ঠিকুজি-কোষ্ঠী দেখে নয়, বিয়ে হোক থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা করে : বার্তা দিবস-তৃষিতার বিয়ের কার্ডে

কার্ডের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন একটি পুস্তিকা

রাঠিকুজি-কোষ্ঠী মিলিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসা এই সমাজের অন্যতম প্রথা। গ্রহ, নক্ষত্র, লগ্ন বিচার করে সে সব বিয়ের দৃশ্য আবার সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্রে ঘটা করে দেখানো হয়। আমজনতা বছরের পর বছর সে সবই বিশ্বাস করেন। সেই বিশ্বাসে ভর করে বিয়েতে এখন নতুন নতুন অনুষঙ্গ জুড়েছে প্রি ওয়েডিং শ্যুট, ডেস্টিনেশন ম্যারেজ থেকে সংগীত পর্যন্ত। কিন্তু বিজ্ঞান বলে, শুধু বিশ্বাসেই সব বস্তু মেলে না। তাই বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা (Thalassemia Test) করতে বলা হয়। কিন্তু সবাই সে দিকে গুরুত্ব দেন কি?

প্রশ্নটা ভাবিয়েছিল খড়দহের বাসিন্দা শক্তিব্রত ওরফে পূজন দত্তকে। পূজনবাবু একজন সমাজসেবী। বিপদে আপদে অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ান তিনি। স্বাস্থ্য ও সমাজ বিষয়ক সচেতনতা গড়ে তুলতে তিনি রীতিমতো বদ্ধ পরিকর। আগামী ১৫ ডিসেম্বর তাঁর মেয়ের বিয়ে। এবার তিনি মেয়ের বিয়ের কার্ডে সমাজ সচেতনতার বার্তা দিচ্ছেন।

চমৎকার একটি বিয়ের কার্ডের প্রচ্ছদ। তার মধ্যে তিনি একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ‘সাত পা পথ’ নামের একটি পুস্তিকার বন্দোবস্ত করেছেন। যাতে গল্পের ছলে লেখা রয়েছে, বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া রুখতে রক্ত পরীক্ষা কতটা দরকার। বিজ্ঞানের কচকচিতে না গিয়ে সুলিখিত গল্পের মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়া সংক্রান্ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সেখানে দেওয়া রয়েছে।

চমৎকার একটি বিয়ের কার্ডের প্রচ্ছদ। তার মধ্যে তিনি একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ‘সাত পা পথ’ নামের একটি পুস্তিকার বন্দোবস্ত করেছেন। যাতে গল্পের ছলে লেখা রয়েছে, বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া রুখতে রক্ত পরীক্ষা কতটা দরকার।

বিয়ের কার্ড মূলত একটি আনন্দ অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ অতিথিদের। তাই কার্ডে বিয়ের দিনক্ষণ, লগ্ন, পাত্র পাত্রীর নাম ও বংশ পরিচয় লেখা থাকে। নিমন্ত্রিতরা সেই কার্ড পেয়ে বিবাহ মণ্ডপে হাজির হন। এসব ভীষণ সাধারণ রীতি। বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ ধরে বিয়ে এভাবেই হয়ে আসছে। কিন্তু কজন অতিথি-অভ্যাগতরা বা পাত্র-পাত্রীর বাড়ির সদস্য খেয়াল রাখেন যে বিয়ের আগে এই থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষার ব্যাপারটা কতটা জরুরি? অথচ থ্যালাসেমিয়া একটা মারাত্মক অসুখ, যেখানে রোগীর রক্তে হিমোগ্লোবিন ক্রমেই কমতে থাকে। রোগীকে বাইরে থেকে রক্ত দিতে হয়। বলা হয়, থ্যালাসেমিয়া রক্তের একটি বংশগত অসুখ। এই রোগে শরীরে হিমোগ্লোবিন তৈরি হয় না। ফলে রোগীকে প্রয়োজনমতো মাসে মাসে রক্ত দিতে হয়। সময় মতো রক্ত না দেওয়া হলে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে।

বিয়ের পাত্রী তৃষিতা দত্ত কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে পড়াশুনো করে একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। তৃষিতা বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “খুব ছোটো থেকেই বাবাকে এই ধরনের সচেতনতা মূলক কাজ করতে দেখেছি। কিন্তু আমার চারপাশের মানুষজন থ্যালাসেমিয়া নিয়ে একদমই ওয়াকিবহাল নন। তারা ভাবেন, আমি সুস্থ মানে আমার পরের প্রজন্ম সুস্থ হবে। থ্যালাসেমিয়া বিষয়টা বিয়ের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তাই বিয়ের কার্ডে থ্যালাসেমিয়া নিয়ে পুস্তিকা দেওয়ার পরিকল্পনা বাবার মাথায় আসে।”

চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এই রোগ বাহিত হয় বাবা-মায়ের কাছ থেকে। বাবা-মা দুজনই যদি এই রোগের বাহক হয়ে থাকেন, তাহলে ২৫ শতাংশ ক্ষেত্রে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশু হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে শুধু থ্যালাসেমিয়া বাহক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং ২৫ শতাংশ ক্ষেত্রে সমান সম্পূর্ণ সুস্থ সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

এই কর্মকাণ্ডের মূল হোতা পূজনবাবু বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “প্রায় ৪০ বছর ধরে আমি স্বাস্থ্য আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। যে হারে জনসংখ্যা বাড়ছে, তাতে থ্যালাসেমিয়া বাহকও বাড়ছে। রোগীদের শুশ্রুষার ক্ষেত্রে কিছু উন্নতি হয়েছে। কিন্তু সচেতনতা একদমই বাড়েনি। যেখান থেকে থ্যালাসেমিয়াকে আটকানো যায়, সেটা জনসচেতনতা। সাধারণ মানুষ জানেন না যে থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা সরকারিভাবে বিনা পয়সায় হয়। বেসরকারিতে যার অনেক খরচ। এই সচেতনতা গড়ে তোলার একটা প্রয়াস আমার মেয়ের বিয়ের কার্ড।”

থ্যালাসেমিয়ার বাহক কিনা জানার জন্য যেকোনো সময় পরীক্ষা করা যায়। তবে আসল গুরুত্ব হচ্ছে বিয়ের সময় রক্ত পরীক্ষা। যে কেউ বাহক হতেই পারেন থ্যালাসেমিয়ার। খেয়াল রাখতে হবে, ওই ব্যক্তি যার সঙ্গে বিবাহ সূত্রে বাঁধা পড়ছেন তিনি বাহক কিনা। সেটার জন্য ঠিকুজি কোষ্ঠী বিচার করলে হবে না। দরকার থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা। একজন বাহকের সঙ্গে আর একজন বাহকের বিয়ে না হলেই থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ করা যায়। কেউ যদি থ্যালাসেমিয়ার বাহক না হন, তাহলে একজন থ্যালাসেমিয়ার বাহককে বিয়ে করতেই পারেন স্বচ্ছন্দে।

তৃষিতার বক্তব্য, “আমার বাবা-মায়ের বিয়ের আগেও থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা করা হয়েছিল। বাস্তবিকভাবে সেই সচেতনতা এখনও মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠেনি। তাই সহজভাবে মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্যই বিয়ের কার্ডে থ্যালাসেমিয়া সংক্রান্ত একটা গল্পের বইয়ের পরিকল্পনা করা হয়।”

তাঁর বিয়ের কার্ড যে মানুষকে সচেতন করতে কাজে লাগবে সে নিয়ে পাত্রী যথেষ্ট আশাবাদী। তিনি বলেন, “আমি চাইনি মানুষ কার্ডে শুধু বিয়ের তথ্যই পড়ুক। থ্যালাসেমিয়া নিয়ে বইটা যাতে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে, সেজন্য সেটা সহজ ভাষায় গল্পের ছলে বলার পরিকল্পনা করি আমরা।”

বিয়ের পাত্র দিবস সাহা পেশায় আইটি কর্মী। তিনিও এ ব্যাপারে বরাবরই উৎসাহী ছিলেন। দীর্ঘ নয় বছরের সম্পর্ক তাঁর ও তৃষিতার। তৃষিতাকে প্রথম দিন থেকে তিনিই কার্ডের এমন ছক ভাঙা চিন্তাভাবনায় উৎসাহ জোগান। বাবাকে চিরকালই মানুষের জন্য কাজ করতে দেখেছেন তৃষিতা। বরং নিজে বাবাকে কম পেয়েছেন কাছে। আজ বাবার উদ্যোগেই মানুষকে সচেতন করার দায়ভার তৃষিতা হাতে তুলে নিয়েছেন। তাঁর বিয়ের কার্ড পেলে যে কেউ জানতে পারবেন, পশ্চিমবঙ্গে আপাতত ৩৬টি থ্যালাসেমিয়া কন্ট্রোল ইউনিট রয়েছে। প্রতিটি জেলায় এই ইউনিট একটি করে রয়েছে।

তৃষিতা ও তার পরিবারের এই উদ্যোগের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ুক সাধারণ মানুষের চিন্তা ভাবনার মধ্যে। তাঁরা চান যে সাধারণ মানুষ যেন জানতে পারেন অমিতাভ বচ্চন, পিট সাম্প্রস, জিনদিনে জিদান এঁরা প্রত্যেকেই থ্যালাসেমিয়ার বাহক। এঁদের জীবনে কোনো সমস্যা আসেনি। তাই অযথা ভয় নয়, শুধু বিয়ের আগে একটা পরীক্ষাই পারে রোগকে নির্মূল করতে। শুভস্য শীঘ্রম!

Developed by DXDasia