
অসুখ, অভাবকে হারিয়ে পৌঁছে যাওয়া মানাসলুর চুড়োয়
আমরা বেসক্যাম্পের সমস্ত ক্লাইম্বাররা বেসক্যাম্প (উচ্চতা ৪,৮৯৫ মিটার) থেকে ক্যাম্প ১ (উচ্চতা ৫,৭০০ মিটার) পৌঁছাই ২৪ সেপ্টেম্বর। পরদিন, ২৫ সেপ্টেম্বর আমরা সবাই ক্যাম্প ১ থেকে ক্যাম্প ২(৬,৪০০ মিটার)-এর উদ্দেশ্যে রওনা দিই। আমি এবং আমার শেরপা স্যার পেম্বা থেন্ডুক শেরপা দুপুর ১টা নাগাদ ক্যাম্প ২-তে পৌঁছে যাই। হাতে সময় থাকার জন্য আমি এবং আমার শেরপা স্যার সিদ্ধান্ত নিই আমরা তখনই ক্যাম্প ৩-এর উদ্দেশ্যে রওনা দেব। আমরা একঘন্টার মধ্যে আমাদের আগের সমস্ত লোডফেরি করা জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে, স্যান্ডউইচ খেয়ে দুপুর ২টো নাগাদ আবার ক্যাম্প ৩ (৬,৮০০ মিটার)-এর দিকে রওনা দিই। শুধু, অস্ট্রেলিয়ান টিমের চারজন আমাদের সঙ্গে সেদিনই ক্যাম্প ৩-এর দিকে রওনা দিয়েছিল। কিন্তু, তারা সেদিন ক্যাম্প ২ আর ক্যাম্প ৩-এর মাঝামাঝি একটা জায়গায় ক্যাম্প করে থেকে যায়। কিছু বরফের দেওয়াল পেরিয়ে আমি এবং আমার শেরপা স্যার বিকেল পাঁচটায় ক্যাম্প ৩ পৌঁছে যাই। ক্যাম্প ৩-এ আগে থেকেই আর্নল্ড কোস্টার স্যারের টিম ছিল।
৬৮০০ মিটার (২২,৩১০ ফুট) উচ্চতায় পা রাখা আমার জীবনে সেই প্রথম। শুধু তাই নয়, দুদিনের রাস্তা একদিনে ক্লাইম্ব করে ৫৭০০ মিটার থেকে ৬,৮০০ মিটার উচ্চতায় পৌঁছেছিলাম সঠিক অ্যাক্লাইমেটাইজেশন প্রসেস ছাড়াই। কোনো সমস্যাই কিন্তু আমার বা শেরপা স্যারের হয়নি। পুরোপুরি সুস্থ-সবল ছিলাম। এমনকি, লো অল্টিটিউডের থেকেও বেশি শক্তিশালী মনে হচ্ছিল নিজেকে। শ্বাসনালির যে ইনফেকশনটা নেপালে আসা ইস্তকই আমাকে ভোগাচ্ছিল, সেটাও অনেকখানি ঠিক হয়ে যায় নিজে থেকেই। হাই অল্টিটিউডে ৬-৭ দিন ক্লাইম্বিং করার পর নাক দিয়ে রক্ত বেরোনোও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অনেক সুস্থ, শক্ত-সামর্থ্য হয়ে গিয়েছিলাম। পাহাড় যেন নিজে থেকেই সারিয়ে তুলছিল আমায়।
সেই রাতটা ক্যাম্প ৩-এই ছিলাম, পরদিন ২৬ সেপ্টেম্বর বিকেল ৩টেয় আমরা ক্যাম্প ৪-এ (৭,৫০০ মিটার) পৌঁছাই। রাতারাতি এই ৭০০ মিটার উচ্চতা বৃদ্ধিতেও আমার শারীরিক কোনো সমস্যা হয়নি।

এই ক্যাম্প ৪-এ ওঠার সময়ে অনেকগুলি অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সেদিনই জীবনে প্রথম ডাউন স্যুট (মাইনাস ৩০ ডিগ্রি বা ঐ ধরনের ঠাণ্ডায় পরার পোশাক) এবং সাপ্লিমেন্টারি অক্সিজেন ব্যবহার করি। কিন্তু, আমার সাপ্লিমেন্টারি অক্সিজেন সিস্টেম কাজ করছিল না। আমার অনভিজ্ঞতার কারণে আমি সেটা বুঝতেও পারিনি। অস্বস্তি হচ্ছিল বলে আমি বারবার অক্সিজেন মাস্ক খুলে দিচ্ছিলাম। বাতাস থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণেই অক্সিজেন পাচ্ছিলাম, কোনো অসুবিধা আমার হচ্ছিল না। আর ক্লাইম্ব করতে করতে ভাবছিলাম, ক্লাইম্বাররা কেন যে সাপ্লিমেন্টারি অক্সিজেন ব্যবহার করে! সিলিন্ডারের অক্সিজেনের থেকে তো বাতাস থেকেই বেশি অক্সিজেন পাওয়া যাচ্ছে।
