গাছমানুষের ডায়েরি-১

সাইকেল নিয়ে চাঁদের পাহাড়ের চুড়োয়

তখন স্থানীয় সময় কাঁটায় কাঁটায় সকাল ছটা। ভারতবর্ষে তখন সকাল সাড়ে আটটা। লালে লাল পূর্ব দিগন্ত সূর্যদেবের আগমনবার্তা ঘোষণা করছে। আজ আমার দেশ ভারতবর্ষের ৭০তম প্রজাতন্ত্র দিবস। এই মুহূর্তে সারাদেশে দিকে দিকে তেরঙা জাতীয় পতাকা উত্তোলন হচ্ছে। আর আমি উজ্জ্বল এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছি আফ্রিকা মহাদেশের সর্বোচ্চ পর্বত কিলিমানজারোর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ উহুরুর মাথায়। সঙ্গে আমার সব সময়ের সঙ্গী আমার বাহন, আমার সাইকেল—‘চেতক’ যার হ্যান্ডেলে লাগানো আমার দেশের জাতীয় পতাকা। আমি পেরেছি, প্রথম ভারতীয় হিসেবে, প্রথম বাঙালি হিসেবে সাইকেল সঙ্গে নিয়ে কিলিমাঞ্জারোর শৃঙ্গে উঠতে। অসম্ভব একটা ভালোলাগা তৈরি হল।

সাইকেলে পৃথিবী ভ্রমণের এই পঞ্চম ধাপের প্রস্তুতিপর্বে যখন মানচিত্র নিয়ে বসে যাত্রাপথ তৈরি করছিলাম তখনই এই স্বপ্নের জাল বোনা হয়েছিল। ছোটোবেলাকার স্বপ্ন চাঁদের পাহাড়কে একবার ছুঁয়ে দেখার। সেভাবেই প্রস্তুত করলাম খুফুর পিরামিড থেকে চাঁদের পাহাড়ের যাত্রাপথ। ২৭ অক্টোবর ২০১৮, আমার বাহন ‘চেতক’কে সঙ্গে নিয়ে কলকাতা থেকে উড়ে গেলাম পিরামিডের দেশ মিশরে। প্রাচীনকালের মিশর বা আজকের ইজিপ্টের রাজধানী কায়রো থেকে শুরু হল আমার ‘গ্রিন অন হুইল’-এর একক সাইকেল যাত্রা। সঙ্গে বার্তা—“সারা জীবনে অন্তত একটি গাছ লাগান এবং তাকে বড় করে তুলুন।” 

নীলনদের ধার ধরে ধরে, কখনো মরুভূমির মধ্যে দিয়ে ছুটে চলা রাস্তা ধরে পার হলাম ইজিপ্ট, সুদান। তারপর, একে একে ইথিওপিয়া, কেনিয়া পার হয়ে প্রবেশ করলাম তানজানিয়ায়। বিভূতিভূষণের ‘চাঁদের পাহাড়’-এর নায়ক শঙ্কর রেল কোম্পানির চাকরি সূত্রে ছিল কেনিয়ার মোম্বাসায়। সেখানেই তার সঙ্গে আলাপ হয় বিখ্যাত পরিব্রাজক, ভ্রমণপিপাসু, স্বর্ণ-সন্ধানী আল্‌ভারেজ-এর। আমার সেই ছোটোবেলাকার স্বপ্নশহর শঙ্করের মোম্বাসা ছুঁয়ে আমি চললাম তানজানিয়ার দিকে। 

