ভালোবাসার কথা বলতে এলাম: কামসূত্র মার্টিনি

বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ – পর্ব ১১

  গত পর্বের পর  

৪৯৩ সালে, স্পেনের রাজা ফার্ডিন্যান্ড আর রানি ইসাবেলার মদতপুষ্ট ক্রিস্টোফার কলম্বাস যখন পুয়ের্তো রিকোতে প্রথম পৌঁছলেন, তখন এখানে বসবাস করতেন আরাওয়াক ইন্ডিয়ান আদিবাসীরা। সেন্ট জনকে স্মরণ করে কলম্বাস এই দ্বীপের নাম দেন সান হুয়ান (San Juan)। পরে জলপথে বাণিজ্যসমৃদ্ধ বন্দর হিসেবে এর নাম হয় পুয়ের্তো রিকো অথবা 'Rich Port' অর্থাৎ সম্পদশালী বন্দর। ভাবতে অবাক লাগে যে, যে সময় কলম্বাস স্পেনের রাজশক্তির মদতে, দুর্জয় স্প্যানিশ আর্মাডা নিয়ে পুয়ের্তো রিকো এসেছিলেন, তার ঠিক পাঁচ বছরের মাথায়, ১৪৯৮ সালে, পর্তুগাল থেকে জলপথে ভারতবর্ষের কালিকট বন্দরে নোঙর ফেলেন ভাস্কো ডা গামা। সকলেরই লক্ষ্য এক। নতুন উপনিবেশ পত্তন – নতুন আধিপত্য বিস্তার – নতুন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দমন। ইউরোপের বিভিন্ন বন্দর থেকে কিছু অসমসাহসী নাবিক দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল নতুন বিশ্বের সন্ধানে।

ক্রিস্টোফার কলম্বাসের প্রথম পুয়ের্তো রিকোয় পৌঁছানো

গতকাল ট্রলিবাস ধরে পৌঁছে গিয়েছিলাম এই অঞ্চলের প্রাচীনতম দুর্গে যার নাম কাস্তিলো সান ফিলিপে এল মোরো (Castillo San Felipe del Morro)। সেইখানে পৌঁছে দেখতে পেলাম সান হুয়ানের অতীতকে। জলদস্যু আর অন্যান্য ইউরোপীয় রাজশক্তিকে পরাস্ত করতে এই দুর্গের গোড়াপত্তন হয় ১৫৩৯ সালে। একটু একটু করে অর্থ সংগ্রহ করে দুর্গ নির্মাণের কাজ চলে প্রায় আড়াইশো বছর ধরে। ১৭৮০ নাগাদ রাজা চার্লস-এর তত্ত্বাবধানে নির্মাণ শেষ হয় এবং এই নিশ্ছিদ্র দুর্গের খেতাব হয় ডিফেন্স অফ দ্য ফাস্ট অর্ডার (Defense of the first order)। সমুদ্র যেখানে স্থল স্পর্শ করেছে সেখানে উঠেছে খাড়া পাথুরে পাহাড়ের টিলা। সেই টিলার মাথায় বহু মাইলব্যাপী অতন্দ্র প্রহরী এল মোরো দুর্গ৷ সে রক্ষা করছে এক বৈভবশালী বন্দরকে, যাকে বলা হতো গেটওয়ে অফ দ্য ক্যারিবিয়ান (Gateway of the Caribbean)। এই দুর্গ ১৫৯৫ সালে প্রতিহত করেছিল দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ইংরেজ, স্যার ফ্রান্সিস ড্রেককে (Francis Drake) – ১৬২৫ সালে ফিরিয়ে দিয়েছিল ওলন্দাজ জেনারেল বোদওয়েন হেন্ড্রিক্সকে (Boudewijn Hendricksz ) – আর ১৭৯৭ সালে পর্যুদস্ত করেছিল ইংরেজ অ্যাডমিরাল স্যার রালফ আবারক্রোম্বিকে (Ralph Abercromby)৷ এল মোরোতে সর্বদা তৈরি থাকতো সাড়ে চারশ কামান। শয়ে শয়ে দুঃসাহসী স্পানিশ যোদ্ধা ঘর পরিবার থেকে বহুদূরে, রাজকীয় মর্যাদা আর সম্ভ্রম রক্ষা করতে, বছরের-পর-বছর কাটাতো এই দুর্গের টহলদারি করে।