এদিকে, যতবার আমি অক্সিজেন মাস্ক খুলে দিচ্ছি শেরপা স্যার এসে ততবার অক্সিজেন মাস্ক আরও টাইট করে লাগিয়ে দিচ্ছিলেন। তাতে আমি বাতাসের অক্সিজেন ব্যবহার করারও সেভাবে সুযোগ পাচ্ছিলাম না। আসলে শেরপা স্যার আমার ভালোর জন্যই এইসব করছিলেন। উনি তখন বুঝতেই পারেননি যে আমার অক্সিজেন সিস্টেম কাজই করছিল না। আমি বেশ কিছুদিন ধরেই শেরপা স্যারকে অনুরোধ করছিলাম যে আমি কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়াই ক্লাইম্ব করতে চাই। কিন্তু, শেরপা স্যার কিছুতেই তাতে রাজি হননি, কারণ, আমার এটা প্রথম আট হাজার মিটারের শৃঙ্গ অভিযান ছিল। তাই, ক্যাম্প ৪-এর পথে যখন সত্যিই আমার অক্সিজেন সিস্টেম কাজ করছিল না বলে বারবার অক্সিজেন মাস্ক খুলে দিচ্ছিলাম, শেরপা স্যার ভেবেছিলেন আমি বিনা অক্সিজেন-এ ক্লাইম্ব করতে চাই বলেই অক্সিজেন মাস্ক খুলে দিচ্ছি। ক্যাম্প ৪-এ পৌঁছানোর পর আমার কথা শুনে শেরপা স্যার বুঝতে পারেন, যে আমার অক্সিজেন সিস্টেম কাজই করেনি।
সেদিন এমনিতেই আমাদের প্রচুর ওজন বয়ে নিয়ে যেতে হয়েছিল। আমাদের নিজস্ব জিনিসপত্রের সঙ্গে তাঁবু, অক্সিজেন সিলিন্ডার অতিরিক্ত যোগ হয়েছিল। তা সত্ত্বেও যে আমি কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়া এবং বাতাসের অক্সিজেনও সেইভাবে ব্যবহার করার সুযোগ না পেয়েই ৭৫০০ মিটার নির্বিঘ্নে ক্লাইম্ব করে পৌঁছে গিয়েছিলাম, এটা জানতে পেরে আমার আর খুশি ধরছিল না।
এইভাবে ক্যাম্প ৪-এ পৌঁছতে পারার পর ঠিক করে নিই সামিট করার জন্য আর অপেক্ষা করব না। মানাসলুর চুড়ো যেন যেন ডাক পাঠাচ্ছিল আমায়।

রাত আড়াইটে নাগাদ শৃঙ্গের দিকে রওনা দিই। বেরবার আগে শেরপা স্যার আমার অক্সিজেন সিস্টেম ঠিক করে দেন। বাইরের তাপমাত্রা তখন মাইনাস ৩৫ ডিগ্রি। সে যে কী ঠাণ্ডা বলে বোঝানো সম্ভবই না। আমরা সমস্ত সাজ-সরঞ্জাম নিয়ে তৈরি হয়ে, ভালো করে খেয়ে দেয়ে বের হলাম। অন্ধকারে হেড টর্চের আলোয় ক্লাইম্বিং শুরু করলাম। ঠান্ডায় হাত-পা জমে যাছে। নাক-চোখ দিয়ে বেরনো জল জমে বরফ হয়ে ঝুলছে।
