চাঁদের পাহাড়ের চুড়োয় পা রাখা প্রজাতন্ত্র দিবসের দিন
সাইকেল যেখানে থেমেছিল:
কিবো হাটে রাত্রিযাপন। কাল চাঁদের পাহাড়ের চুড়োয় পা রাখা। এই উচ্চতায় অল্টিটিউড সিকনেস আক্রমণ করে অনেককেই। হাটের একটি মেয়েকেও করল। উত্তেজনায় ঘুম আসবে না জানি, তবু অ্যালার্ম দেওয়া থাকল রাত ১১টায়।
অ্যালার্ম বাজার আগেই জ্যাকশন হাজির। ঘুম থেকে ডেকে তুলল। গতকাল চড়াইতে সাইকেল চালিয়ে বেশ ক্লান্ত ছিলাম। তাই ঘুম গভীর হয়েছে। জ্যাকসনের হাতে এক পাত্র সুজির হালুয়া। কী ঝামেলা রে বাবা! রাত্রি ১১টায় সুজির হালুয়া খেতে হবে! যস্মিন দেশে যদাচার। খেয়ে নিলাম হালুয়া। কফি খাব বলাতে জ্যাকসন কফি নিয়ে এল। ততক্ষণে আমি ফ্রেশ হয়ে এসে ড্রেস পরা শুরু করেছি। ফ্রেশ হতে বাইরে গিয়েই টের পেলাম তাপমাত্রা বেশ কম। জায়গায় জায়গায় বরফ জমে রয়েছে। এখন আছি ৪৭২০ মিটার উচ্চতায়। আর উহুরু অর্থাৎ কিলিমাঞ্জারোর সর্বোচ্চ শিখরের উচ্চতা ৫৮৯৫ মিটার। এখনো ১১৭৫ মিটার উচ্চতা উঠব। সেখানে আরো বেশি ঠান্ডা হবে।
আরো পড়ুন
গাছমানুষের ডায়েরি – ৭
গতকাল আমার গাইড ব্রুনো যেমনভাবে চারটে স্তরে জামাকাপড় পরতে বলেছিল সেভাবেই পোশাক পরলাম। একটা হাফ হাতা টি-শার্টের ওপর একটা পুরো হাতা টি-শার্ট, তার ওপর একটা পুরো হাতা পাতলা উলিকট আর সবার ওপরে ফেদার জ্যাকেট। নিচে লম্বা বারমুডার উপর উলিকটের প্যান্ট, তার ওপর উইন্ড প্রুফ ধরনের একটা প্যান্ট। পায়ে পাতলা মোজার উপর উলের মোটা মোজা এবং জুলিয়র দেওয়া ট্রেকিং সু। হাতে মোটা চামড়ার দস্তানা, গলায় ব্যান্ডানা, মাথায় উলের টুপি। গলায় ঝুলছে রোদ চশমা, ক্যামেরা। পিঠের ব্যাগে পাইপ লাগানো জলের পাউচ, বাড়তি জলের বোতল, উপর নিচের রেইন কোট, কে্ক, ক্যাডবেরি বার।

ক্যামেরার বাড়তি ব্যাটারি জ্যাকেটের পকেটে রাখলাম যাতে শরীরের তাপে গরম থাকে। এই কিবো হাটে ক্যামেরার ব্যাটারি চার্জের কোনও ব্যবস্থা নেই। তবে ওয়ার্ডেনের ঘরে ৫ ডলার দিলে মোবাইল চার্জ করা যাচ্ছে। এই ব্যবস্থা হোরোম্বো হাটেও ছিল। সেখানে আমি ক্যামেরার ব্যাটারি চার্জ করাতে পেরেছিলাম। তার মূল্য চোকাতে আমাকে ১০০০০ তানজানিয়ান সিলিং খরচা করতে হয়েছে, যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৩০০ টাকার সমান।
