আশির দশকের শেষ দিক, উত্তমকুমারকে নিয়ে শুরু হল আমাদের সিরিয়াল

লিখছেন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং প্রযোজক

শির দশকের শেষ দিক। অনিরুদ্ধ ধর ঠিক করলেন উত্তমকুমারকে নিয়ে একটা ডকুড্রামা বানাবেন। প্রযোজক ইন্দ্রজিৎ সেন এবং ওঁর ভাই ইন্দ্রনীল সেন। ঠিক হল দূরদর্শনের জন্য তৈরি হবে এই সিরিয়াল। থিমটা ছিল, একজন বয়স্ক পরিচালক উত্তমকুমারকে নিয়ে একটা ছবি বানাবেন। তিনি তাঁর সহকারীর উপর দায়িত্ব দিয়েছেন উত্তমকুমার যাঁদের সঙ্গে কাজ করেছেন তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে। সেই তথ্যের উপর ভিত্তি করে তৈরি হবে তাঁর ছবির চিত্রনাট্য। ইন্দ্রনীল ছিল আমার স্কুল সহপাঠী। খবরটা শুনে ইন্দ্রনীলকে বলেছিলাম, “চরিত্রটা আমায় দিবি?” তারপর এক রোববার বেহালার রায়বাহাদুর রোডে সাইকেল রিক্সায় চেপে গেলাম অনিরুদ্ধদার বাড়িতে। সেদিন পাঞ্জাবি আর জিন্স পরে গিয়েছিলাম। অনেক কথাবার্তা হল। অনিরুদ্ধদা বললো, তুমি রোলটা করো, তোমায় মানাবে। তখন অভিনয় করার খুব শখ ছিল। চরিত্রটা পেয়ে নিজের মতো করে প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম। অনিরুদ্ধ ধর নিজে এবং ওঁর সহকারীরা আমায় খুব গাইড করেছিলেন সেই সময়।

এই ধারাবাহিকে আমার চরিত্রটা ছিল একজন সহকারী পরিচালক, যে গবেষণা করছে উত্তমকুমারের উপর। গবেষণা করতে করতে সে নিজেকে আইডেন্টিফাই করছে।

এই ধারাবাহিকে আমার চরিত্রটা ছিল একজন সহকারী পরিচালক, যে গবেষণা করছে উত্তমকুমারের উপর। গবেষণা করতে করতে সে নিজেকে আইডেন্টিফাই করছে। তবে উত্তমকুমার হিসেবে নয়, তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলোর ভিতরে ক্রমশ ঢুকে যাচ্ছে সে। এ প্রসঙ্গে কিছু ঘটনার কথা মনে পড়ছে। সরযূবালাদেবীর সঙ্গে শুটিং চলাকালীন উনি আমার দাঁতের সেটিং দেখে খুব মজা করেছিলেন। অশোক মুখোপাধ্যায়ও বলেছিলেন খুব ভালো হচ্ছে। মনে আছে, চৌরঙ্গির বোর্ন অ্যান্ড শেফার্ড থেকে উত্তমকুমারের প্রচুর স্টিল পাওয়া গেল। সেটা নিয়ে আমি নাড়াচাড়া করছি, এমন একটা দৃশ্যও তোলা হয়ে গেল। চারদিন ধরে এডিট হয়ে ফাইনাল ক্যাসেট জমা পড়ল দূরদর্শনে। কিন্তু খুবই দুর্ভাগ্যের ব্যাপার, ধারাবাহিকটি মাত্র দু-তিনটে পর্ব শুটিং হয়ে বন্ধ হয়ে যায়। কোনোদিন যদি এটা আবার শুরু হয় ব্যক্তিগতভাবে খুব খুশি হবো।