কাস্তিলো সান ফিলিপে এল মোরো দুর্গ – ১

কাস্তিলো সান ফিলিপে এল মোরো দুর্গ – ২

ট্রলি থেকে নেমে দেখি এক বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠের ওপরে পাহাড়ের গা ঘেঁষে বিশাল পাথরের দুর্গ। দুর্গের ওপারে গভীর খাদের তলায় নীলা-পান্না গুঁড়ো মাখা সমুদ্র। সে যে কখন আকাশে গিয়ে মিশেছে তা কে জানে! দুর্গের ফটকে তিনটে পতাকা উড়ছে – মার্কিনী পতাকা, পুয়ের্তো রিকান পতাকা আর পুরোনো স্প্যানিশ মিলিটারি পতাকা। সব ঠাকুরের কাছেই একবার মাথা ঠেকানো আর কি! প্রধান ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলেই বিশাল প্লাজা অথবা চত্বর যেখানে সৈনিকরা রোজ কুচকাওয়াজের জন্য সমবেত হত। ঠিক মাঝখানে একটি বিশাল কুয়ো রয়েছে যেখানে এক বছরের মতো বৃষ্টির জল ধরে রাখা হতো। সাধারণ সৈনিকেরা থাকতো পাথরের তৈরি ছোটো ছোটো ঘরে আর আলাদা আরেকটু বড়ো ঘরে থাকতো উচ্চপদে আসীন অফিসাররা। বিশাল চত্বরের পাশে একটি প্রার্থনা কক্ষ সেখানে বিরাট তৈলচিত্রে রয়েছে সৈনিকদের পূজনীয়া ১৫৩১ সালে আঁকা আলেহো ফার্নান্দেজের (Alejo Fernandez) ভার্জিন অফ দ্য নেভিগেটর (Virgin of the navigator)। দেখলাম ভার্জিন দুই হাতে আগলে রেখেছে ক্রিস্টোফার কলম্বাস এবং অন্যান্য নাবিকদের। সামনে উত্তাল তরঙ্গে কয়েকটি জাহাজ ভাসছে। শত্রুপক্ষ আক্রমণ করলে হয়তো এই প্রার্থনাকক্ষে এসে জমায়েত হত নাবিকের দল- একটু ভরসার সন্ধানে।

ফার্নান্দেজের তৈলচিত্র ভার্জিন অফ দ্য নেভিগেটর

দুর্গের ফটকে উড়ছে তিনটি পতাকা

এছাড়া দুর্গের সাতাত্তরটি সিঁড়ি ভেঙে দেখলাম রান্নাঘর, ভাঁড়ার-ঘর, অস্ত্রাগার, বন্দিশালা, কামান কক্ষ ইত্যাদি। ছোটো ছোটো সুড়ঙ্গ পেরিয়ে সান্ত্রীর খুপরি। তার জানালায় চোখ রাখলে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত সমুদ্র দেখা যায়। দূরে কোন শত্রু জাহাজ দেখা গেলেই এই  খুপরি থেকে খবর যেত অস্ত্রাগারে। ধীরে ধীরে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে স্পেনের পরাক্রম অস্তমিত হল। পুয়ের্তো রিকো আর কিউবা ছাড়া, বেশিরভাগ স্পেনের উপনিবেশ ক্রমপর্যায়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করল। স্পেনের রাজার স্মৃতি থেকে অপসৃয়মান হল এল মোরোর দুর্গ প্রহরীরা। ক্রমে ক্রমে সৈনিকদের রসদ ফুরিয়ে আসতে থাকে, বিশাল কামান গুলিতে জং ধরতে থাকে, সিফিলিস আর ডিসেন্ট্রি ছারখার করতে থাকে তাদের শরীর। ঘরবাড়ি থেকে বহুদূরে, রুগ্ন ভগ্নমনোরথ স্প্যানিশ আর্মাডার সৈন্যরা ভাবতে থাকে, ‘তবে কি রাজা আমাদের কথা ভুলে গেলেন?’ অবশেষে মার্কিন জেনারেল নেলসন মাইলসের (Nelson Miles)  নেতৃত্বে, ১৮৯৮ সালে সান হুয়ান স্পেন থেকে হস্তান্তরিত হয় আর এল মোরো দুর্গে উড়তে থাকে মার্কিনী পতাকা।