কফি খেয়ে রুম থেকে বার হলাম। কাইতোও প্রায় রেডি। বাকি দুজন ফ্রেশ হতে বাইরে গেছেন। বেরিয়ে দেখি ব্রুনো রেডি হয়ে আমার বাহন আমার চেতককে ওয়ার্ডেনের অফিস ঘর থেকে বার করেছে। আমার ভেতরে ভেতরে সাংঘাতিক এক উত্তেজনা হচ্ছে। সাইকেলকে সঙ্গী করে আফ্রিকা মহাদেশের সর্বোচ্চ বিন্দু ছুঁতে চলেছি। আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা। কাউন্টডাউন শুরু। সামনের দিকে তাকিয়ে কয়েকটা আলোর বিন্দু দেখতে পেলাম। কোনো কোনো অভিযাত্রী যাত্রা শুরু করে দিয়েছেন। আমার আর তর সইছে না। আমি ব্রুনোকে তাড়া লাগালাম।
জ্যাকসন মার্টিনদের বিদায় জানিয়ে আমি, ব্রুনো আর আমার চেতক যাত্রা শুরু করলাম। আমার হাতের ঘড়িতে তখন তানজানিয়ার স্থানীয় সময় রাত ১২টা ১০ মিনিট। আজ ২৬ জানুয়ারি, ২০১৯ সাল। এখন ভারতীয় সময় রাত্রি ২টো ৪০ মিনিট। পুনে থেকে ভারতীয় দলের যে ৯ সদস্য এসেছেন তাঁরা ‘শিবাজি মহারাজ কি জয়’ নারা লাগাতে লাগাতে চলেছেন। ওঁরাও প্রজাতন্ত্র দিবসকে সামিটের তারিখ হিসেবে বেছেছেন। আমরা ধীরে ধীরে ওঁদের সকলকে পার হয়ে চলতে থাকলাম। পাহাড়ের খাড়া গা বেয়ে ওঠা ছোটো বড়ো নুড়িপথ। ঘন অন্ধকার। আমাদের দুজনের মাথাতেই টর্চ জ্বলছে। সেই আলোয় কোনরকমে সাইকেল ঠেলে নিয়ে চলা। ব্রুনো আমাকে হেল্প করছে।

ব্যাপারটা বেশ কষ্টকর। প্রচণ্ড দম লাগছে। আমাদের ডানদিক থেকে খুবই ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে। নাক কান দিয়ে সেই ঠান্ডা ঢুকে সারা শরীর কাঁপিয়ে দিচ্ছে। রাস্তাও ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। যত এগোচ্ছি ততোই চড়াই বাড়ছে। ঘণ্টা দুয়েক যাবার পর একটা ছোট্ট বিশ্রাম। তখন রাত্রি দুটো। মাথার ওপর এক আকাশ তারা। নিচের দিকে তাকালে সারি দিয়ে আলোর বিন্দু। অভিযাত্রীদের টর্চের আলো। আমাদের আগে আর কেউ নেই। বিশ্রামের সময় এক টুকরো কেক আর একটু জল খেলাম। ব্রুনো একদম চাঙ্গা। বারবার আমাকে জিজ্ঞেস করছে, ঠিক আছি কিনা, আমার কোন অসুবিধা হচ্ছে কিনা।
এখনো পর্যন্ত সাইকেল চালাবার মতো কোনো জায়গা পাওয়া যায়নি। কাজেই বাহনকে বহন করে নিয়েই চলেছি। কিছুক্ষণ পর শুরু হল বড়ো বোল্ডারের অঞ্চল। এখানে বাহন আমার কাঁধে চাপল। কখনো ব্রুনোও সাহায্য করছে। বেশ কষ্টকর ব্যাপার। এতটাই কষ্ট হচ্ছিল যে মনে হল সাইকেলকে এখানে রেখে সামিট করে আসি। ফেরার পথে আবার নিয়ে যাব। ব্রুনো আমার সে প্রস্তাব এক কথায় উড়িয়ে দিল। বলল, “কমান্ডার তোমার স্বপ্ন পূরণ হবেই। আমি তোমাকে তোমার স্বপ্ন পূরণে সবরকম সাহায্য করব।” আবার নতুন করে দম পেলাম। নতুন উদ্যমে চড়াই উঠতে শুরু করলাম।