‘ভয়’ শহর পার হয়ে রাস্তা ভাগ হল। সোজা রাস্তা গেল কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবির দিকে। আমার রাস্তা বাঁ দিকে বাঁক নিল কেনিয়া-তানজানিয়া বর্ডারের দিকে। ছোটো ছোটো জনবসতি, উঁচু-নিচু পাহাড়ি রাস্তা, পাহাড়ের ঢালে সিসেলের জমি। মাঝে মাঝে আম বাগান। সেসব পার হয়ে মোম্বাসা ছেড়ে আসার চতুর্থ দিনে পৌঁছলাম বর্ডার শহর তাভেতায়। এখান থেকে বর্ডার ১২ কিলোমিটার। পরের দিন খুব সকাল সকাল বের হলাম। আসলে নতুন দেশে ঢোকার উত্তেজনায় তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙে গেছিল। যখন কেনিয়া আর তানজানিয়ার বর্ডার চেকপোস্টে পৌঁছলাম তখন ঠিক সকাল সাতটা। পাসপোর্টে তানজানিয়ার ভিসায় প্রবেশের সিলমোহর পড়ল আটটা কুড়িতে। তানজানিয়ায় পা রাখলাম ১৬ জানুয়ারিতে।

পূর্ব মধ্য আফ্রিকার এই দেশ তানজানিয়া। বর্ডারের এ’পাশের জনবসতির নাম হোলিলি। পকেটে কিছু কেনিয়ার মুদ্রা কেনিয়ান সিলিং ছিল। সেগুলো বদলে তানজানিয়ান সিলিং নিলাম। প্রবেশ গেটের সামনা-সামনি একটা খাবার জায়গা পেয়ে গেলাম। ন্যায়মা চোমা আর ব্রেড খেয়ে রওনা হলাম। একটাই পথ হোলিলি থেকে মোসি হয়ে আরুষার দিকে চলে গেছে। আমার গন্তব্য মোসি। বর্ডার থেকে মোসি ৪০ কিলোমিটার রাস্তা। মোটামুটি সমতল। মাঝে মাঝে ছোটো ছোটো জনবসতি, দোকানপাট। রাস্তার ধারে চাষের জমি। সূর্যমুখী, ভুট্টার চাষ। গাড়ির সংখ্যা ভালোই। যত এগোলাম ততই আশপাশ থেকে রাস্তা এসে মিলতে থাকল এই মেন রোডের সঙ্গে। গাড়ির সংখ্যাও বাড়তে থাকল। সকাল থেকে যে মেঘ আকাশে ঘুরপাক খাচ্ছিল সেই মেঘ এবার বর্ষাতে শুরু করল। মোসি তখনও ছয় সাত কিলোমিটার রাস্তা বাকি। 

বৃষ্টি নামল অঝোর ধারায়। এক পেট্রোল স্টেশনে দাঁড়ালাম। আমার এখনো এদেশের ফোনের সিম কার্ড নেওয়া হয়নি। তবে সৌভাগ্যক্রমে, কেনিয়ার সিম তানজানিয়াতে এখনো কাজ করছে। তাই যোগাযোগগুলো করতে পারছিলাম। আধা ঘণ্টা পর বৃষ্টি থামলে চলে এলাম মোসি নামের সেই শহরে যেখান থেকে মাউন্ট কিলিমাঞ্জারোকে হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়। 

অভিযানের জন্য যে সংস্থার সঙ্গে আমি আগে থেকেই যোগাযোগ করছিলাম সেই ‘সোট অ্যাডভেঞ্চার’-এর দুই সদস্য লিলিয়ান আর ওয়াসিম আমাকে সাদর আমন্ত্রণে ওয়েস্ট ইস্ট লজে নিয়ে গেল। এখানেই থাকার জায়গা আমার। ছিমছাম সুন্দর সাজানো এক হোটেল। পান্থপাদপ, অ্যাভোকাডো, আম গাছে ঘেরা। মানুষজনের ভিড়ভাট্টা নেই। হোটেলের এমি নামের মিষ্টি মেয়েটা ইংরেজি বুঝতে এবং বলতে পারে বলে আমার বেশ সুবিধা হয়ে গেল। লিলিয়ান এবং ওয়াসিম আমাকে স্থিতু করে দিয়ে বিদায় নিল। পরের দিন ওদের সঙ্গেই এলাম আরুষা। আসার পথে মোসি ছাড়ার কিছু পরেই ডাইনে তাকাতেই দেখা পেলাম সেই চিরকাঙ্ক্ষিত ম্যাজেস্টিক কিলিমাঞ্জারোর। আমার ছোটবেলার সেই চাঁদের পাহাড়ের। প্রথম দর্শনেই এক অদ্ভুত ভালোলাগা  তৈরি হল। মিনিট কয়েক দাঁড়ালাম আফ্রিকা মহাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতের মুখোমুখি। চারিদিক মেঘে ঢাকা। শুধু মাথাটুকু জেগে আছে। বরফে ঢাকা মুকুট। আমাকে দেখা দিয়েই মেঘের চাদরে নিজেকে জড়িয়ে নিল। 

