মণিমালার আশ্চর্য জগৎ

উলে বোনা পুতুল, কাঁথাস্টিচ, শাড়ি- বুননশিল্পী মণিমালার কথা

“সারাদিন শুধু বুনতে ইচ্ছে করে

একটাই পুরনো কার্পেট, ঘন ও বাদামি।

লালফুল, নীলফুল, প্রান্তরের শস‍্যেরা আমার…

ওই উপর থেকে খুলে খুলে পড়বে

হলুদ সুতোর লাছি,

গরম, ভারী, আরামদায়ক

আর হয়তো তখনই 

কোথা থেকে উড়ে আসবে হৃষ্টপুষ্ট সাহসী ফড়িং

 

কোত্থেকে আসবে, আমি জানি না…”

কবি মন্দাক্রান্তা সেনের ‘বুননশিল্প’ কবিতায় যেন ধরা পড়েছে শিল্পী মণিমালার আশ্চর্য জগৎটাই। সত‍্যিই কারো কারো বুননে ধরা পড়ে সাহসী ফড়িং। একরাশ সজীবতার আখ‍্যান নিয়ে আসে সে। ধরা পড়ে, চারপাশের চেনা জগতের অনেক আশ্চর্য। আর, সেলাইয়ে এইসব বিস্ময় ধরবেন বলেই হয়তো সারাটা দিন নেশার মতো বুনে চলেন শিল্পী মণিমালা দাস। বয়স ৫০। থাকেন নদীয়া জেলার শান্তিপুরের বেরপাড়ায়।

চাষি যেমন পরম আগ্ৰহে আগলে রাখেন ফসল, মণিমালাদি ঠিক তেমনই লালফুল, নীলফুলের বুননশস‍্য জমিয়ে রাখেন আলমারিতে। তাঁর বুননের অনেকগুলি ভাগ রয়েছে, যেমন সুঁচে বোনা, ক্রুশে বোনা ইত‍্যাদি। মণিমালাদি  বেশিরভাগ করেন কাঁথাস্টিচের কাজ। শাড়ির উপরও অসংখ‍্য কারুকাজ করেছেন। গ্রাম্য কথকতা থেকে বাংলার দশপুতলি ব্রতের আলপনার দেখা মেলে সেইসব শাড়িতে। এছাড়াও, রয়েছে বিছানার চাদর। আর, উলের বুননে ধরা পড়ে আশ্চর্য শিশুমনন, যেখানে রয়েছে জোড়া বেড়াল, কুকুর, শেয়াল, পায়রা, টিয়াপাখি, ময়ূর, ঘোড়া, জিরাফ, গঙ্গাফরিং, চিংড়িমাছ ও আরো কত কী! এ যেন ছেলে-ভুলানো শিল্পের জগতে নিমেষে নিয়ে যায় আমাদের।

মণিমালা দাস তাঁর ক‍্যানভাসে বর্তমান সমাজভাবনাও সেলাইয়ের মাধ‍্যমে তুলে ধরেছেন। একইসঙ্গে, মণিমালাদির সৃজনভাবনায় উঠে আসে নাট‍্যজগৎও। শান্তিপুরে নাটক হয় নিয়মিত আর সেই নাট‍্যজগতের নানা বিষয় হয়ে ওঠে তাঁর বুনন শিল্পেরও বিষয়। যেমন- শম্ভু মিত্রের মুখাবয়ব, মনোজ মিত্রের মুখাবয়ব নামকরা নাটকের নানা দৃশ‍্যপট ইত্যাদি। সমকালীনতা তাঁকে ঘিরে থাকে। সমকাল থেকে সংগ্ৰহ করেন বুননের বিষয়ভাবনা। সকালে গৃহস্থের নানা কাজ সেরে সারাদুপুর বুনে চলেন ভাবনার রান সেলাই।

ক্রুশে পাটের সুতলি দিয়ে বোনেন কার্পেট, পা-মোছা, আসন, বাচ্চা ও বড়োদের দোলনা ইত‍্যাদি। এছাড়াও আছে পাটের সুতো দিয়ে বোনা পুতুল। উলের পুতুলের রং ও বুনন দেখে তো মুগ্ধ হতে হয়। বাড়িতে বড়ো বড়ো চার-পাঁচটি আলমারি জুড়ে রেখেছেন বুননের এই আশ্চর্য জগৎ। ছেলে সৌমাভ দাস চিত্রকলা নিয়ে পড়ছে শান্তিনিকেতনের কলাভবনে। মায়ের চিরকালের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করছেন শিল্পের মধ‍্যে দিয়ে। সৌমাভ বলে, “আমার যা কিছু হাতখড়ি মায়ের কাছে। রং শিখেছি, বুনন শিখেছি, কম্পোজিশান শিখেছি মায়ের কাছেই। আর শিখেছি শিল্পের প্রতি নিগূঢ় ভালোবাসা যা আমার চিত্রকলায় অনুপ্রেরণা”। শিল্পী মণিমালা দাস শান্তিপুরের নানা জায়গায় সেলাইয়ের কাজ প্রদর্শন করেছেন। শান্তিপুরের কলাতীর্থ প্রদর্শনশালায় নিয়মিত গ্ৰুপ শোও করেন। মণিমালাদির কাজ দেখে মুগ্ধ হয়ে সেই শিল্পকর্ম সংগ্রহও করেছেন শিল্পী হিরণ মিত্র।

কাঁথার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলেও ফুরোয় না তাঁর সেলাই-ভাবনা। মণিমালাদি সেই কাজটিই করছেন। বর্তমানে বাংলার হারিয়ে যাওয়া কাঁথার বিষয়ভাবনা বিভিন্ন সেলাই কাপড়ের উপর ফুটিয়ে তুলেছেন। আধুনিকতার সঙ্গে গ্ৰামীন লোকজীবনের প্রবাহমানতাকে তুলে ধরছেন কাঁথাস্টিচের মাধ‍্যমে। বাংলার হারিয়ে যাওয়া শৈশবের পুতুলগুলি ক্রুশে, উলের মাধ‍্যমে পৌঁছে দিচ্ছেন সকলের কাছে। অথচ, এত বিপুল সম্ভার থাকা সত্ত্বেও মণিমালাদি নিজেকে একটু লুকিয়ে রাখেন সবার কাছে। জানি না কেন! তবে বুঝতে পারি, নামের মোহ নেই এই শিল্পীর। সবার অজান্তেই কাজ করে চলেছেন। বাঁচিয়ে রেখেছেন মায়ের থেকে শেখা সেলাই, ফোড়, রঙের নানা খুঁটিনাটি। নিজের ভেতরের নান্দনিকতা, শিল্পনৈপুণ‍্য তুলে ধরছেন নানা মাধ‍্যমে। জীবনানন্দের কবিতার সূত্র ধরে বলতে হয়– “শরীরে মাটির গন্ধ মেখে/ শরীরে জলের গন্ধ মেখে/ উৎসাহে আলোর দিকে চেয়ে”…

উৎসাহর আলোই তো ধরা পড়ে শিল্পী মণিমালার কাজের মধ‍্যে। যে আলোয় মিশে থাকে বর্ণরহস‍্য, সৃষ্টিরহস‍্য। যা জন্ম দেয় বুননের আশ্চর্য জগৎ।

Developed by DXDasia