
লড়াই, কষ্ট এবং উপার্জিত জনপ্রিয়তা — সব নিয়েই তিনি মহানায়ক
কথায় আছে, উত্তম নিশ্চিন্তে চলে অধমের সাথে/ তিনিই মধ্যম, যিনি চলেন তফাতে — বাংলা চলচ্চিত্রের মেগাস্টার ‘নায়ক’ উত্তমকুমার যদিও ইন্ডাস্ট্রিতে অধম কাউকে পাননি। তাঁর সহকর্মী অভিনেতা-টেকনিশিয়ান্সরাও ছিলেন দিকপাল। উত্তম কাজ শিখেছেন তাঁদের দেখেও। তিনিই স্বয়ং ‘ইন্ডাস্ট্রি’, কিন্তু কখনওই নিজের একচ্ছত্র অধিকার ফলাননি। কারণ তিনি একজন শিল্পী, পেশাদার শিল্পী। শিল্পীরা শিল্পের গুরুত্ব বোঝেন। বোঝেন খেটে পরিশ্রম করে উপার্জনের হাসি। এই হাসিতেই তো বুঁদ হয়ে রইল আট থেকে আশির প্রাণ। উত্তম বুড়ো হলেন না।
উত্তমকুমারকে বুড়ো হতে হয়নি। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে যাবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের এক স্মৃতিচারণ। সত্তরের দশকের শেষলগ্ন। খ্যাতির মধ্য গগনে তখন উত্তমকুমার। একদিন হঠাৎ কথাপ্রসঙ্গে সহকর্মী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে বললেন, ‘দূর আর ভালো লাগছে না!’

উত্তম-সৌমিত্র
সৌমিত্রবাবু সেদিন কষ্ট পেয়েছিলেন। উত্তমকুমারকে ঠাট্টা করে বলেছিলেন ‘‘বুড়োর রোলগুলো করতে হবে না? কোত্থেকে হবে, এখন থেকেই ভালো না লাগলে? আপনি আর আমি বুড়ো না হলে ইন্ডাস্ট্রিতে ভালো বুড়ো পাওয়া যাবে না!’’ শুনে হাসতে শুরু করলেন উত্তম।
কী আশ্চর্য! উত্তমের আর বুড়ো হয়ে ওঠা হয়নি।
কিন্তু শুরুর অধ্যায়টা একেবারেই সহজ ছিল না। হলিউড অভিনেতা গ্রেগরি পেকের ক্ষেত্রে শোনা যায়, তাঁর সঙ্গে প্রথম ছবিতে কাজ করতে গিয়ে পরিচালক বেজায় বিরক্ত ছিলেন। কিছুতেই সঠিক অভিনয়, অভিব্যক্তি তাঁর ভিতর থেকে বাইরে আনতে পারছিলেন না, এবং তিনি একপ্রকার মনস্থির করেই ফেলেছিলেন, আর যাই হোক এঁকে নিয়ে আর কাজ নয়। কিন্ত ছবি মুক্তির পরের ছবিটা ছিল একদম আলাদা। এত হাজার হাজার ভক্তের ই-মেল আসতে শুরু করে গ্রেগরির জন্য, যে বিস্মিত হন সকলেই। গ্রেগরি রাতারাতি হয়ে উঠলেন জনপ্রিয় তারকা। উত্তমকুমারের লড়াই ছিল খানিকটা এইরকম কিংবা বলা ভালো এমনও হতে পারত।
১৯৪৮ সালে পরিচালক নীতিন বসু অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে তৈরি করলেন ‘দৃষ্টিদান’ (উত্তমকুমারের প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি)। বক্সঅফিস মুখ থুবড়ে পড়ল। ‘মায়াডোর’ (উত্তমকুমার অভিনীত প্রথম ছবি) নামে একটি চলচ্চিত্রেও কাজ করেছিলেন, যেটি মুক্তি পায়নি। এরপরেও হিট দিতে পারেননি অরুণকুমার। চারদিকে বলা হল তিনি নাকি ‘ফ্লপমাস্টার জেনারেল’। থিয়েটার করতেন অরুণ। কিন্তু বুঝেছিলেন মঞ্চের অভিনয় আর পর্দায় অভিনয় একেবারে আলাদা৷ নিজেকে ভাঙতেন, গড়তেন, অসম্ভব পরীক্ষানিরীক্ষা করতেন। এই পরীক্ষানিরীক্ষা যে কেবল কাজেই আটকে ছিল এমন নয়, নিজের নামও বদলেছেন বারবার৷ অরুণকুমার চ্যাটার্জী থেকে অরুণকুমার, উত্তম চ্যাটার্জী থেকে অবশেষে উত্তমকুমার। সাল ১৯৫৬। মুক্তি পেল অগ্নিপরীক্ষা’। (যদিও তার পূর্বে ‘বসু পরিবার’ ও ‘সাড়ে চুয়াত্তর' মুক্তি পেয়েছে। এবং সেগুলিও হিট ছবি।)। এরপর বাংলা ছবিতে এল বিপ্লব। কে এলেন ইনি? এমন চোখ, এমন অমলিন হাসি, এমন রোম্যান্টিসিজম তো আগে চোখে পড়েনি।

সপ্তপদী ছবির হিট জুটি উত্তম-সুচিত্রা
‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘শাপমোচন’, ‘হারানো সুর’, ‘পথে হল দেরি’, ‘ইন্দ্রাণী’-সহ একাধিক ছবি সুপারহিট। পরিচালক-প্রযোজকরা ছবি বানাচ্ছেন উত্তমের কথা ভেবেই। নিশ্চিতভাবেই বলা যায় ‘সপ্তপদী’ উত্তমকুমারের মাইল ফলক। এরপর সত্যজিৎ রায় ‘নায়ক’ বানালেন উত্তমকে নিয়েই।