স্প্যানিশ আর্মাডার সৈন্যরা

অনেকটা সময় নিয়ে সবকিছু মন ভরে দেখে যখন বাইরে এলাম তখন সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। একটু হেঁটে শহরের রেস্তোরা অঞ্চলে পৌঁছে দেখলাম একটা সাইনবোর্ডে লেখা আছে ‘শেফ রমেশ পিল্লাইস তন্ত্র’ (Chef Ramesh Pillai's Tantra)। ব্যাস আর কোনো কথা নেই! তন্ত্র নামের রেস্তোরাঁয় ঢুকে দেখি লালচে দেওয়ালে রাজস্থানী পিতলের আর কাঠের নকশা করা জানালা, কালো পাথরের গণেশ, দেওয়ালে ঝোলানো হাতপাখা, ইত্যাদি সাজিয়ে একটা ভারতীয় পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করেছেন শ্রী পিল্লাই। আবছায়া নরম আলো রয়েছে যাতে সকলকেই ভালো দেখতে লাগে৷ হালকা আওয়াজে পাঞ্জাবি লোকসংগীত শোনা যাচ্ছিল৷ টেবিলে বসতেই পরিবেশক আমার সামনে প্রথমে একটা ড্রিঙ্কস মেনু নিয়ে এলেন৷ সেটি দেখে আমি শ্রী পিল্লাইয়ের ব্যবসা বুদ্ধির তারিফ না করে পারলাম না৷ যেহেতু ভারতীয় খাবারের দোকান, তাই পানীয়ের নামে বেশ একটা প্রাচ্য রোমান্স এনেছেন তিনি। পনেরো রকম মার্টিনি রয়েছে মেনুতে – যার নাম গুলো হল তন্ত্র মার্টিনি, চিলি পেপার মার্টিনি, সেডাকশন মার্টিনি, কার্ডামম স্পাইস মার্টিনি, কামসূত্র মার্টিনি ইত্যাদি! পরিবেশককে বেশ খানিকটা নিরাশ করে বললাম, ‘এ গ্লাস অফ ওয়াটার উইথ ওয়ান কিউব অফ আইস প্লিজ!’ তবে বলার কায়দা দেখে মনে হবে যেন  ০০৭ রুপী শন কনারি  মার্টিনি অর্ডার করে বলছেন ‘শেকেন নট স্টার্ড’ (shaken not stirred)!

শেফ রমেশ পিল্লাই'স তন্ত্র

খাবার মেনুতে নানারকম নামের কায়দা অতিক্রম করে বেশ ছাপোষা গোছের চিকেন কারি উইথ বাসমতি রাইস খেয়ে ক্ষুন্নিবৃত্তি করা গেল। তবে শ্রী পিল্লাই ভাত পরিবেশন করেছে একটা চমকপ্রদ পাপড়ের তৈরি বাটিতে। বিল মিটিয়ে পরিবেশককে বললাম ‘শ্রী পিল্লাইয়ের সাথে একটু দেখা করা যাবে কি?’ খানিক বাদেই এক ভারতীয় ভদ্রলোক কালো শার্ট, জিন্স আর কালো এপ্রন পরে এসে দাঁড়ালেন। আমি রান্না আর রেস্তোরাঁর প্রশংসা করে নমস্কার জানিয়ে চলে আসব তখন উনি বললেন, ‘একটু বসে যান, এক্ষুনি আমাদের নাচের অনুষ্ঠান শুরু হবে।’ আমার তেমন ফেরবার তাড়া ছিল না আর তাছাড়া বিদেশ-বিভুঁইয়ে ভারতীয় নাচের অনুষ্ঠান দেখতে পাওয়াটাও তো কম কথা নয়।