ঠান্ডা বেশ বেড়েছে। সাইকেলের সিট-এর উপর পাতলা বরফের আস্তরণ। জলের পাইপে টান দিয়ে দেখি জল আসছে না। পিঠের পাউচে জল জমে বরফ হয়ে গেছে। বড়ো পাথরের তলায় আইস সিকল্ ঝুলছে। ঘণ্টা দুয়েক কোনোরকমে টেনে-হিঁচড়ে চড়লাম। আর যেন পারি না। ব্রুনোকে বারবার জিজ্ঞেস করছি, আর কতটা দূর গিলম্যানস পয়েন্ট? আগে জেনেছিলাম এই খারাপ চড়াইটা গিলমেন্স পয়েন্টে গিয়ে শেষ হচ্ছে। বাকি পথটা অর্থাৎ গিলমেন্স পয়েন্ট থেকে স্টেলা পয়েন্ট হয়ে সর্বোচ্চ স্থান উহুরু পর্যন্ত রাস্তাটা খাড়াই নয়। ওটা ক্রেটার বরাবর। তাই আমার ব্যাকুল প্রশ্ন, গিলম্যানস পয়েন্ট আর কতটা পথ। ব্রুনো ওপরের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, “আরেকটু চলো।” মনে হল, আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে।
আরো পড়ুন
গাছমানুষের ডায়েরি-১
উপরের দিকে তাকিয়ে দেখতে গিয়ে একটা বড়ো পাথরে হোঁচট খেয়ে পড়লাম। ভাগ্যিস আমার চে্তক এখন ব্রুনোর জিম্মায়। না হলে আমি ব্যালেন্স হারিয়ে বেশ অনেকটা নিচেই পড়ে যেতাম। শরীর আর সত্যিই সঙ্গ দিচ্ছে না। মিনিট কুড়ি এইভাবে যাওয়ার পর চারপাশটা হঠাৎ যেন বদলে গেল। সামনে দুটো খুঁটিতে লাগানো চারটে কাঠের ফালি। তাতে উপরে লেখা- মাউন্ট কিলিমাঞ্জারো। পরপর লেখা- ‘কনগ্রাচুলেশন্স, ইউ আর নাউ এ্যাট্ গিলমেন্স পয়েন্ট, ৫৬৮৫ মিটার, ১৮৬৫২ ফুট এএমএসএল (এভারেজ মিন সি লেভেল) তানজানিয়া’। তখন সময় ভোর চারটে কুড়ি মিনিট। মাউন্ট কিলিমাঞ্জারো ক্রেটারের মাথায় তিনটে সামিট পয়েন্টের এটা একটা পয়েন্ট।

চোখের সামনে এই লেখা দেখে অদ্ভুত এক ভালো লাগায় আপ্লুত হলো মন। আমি পেরেছি। ব্রুনোকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম আনন্দে। বলল, আর চড়াই নেই। চলো আস্তে আস্তে। কিলিমাঞ্জারো ক্রে্টারের মুখের ধার ধরে ধরে চললাম। ভোরের ঠান্ডায় বরফ শক্ত হয়ে জমে আছে। তার ওপর বিভিন্ন অভিযাত্রীদের হেঁটে যাবার ফলে একটা ট্রেল ডিপ্রেশন হয়ে রয়েছে। সেটা দিয়ে একজন মানুষ হাঁটতে পারে। কিন্তু আমি একা নই। সঙ্গে আমার চেতক। পাশাপাশি ঠেলে নিয়ে যেতে বেশ ঝামেলা। ব্রুনোর সাহায্যে কোনোরকমে ঠেলে ঠেলে পৌঁছলাম স্টেলা পয়েন্ট।