উত্তমকুমার মারা যাবার পর আনন্দবাজার পত্রিকায় সত্যজিৎ রায় স্মৃতিচারণায় বললেন, "উত্তমকুমারকে যখন প্রথম ছবিতে দেখি তখনও আমি নিজে ছবির জগতে আসিনি। নতুন একটি হিরোর আবির্ভাব হয়েছে বলে শুনছিলাম, ছবিটিও নাকি ভালো, তাই স্বাভাবিক তাগিদেই গেলাম ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ দেখতে। নির্মল দে-র ছবি, পরিচ্ছন্ন পরিচালনা, আঁটসাট চিত্রনাট্য। এই বিশেষ পরিচালকের কাজ ভালো লেগেছিল বলেই পরে দেখলাম ‘বসু পরিবার’ ও ‘চাঁপাডাঙার বউ’। তিনখানা ছবি পর পর দেখে, মনে হল উত্তমকুমারের অভিনয় ও ব্যক্তিত্বে সত্যিই একটা স্বাতন্ত্র্য আছে। ত্রিশ ও চল্লিশের দশকের দুর্গাদাস, প্রমথেশ, ধীরাজ, জহর গাঙ্গুলী প্রমুখের কাজের সঙ্গে এর বিশেষ মিল নেই। মনে হল ছেলেটি হলিউডের ছবি-টবি দেখে। অভিনয়ে থিয়েটারের গন্ধ নেই, চলায়-বলায় বেশ একটা সাবলীল স্বাচ্ছন্দ্য। ক্যামেরা বস্তুটিকে যেন বিশেষ তোয়াক্কা করে না। তার উপরে চেহারায় ও হাবেভাবে বেশ একটা মন টেনে নেওয়ার ক্ষমতা আছে। উত্তমকুমারের ভবিষ্যৎ আছে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।"
উত্তমকুমারকে দৃশ্য বোঝাচ্ছেন সত্যজিৎ রায়
এর দশ-বারো বছর পর উত্তমকুমারের সঙ্গে কাজ করলেন সত্যজিৎ রায়। সত্যজিৎ স্মৃতিচারণায় আরও বলেন, “শুধু উত্তমের কথা বলতে গেলে এটা বলা যায় যে, নায়িকার সান্নিধ্যে এলেই অনেক নায়কের মধ্যেই সিঁটিয়ে যাওয়ার ভাবটা ক্যামেরায় অব্যর্থ ভাবে ধরা পড়ে, উত্তমকুমারের মধ্যে সেটি নেই। বরং প্রেমের দৃশ্যে এঁর অভিনয় খোলে সবচেয়ে বেশি”।
‘নায়ক’-এর গল্প সত্যজিৎ লেখেন উত্তমকুমারের কথা ভেবেই। সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের এক অভিনয়-পাগল যুবক ছবিতে নেমে তরতরিয়ে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে যাচ্ছে। এমন অবস্থায় এই যুবকের মনে কী ধরনের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দেখা দিতে পারে, তার মূল্যবোধে কী পরিবর্তন হতে পারে, এ-ই ছিল গল্পের বিষয়। শোনা যায়, চিত্রনাট্য শুনে উত্তমকুমার খুব খুশি হন।তার একটা কারণ হতে পারে অবশ্যই তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে কাহিনির সাদৃশ্য। সত্যজিৎবাবু বলছেন, "আলোচনা করে বুঝলাম যে গল্পের গভীরে প্রবেশ করতে না চাইলেও, বা না পারলেও, তার চরিত্রটি কীভাবে ফুটিয়ে তুলতে হবে সেটা উত্তম মোটামুটি বুঝে নিয়েছে। তাকে আগেও বলে রেখেছিলাম যে, সে যে ধরনের প্রেমের গল্পে অভিনয় করতে অভ্যস্ত, এটা সে ধরনের গল্প নয়। সুতরাং তাকে গতানুগতিক পথ কিছুটা ছাড়তে হবে। এতে যে প্রেম আছে, তা প্রচ্ছন্ন। এতে নায়কের দোষ-গুণ দুই আছে, এবং তা যে শুধু অন্তরে তা নয়। তাকে বললাম যে তোমার গালে যে সাম্প্রতিক পানবসন্তের দাগগুলি রয়েছে, সেগুলি ক্যামেরায় বোঝা যাবে, কারণ তোমাকে মেকআপ ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।"
নায়ক ছবিতে মহানায়ক
এরপরেই সৃষ্টি হল ‘নায়ক’। পরবর্তীতে যা ইতিহাস তৈরি করবে। কিন্তু কে বুঝবে নায়কের অন্তরের ব্যথা! যে ব্যথার মাঝে প্রতিদিন ঘুমিয়ে পড়ে একা একটা জীবন। যাকে ঘিরে বাইরে এত হইচই, এত উত্তেজনা, কিন্তু তার জীবনের পথ বুঝি সংকীর্ণ! এমনই হয়। হয় বলেই শিল্পী সৃষ্টি করেন রহস্য। যে রহস্যে ডুবে যেতে চায় প্রতিটা যুগ। চেঁচিয়ে বলতে ইচ্ছা করে, 'অতিউত্তম'। উত্তমকুমারের বুড়ো হওয়া আর হল না। ভাগ্যিস, হল না!
চিড়িয়াখানা ছবিতে ব্যোমকেশ চরিত্রে উত্তমকুমার
তথ্যঋণ:
সত্যজিৎ রায়ের উক্তিটি ২৬ জুলাই, ১৯৮০ সালে আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত নিবন্ধ থেকে সংগৃহীত।