যদিও এই ধারাবাহিকটির আগে, আমি অঞ্জন দত্ত পরিচালিত ‘রুদ্র সেনের ডায়েরি’-তে প্রধান গোয়েন্দা চরিত্রের সহকারীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলাম। এরপর, ১৯৯৩-এ আমি আর অনিরুদ্ধ ধর তথ্যচিত্রের আদলে একটা ছবি করেছিলাম— ‘শেষ নায়ক’। জৈন টিভির জন্য এই তথ্যচিত্রের প্রযোজক ছিলাম আমি এবং আমার স্ত্রী ইন্দ্রাণী মুখার্জি। খুব সুন্দরভাবে চিত্রনাট্য বাঁধা হয়েছিল। স্টার থিয়েটারে শুটিং করেছিলাম। কাজটা করার সময় ডিস্ট্রিবিউশন পাড়ায় সকাল-বিকেল-রাত্রি ঘুরতাম ফুটেজের জন্য। আসলে একটা ছবি করা মানে, অনেককিছুর সঙ্গে জড়িয়ে পড়া, একটা অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হওয়া, এটা একটা বড়ো প্রাপ্তি। এই কাজগুলো করতে করতে উত্তমকুমারের অভিব্যক্তি, মেথড-অ্যাক্টিং এগুলো গভীরভাবে বুঝতে পেরেছিলাম।  

 

একটা চরিত্রকে পর্দায় কত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়, চরিত্রের গভীরে কীভাবে যাওয়া যায়, সেসব বোঝানোর জন্য উত্তমকুমার অভিনীত ‘নায়ক’, ‘বাঘ বন্দি খেলা’ ইত্যাদি ছবির রেফারেন্স আমি আমার ছবির অভিনেতা-অভিনেত্রীদের দিয়ে থাকি। একজন ‘স্টার’ হিসেবে তো বটেই, সেইসঙ্গে সফল অভিনেতা হিসেবেও উত্তমকুমার আমাদের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন। 

খবরটা শুনে ইন্দ্রনীলকে বলেছিলাম, “চরিত্রটা আমায় দিবি?” তারপর এক রোববার বেহালার রায়বাহাদুর রোডে সাইকেল রিক্সায় চেপে গেলাম অনিরুদ্ধদার বাড়িতে।

উত্তমকুমারের প্রায় সমস্ত ছবিই আমার দেখা। ‘পংখীরাজ’, ‘থানা থেকে আসছি’, ‘শেষ অংক’, ‘প্লট নং ৫’, ‘অমানুষ’, ‘ধন্যি মেয়ে’, ‘দুই পৃথিবী’, ‘নায়ক’, ‘চিড়িয়াখানা’ এইসব ছবিগুলিতে তাঁর কী সুন্দর ভার্সেটাইল অভিনয় দেখতে পাই আমরা। যেন উত্তমকুমার আমাদের পরিবারেরই একজন। একটা সময় ছিল যখন ময়রা স্ট্রিটে সুপ্রিয়াদেবীর বাড়িতে প্রায়ই যেতাম। ওঁর মেয়ে সোমা ছিল আমার বন্ধু। উত্তমবাবুকে নিয়ে কত কত গল্প শুনতাম সুপ্রিয়াদেবীর মুখে। কীভাবে রেওয়াজ করতেন উত্তমকুমার, কীভাবে অভিনয় প্র্যাকটিস করতেন, এসব শুনে অনুপ্রাণিত হয়েছি বারবার। পরিচালক হিসেবে উত্তমকুমারের কাজ দেখে প্রভাবিত হই তো বটেই, একজন ভালো মানুষ হিসেবেও ওঁর থেকে অনেক অনুপ্রেরণা পাই। কেন যে পাই, তার যথার্থ বিশ্লেষণ আমি করতে পারবো না। মনে আছে, ছোটোবেলায় ক্লাস পালিয়ে নবীনায় ‘শিল্পী’ দেখেছি দু-তিন বার। আমার মায়ের সঙ্গেও একই ছবি অনেকবার করে দেখতে যেতাম।

এটা কিন্তু শুধুমাত্র বাংলা আর বাঙালিদের মধ্যেই যে সীমাবদ্ধ আছে এমন নয়, সারা পৃথিবী জুড়েই প্রচুর অবাঙালি উত্তম-অনুরাগী রয়েছেন। তাঁরা এখনও একইভাবে উত্তমকুমারকে সেলিব্রেট করেন। আসলে উত্তমকুমার আমাদের জিনে রয়ে গেছেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম উত্তমকুমারের ছবি দেখছে। ফলে কিছু জিনিস তো কালজয়ী হয়, যেগুলো থেকে যায়। যেমন, উত্তমকুমার— ‘টাইমলেস’।

Developed by DXDasia