ট্রলি থেকে নেমে দেখি এক বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠের ওপরে পাহাড়ের গা ঘেঁষে বিশাল পাথরের দুর্গ। দুর্গের ওপারে গভীর খাদের তলায় নীলা-পান্না গুঁড়ো মাখা সমুদ্র। সে যে কখন আকাশে গিয়ে মিশেছে তা কে জানে! দুর্গের ফটকে তিনটে পতাকা উড়ছে – মার্কিনী পতাকা, পুয়ের্তো রিকান পতাকা আর পুরোনো স্প্যানিশ মিলিটারি পতাকা।

ধীরে ধীরে রেস্তোরাঁয় ভিড় বাড়লো। ক্রুজ জাহাজের মার্কিনি পর্যটকেরা দলে দলে রেস্তোরাঁয় এসে টেবিলগুলো ভর্তি করতে লাগলেন৷ হঠাৎ বেশ একটা জগঝম্প বাজনা বেজে উঠলো আর মনোমোহিনী পোশাকে এক জন নর্তকী সেই বাজনার তালে তালে টেবিলের পাশ গুলোতে ঘুরে ঘুরে নাচতে শুরু করলেন। নর্তকীর পোশাক এবং ধরনধারণ অনেকটা গুরু সিনেমার মল্লিকা শেরাওয়াতের মতো। সিনেমায় ধীরুভাই আম্বানি ওরফে গুরুরাজ যখন তুরস্কে গিয়েছিলেন তখন এই ধরনের একটা নাচের দৃশ্য দেখেছিলাম বটে৷ মার্কিনিদের ভূগোল জ্ঞান এমনিতেই বেশ সীমিত। তার ওপরে গোটা পাঁচেক কামসূত্র মার্টিনি খেয়ে তারা যে তুরস্ক আর ভারতবর্ষ গুলিয়ে ফেলবে সে আর এমন কী! পর্যটকেরা উল্লসিত হয়ে ঔপনিবেশিক ডলার গুঁজে দিচ্ছিলেন নর্তকীর শরীরে।

কামসূত্র মার্টিনি

জাহাজে ফিরে ঘুম আসছিল না অনেকক্ষণ। কেবিনের নরম আলোয়, কামসূত্র মার্টিনিতে আলতো চুমুক দিয়ে খোশমেজাজে গল্পে মশগুল মল্লিকা শেরাওয়াত আর স্পেনের রাজা চার্লস৷ রাজা ভুলে গেছেন এল মোরোর দুর্গ প্রহরীদের কথা – ভুলে গেছেন আড়াইশো বছর ধরে তিল তিল করে তৈরি ডিফেন্স অফ দ্য ফাস্ট অর্ডারকে। দরজার বাইরে ত্রস্ত, কুণ্ঠিত প্রহরী আলতো টোকা দিয়ে গেল রাজার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টায়৷ বর্তমানে অনুরক্ত রাজাকে আলতো টোকা দিয়ে গেল অতীত…

‘আধেকলীন হৃদয়ে দূরগামী

ব্যথার মাঝে ঘুমিয়ে পড়ি আমি

সহসা শুনি রাতের কড়ানাড়া

‘অবনী বাড়ি আছো?’

চলবে…

*বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ করেছেন আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস মেরিটাইম অ্যাকাডেমির অধ্যাপিকা মধুবাণী ঘোষ (Madhubani Ghosh)। অবিশ্বাস্য সেই ভ্রমণ কাহিনি ধারাবাহিকভাবে প্রতি সোমবার বেলা ১২টায় প্রকাশিত হচ্ছে বঙ্গদর্শনে। আগের পর্বগুলি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।

Developed by DXDasia