বিনা পয়সায় চিকিৎসাকে তিনি মনে করেন জীবনের ব্রত
যারা আর্থিক দিক থেকে অনগ্রসর বা পিছিয়ে পড়া, তাদেরকে বিনামূল্যে চিকিৎসা এমনকি ওষুধ বিলি করে বিগত ক’বছর ধরে শিলিগুড়ি ও তার আশপাশে চর্চর বিষয় হয়ে উঠেছেন এক চিকিৎসক। করোনা পরিস্থিতিতে মানুষের সেবায় অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন। তিনি ডাঃ শীর্ষেন্দু পাল।
প্রায় প্রতি রবিবারই তিনি আর্থিকভাবে অনগ্রসর বিভিন্ন এলাকায় যান। আর বিনামূল্যে চিকিৎসা শিবির করেন। পুজোর আগেও তিনি ডুয়ার্সের কেরন চা বাগানের অসুর সম্প্রদায় অধ্যুষিত গ্রামে গিয়ে শিবির করেছেন। এর বাইরে এনজেপি স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম শিশু কিংবা কাওয়াখালির বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে নিয়মিত তিনি স্বাস্থ্য শিবির করে ওষুধ বিলি করে থাকেন। বস্ত্র এবং খাদ্য সামগ্রীও বিলি করেন তাঁদের।
বিনা পয়সায় চিকিৎসাকে তিনি মনে করেন জীবনের ব্রত
লকডাউনের সময় গত এপ্রিল-মে মাসে শিলিগুড়ি বা উত্তরবঙ্গে যখন অনেক ডাক্তারকে প্রাইভেট চেম্বারেও পাওয়া যায়নি, তখন ডাক্তার পাল নিয়মিত রোগী দেখেছেন। এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য, “করোনা ছাড়া আরও অনেক রোগ আছে। করোনার ভয়ে ডাক্তাররা সব রোগী দেখা বন্ধ করে দিলে সাধারণ রোগীরা যাবেন কোথায়?” আর্থিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়া মানুষদের বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার পিছনে তাঁর যুক্তি হলো, “যার সার্মথ্য আছে চিকিৎসা করার তাদের বিষয়টি আলাদা, কিন্তু যাদের সার্মথ্য নেই তাদের কী হবে? তাই তাদের পাশে আমি আছি।”
করোনা পরিস্থিতিতে মানুষের সেবায় অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন
আদতে কলকাতার সল্টলেকের বাসিন্দা এই চিকিৎসক। তাঁর বাবা শ্রীশ পাল ছিলেন কোল ইন্ডিয়ার চিফ ফিনান্স ম্যানেজার। তবে ছোটোবেলায় আসানসোলের স্কুলে তাঁর পড়াশোনা। অঙ্ক ও ফিজিক্স পড়তে ভালো লাগত। যদিও জয়েন্ট এন্ট্রান্সে মেডিক্যাল এবং ইঞ্জিনিয়ারিং দুটোতেই সুযোগ হয়। শেষে বেছে নেন ডাক্তারিকেই। ১৯৯১ সালে কলকাতার নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে তিনি এমবিবিএস পাশ করেন। পরে ২০০৪ সালে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমডি উত্তীর্ণ হন। চিকিৎসক হিসাবে অনেক জায়গাতেই কাজ করেছেন। ১৯৯৪ সালে বিএসএফ এবং সেনার মিলিত ইউনিফায়েড কমান্ডোর ডাক্তার হিসাবে তিনি জন্মু-কাশ্মীরের শ্রীনগরে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালে এই রাজ্যের হেলথ সার্ভিসের ডাক্তার হিসাবে কাজে যোগ দেন। বাঁকুড়া জেলার সাঁওতাল অধ্যুষিত গ্রাম হারমাড়সাতে তিনি প্রথম একটি সরকারি প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসক হিসাবে কাজে যোগ দিয়ে নজির তৈরি করেন ৯৬ সালে। সেই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ডাকাতির ভয়ে অনেক ডাক্তার যেতে সাহস পেতেন না। সেই শয্যাবিহীন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে শয্যা অনুমোদন করানো এবং বিদ্যুৎ নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেন তিনি। পরবর্তীতে নয়া দিল্লির এইমস হাসপাতাল থেকে শুরু করে এরাজ্যের বিভিন্ন হাসপাতালে কাজ করেছেন। শিলিগুড়ি জেলা হাসপাতাল থেকে উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসকের কাজ করে একপ্রকার এখন সরকারি চাকরিকে বিদায় দিয়েছেন।

এই চিকিৎসক আদতে সল্টলেকের বাসিন্দা
১৯৬৮ সালে তাঁর জন্ম। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরের অনেক আলোচনা সভাতেও তিনি যোগ দিয়েছেন শিলিগুড়ি থেকে। ডায়াবেটিস নিয়ে বহু বিশিষ্টদের সামনে নিজের বক্তব্য মেলে ধরেছেন। বিভিন্ন চিকিৎসক সংগঠনের দায়িত্বও তিনি সামলেছেন। পেয়েছেন অনেক সংবর্ধনাও। তবে এখন আর্থিকভাবে অনগ্রসর এবং অত্যন্ত প্রান্তিকদের সময় পেলেই বিনা পয়সায় চিকিৎসা সেবা দেওয়া তিনি জীবনের একটি বড়ো ব্রত বলে মনে করেন। আর অপরদিকে সম্পূর্ণ সচেতনতা মেনে পিপিই কিট পড়ে এবং মুখে মাস্ক বেঁধে করোনা আক্রান্তদেরও চিকিৎসা করছেন তিনি। বহু করোনা আক্রান্ত তাঁর চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে উঠেছেন।
ছবি – প্রতিবেদক