আরুষায় বেনের গ্রিন হাউস হোস্টেলে দুদিন থেকে সেরেঙ্গেটি, গোরোংগোরো সাফারি সেরে আবার মোসিতে ফেরা ২১শে জানুয়ারি। সেরেঙ্গেটি ন্যাশনাল পার্ক সাফারির গল্প আর একদিন শোনাব। ২২শে জানুয়ারি সারাদিন ধরে চলল কিলিমাঞ্জারো অভিযানের প্রস্তুতি। ভারতবর্ষ থেকে যাত্রা শুরুর সময় অনেক মানুষই জানতেন যে এই যাত্রার শেষ পর্বে কিলিমাঞ্জারো অভিযান করব। কিন্তু, সেটা যে আমার বাহন, আমার চেতককে সঙ্গে নিয়ে– সে কথাটা গুটিকয় মানুষই কেবল জানতেন। বিখ্যাত পর্বতারোহী, আমার খুব কাছের মানুষ দীপঙ্কর দাদা– শ্রী দীপঙ্কর ঘোষ আমায় এই ব্যাপারে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। দাদা আমার মনে স্বপ্নের বীজ বুনে দিয়েছিলেন। আমি সেই বীজকে আলো বাতাস দিয়ে বড়ো করে লালন-পালন করতে করতে ভারতবর্ষ থেকে ইজিপ্ট, সুদান, ইথিওপিয়া, কেনিয়া হয়ে তানজানিয়ায় কিলিমাঞ্জারো পাহাড়ের পাদদেশে এসে পৌঁছলাম। 

রাত পোহালেই আমার সেই স্বপ্নের অভিযান শুরু হবে। সারাদিন তারই খুঁটিনাটি প্রস্তুতি চলল। সাইকেলের ব্রেক সু পাল্টানো, হ্যান্ডেলে দুই দেশ ভারতবর্ষ এবং তানজানিয়ার জাতীয় পতাকা লাগানো, চেনে একটু তেল দেওয়া, উপযুক্ত পোশাকের বন্দোবস্ত ইত্যাদি সেরে ফেলা হল। আমার অভিযান যে সংস্থার মাধ্যমে সেই সোতে অ্যাডভেঞ্চারের মূল মানুষ, যার সঙ্গে গত কয়েক মাস ধরে যোগাযোগ রেখে চলছিলাম, সেই জুলিও লুডাগো বিকেলে এল অভিযানের প্রস্তুতির তদারকিতে। ততক্ষণে লিলিয়ান, ওয়াসিম আর আমি প্রায় সব গুছিয়ে এনেছিলাম। জুলিও দুজোড়া উলের মোজা, একজোড়া ওয়াটারপ্রুফ গ্লাভস দিল। আর, ওঁর জুতোটাও খুলে আমাকে দিল সামিটে যাবার জন্য। আমি ভাবছিলাম, এরা প্রফেশনাল হলেও গত কয়েকদিনে আমি এদের বাড়ির মানুষই হয়ে গেছি। লিলিয়ান আমার ছোটো বোন, জুলিও আমার ভাই, ওয়াসিম যেন আমার দাদা। ব্যাগ গোছানো শেষ করে ওরা আমায় ডিনার করাতে নিয়ে গেল। সালামির টপিংস্‌ দেওয়া পিজ্জা আর কোকাকোলা খেয়ে ফিরলাম ওয়েস্ট ইস্ট লজে। রাত পোহালেই কিলিমাঞ্জারো অভিযান। মনে এক সাংঘাতিক উত্তেজনা নিয়ে ঘুমাতে গেলাম।

(চলবে)

Developed by DXDasia