২৭ সেপ্টেম্বর সকাল ৭টায় সামিটে পৌঁছে যাই। যে শৃঙ্গজয়ের টাকা জোগাড়ের জন্য কলকাতার রাস্তায় একের পর এক কর্পোরেট অফিসে ঘুরে বেড়িয়েছি, প্রচণ্ড গরমে, দূষিত পরিবেশে অসুস্থ হয়ে পড়েছি, নাক দিয়ে রক্ত পড়েছে তবু অভিযান বন্ধ করিনি—সেই মানাসলুর চুড়োয় দাঁড়িয়ে আমার যে ঠিক কী অভিজ্ঞতা হচ্ছিল বলে বোঝাতে পারব না।
মানাসলু শৃঙ্গজয়ের আগে আগে আমি এবং আমার শেরপা স্যার অ্যাক্লাইমেটাইজেশন করার মতো পর্যাপ্ত সময়ও পাইনি। কারণ, আমার আর্থিক সমস্যা থাকায় কাঠমান্ডু থেকে আরিখেত রওনা দিতে আমাদের অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। আরিখেত থেকে সামাগাঁও পৌঁছাই হেলিকপ্টারে। কারণ, আরিখেত থেকে ৭ দিন হেঁটে বেসক্যাম্প যাওয়ার মতো সময় আর আমাদের হাতে ছিল না। সামাগাঁও থেকে ৫ ঘন্টা বরফ-বৃষ্টিতে ভিজে বেসক্যাম্প পৌঁছাই। আমার জ্বর, শ্বাসযন্ত্রে ইনফেকশন আরও বেড়ে গিয়েছিল। আমার কাছে কোনো ওষুধ-ও সেসময় ছিল না। দু’দিন ক্লাইম্বিং বুট পরে খানিক হাঁটা ও ক্লাইম্বিং প্রাকটিস করা এবং দু’দিন ক্যাম্প ২ অবধি লোডফেরি করাটুকুই ছিল আমার এই উচ্চতা ও পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ। এর বেশি অ্যাক্লাইমেটাইজেশনের সময় আমি পাইনি। আটহাজার মিটারের শৃঙ্গ অভিযানের জন্য এটা একেবারেই পর্যাপ্ত নয়। অন্যান্য ক্লাইম্বাররা আমার অনেক আগেই বেসক্যাম্প পৌঁছে গিয়েছিলেন। তাই, তাঁরা দু’বার ক্যাম্প ৩ (৬৮০০ মিটার) অবধি অ্যাক্লাইমেটাইজেশন করার সুযোগ পেয়েছিলেন।
আটহাজার মিটারের বেশি উচ্চতার এই ‘মৃত্যু উপত্যকায়’ সঠিক অ্যাক্লাইমেটাইজেশনের অভাবে মৃত্যুর ঘটনা প্রায়শয়ই ঘটে। কিন্তু, আমি আগেই বলেছি, বেশি উচ্চতায় আমার শরীর ভালো থাকে। নিজেকে চিনতাম বলেই এত কম প্রস্তুতিতেই মানাসলু শৃঙ্গ সামিট করার সাহস দেখাতে পেরেছিলাম। আমি জানতাম, মাউন্ট মানাসলু, হিমালয় আমায় খালি হাতে ফেরাবে না।
শুধু শারীরিক অসুবিধাই নয়, এই অভিযানের ক্ষেত্রে পদে পদে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে টাকার অভাবও। কিছু ব্যক্তিগত ঋণ নিয়ে এই বিপুল খরচসাপেক্ষ অভিযান শেষ করতে হয়েছে আমায়। ফেরার সময় হাতে টাকা ছিলই না প্রায়। অভিযানের ক্লান্তি, ধকলের পরেও তাই মিথিলা এক্সপ্রেসের জেনারেল কামরার টিকিট কাটতে হয়েছিল। আজ যখন পিছনে তাকিয়ে দেখি– মানাসলুর চুড়োয় দাঁড়িয়ে থাকার মুহূর্তগুলোকে অবিশ্বাস্য ঠেকে। ঢেউ খেলানো সাদা বরফের একের পর এক চুড়ো। সেইখানে দাঁড়িয়ে আমার মনেই পড়ছিল না অভিযানের আগেকার আর্থিক কষ্টের কথা, শরীর খারাপ নিয়েও শৃঙ্গজয়ের জেদে অটল থাকার কথা।
চারপাশে বরফচুড়োর সারি আর মাথার ওপরে আকাশ নিয়ে দাঁড়িয়ে নিজেকে পৃথিবীর সুখীতম মানুষ মনে হচ্ছিল শুধু।