এখানেও একইরকম বোর্ড। উচ্চতা বদলে হয়েছে ৫৭৫৬ মিটার অর্থাৎ ১৮৮৮৫ ফুট। অন্য একটা রুট এখানে এসে মিশেছে। সেই রাস্তা দিয়ে উঠে আসছেন দেশ-বিদেশের অভিযাত্রীরা। সারা রাত্রের ক্লাইম্বিং-এ সকলেই ক্লান্ত। কিন্তু চুড়োয় পৌঁছানোর আনন্দে সকলেরই চোখ-মুখ উদ্ভাসিত। এদিকে রাতের অন্ধকার কেটে ভোরের আলো ফুটছে। সামনে কিছু দূরে কয়েকজন মানুষ দুই হাত তুলে পরস্পরকে আলিঙ্গন করছেন। বুঝলাম, ওটাই সেই স্বপ্নের আফ্রিকা মহাদেশের সর্বোচ্চ বিন্দু, আমার ছোটোবেলাকার চাঁদের পাহাড়ের চুড়ো।

পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম সেই বিন্দুতে। দুটো খুঁটির মাঝে ওই একই রকম বোর্ড। পাঁচটা ফালি কাঠের টুকরো। ‘মাউন্ট কিলিমাঞ্জারো, কনগ্রাচুলেশন্স ইউ আর নাউ এ্যাট উহুরু পিক, তানজানিয়া, ৫৮৯৫ মিটার ১৯৩৪১ ফুট, এএমএসএল, আফ্রিকা’স হায়েস্ট পয়েন্ট ওয়ার্ল্ড হাইয়েস্ট ফ্রি স্ট্যান্ডিং মাউন্টেন, ওয়ান অফ ওয়ার্ল্ড’স লার্জেস্ট ভলক্যানোস, ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ অ্যান্ড ওয়ান্ডার অফ আফ্রিকা’।
আমার হাত ঘড়িতে সময় কাটায় কাটায় সকাল ছয়টা। তানজানিয়ার স্থানীয় সময়। পিঠের ব্যাগ থেকে বার করলাম আমার দেশের জাতীয় পতাকা। ভারতীয় সময় সকাল সাড়ে আটটা। আজ ২৬ জানুয়ারি ২০১৯। ভারতবর্ষের ৭০তম প্রজাতন্ত্র দিবস। এই মুহূর্তে ভারতের বিভিন্ন জায়গায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন হচ্ছে। আর আমি উজ্জ্বল, প্রথম ভারতীয় হিসেবে সাইকেল নিয়ে আফ্রিকা মহাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কিলিমাঞ্জারোর উহুরু পিকে ভারতের জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে দাড়িয়ে। নতুন প্রভাতের সোনালি সূর্য কিরণ আমাকে রাঙিয়ে দিচ্ছে। আমি পেরেছি। আমি গর্বিত।

একে একে আমার ক্লাব সোনারপুর আরোহীর পতাকা নিয়ে, আমার যাত্রা ‘গ্রিন অন হুইল’- র ব্যানার নিয়ে, আমার রাজ্যের বিশ্ব বাংলার প্রতীক নিয়ে ছবি তুললাম। -১৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় ব্রুনোর হাত কাঁপছে, তাই সব ছবি কাঁপা কাঁপা। মন ভরে চারিপাশ দেখলাম। এখান থেকে অনেক নিচে আগ্নেয়গিরির মুখ। জায়গায় জায়গায় বরফ। বাইরের দিকে সোজা নেমে গেছে পাহাড়ের খাড়া ঢাল। মাঝে মাঝে অদ্ভুত সুন্দর দেখতে বরফের খাড়া দেয়াল। এই অংশটা নিচের থেকে বরফে মোড়া দেখতে পাওয়া যায়। প্রচণ্ড ঠান্ডায় আর দাঁড়ানো যাচ্ছে না। মিনিট কয়েক কাটিয়ে ফিরতি পথ ধরলাম।
সামিট থেকে কিবোহাট। সেখানে লাঞ্চ সেরে হোরোম্বো হাট হয়ে নেমে গেলাম কিলেমা গেট। সন্ধে সাতটায় মোসি শহরে পৌঁছে গেলাম।
(চলবে)