই ছবি নতুন সংযোজন।
এই ছবির বড় সম্পদ চিত্রগ্রহণ, আবহ, সম্পাদনা এবং শিল্প (চিত্রগ্রহণ- মৃন্ময় মণ্ডল ও সুপ্রতীপ ভোল, আবহ- চন্দ্রদীপ গোস্বামী ও ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত, সম্পাদনা- সুজয় দত্ত রায় ও অনির্বাণ মাইতি, শিল্প- মৃদুল বৈদ্য ও শাশ্বতী কর্মকার) যেগুলি নিজ নিজ জায়গায় এক একটি চরিত্র হয়ে প্রকাশ পেয়েছে। গোপালের চরিত্রে সামিউল আলম, ছোটুর চরিত্রে নুর ইসলাম, তাদের মায়ের চরিত্রে স্নেহা বিশ্বাস এককথায় অনবদ্য। অনবদ্য তাদের চাওনি, শারীরিক ভাষ্য আর ডায়ালেক্ট। উত্তর চব্বিশ পরগণার এই গ্রামীন কথ্যভাষা ছবিটিকে মর্যাদা দিয়েছে, প্রাণবন্ত করে তুলেছে। অভিনয় দেখে কখনোই মনে হয় না এঁরা নতুন। ইতিমধ্যেই জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত হয়ে দুই শিশুশিল্পী এনেছে রজত কমল।
ছবির শেষ দৃশ্যে সারি সারি তাল গাছ আর পাখিদের উড়ে যাওয়া খানিক রূপক, খানিক নতুন ভাবে স্বপ্ন দেখা। কঠিন বাস্তবকে বুকে নিয়ে তাদের উড়ান ছবিটিকে শেষ হতে দ্যায় না। আরও অনেককিছু বাকি ছিল কি? কে জানে? হয়ত না, হয়ত সবটাই বাকি থেকে গেছে সারি সারি তালপাতার ফাঁকে কিংবা রেললাইনের বাঁকে।
ছবি- সহজ পাঠের গপ্পো
প্রযোজনা- অভিজিৎ সাহা
পরিচালনা- মানস মুকুল পাল
অভিনয়ে- নুর ইসলাম, সামিউল আলম, স্নেহা বিশ্বাস, শকুন্তলা বড়ুয়া প্রমুখ
