মানাসলুর চুড়ো থেকে—প্রথম পর্ব

পৃথিবীর অষ্টম উচ্চতম শৃঙ্গজয়ীর গায়ে কাঁটা দেওয়া অভিজ্ঞতা এই প্রথম

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ সকাল ৭টা। পৃথিবীর অষ্টম উচ্চতম মানাসলুর শিখরে (উচ্চতা- ৮১৬৩ মিটার/২৬,৭৮১ ফিট) পা রাখলাম। আমার জীবনের অন্যতম মোড় ঘোরানো ঘটনা। পশ্চিম নেপালের গোর্খা জেলায়, ২৮°৩২'৫৮" উত্তর এবং ৮৪°৩৩'৪৩" পূর্বে অবস্থিত এই মানাসলু।

আমি নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে পৌঁছই ১ সেপ্টেম্বর এবং সর্বশেষ ক্লাইম্বার হিসেবে মানাসলু বেসক্যাম্প পৌঁছই ১৬ সেপ্টেম্বর। মানাসলু অভিযানের অন্যান্য ক্লাইম্বারদের থেকে অনেক দেরিতে বেসক্যাম্প-এ পৌঁছানোর কারণ পরে বলছি। দেরিতে পোঁছেও দেখি, সেখানে আবহাওয়া খারাপ থাকার জন্য কোনো ক্লাইম্বার-ই সামিট অ্যাটেম্পট করতে পারেননি। যাই হোক, ১৬ তারিখ আমি বেসক্যাম্প পৌঁছই। পরদিন, ১৭ তারিখ, সকাল থেকে আবহাওয়া পরিষ্কার হয়ে যায়।

পরপর টানা বেশ কিছুদিন খারাপ আবহাওয়া এবং তীব্র তুষারপাত হওয়ায় এই সময়ে তুষার ধস নামার সম্ভাবনা প্রবল থাকে। তাই, ১৭ তারিখ আবহাওয়া ভালো হলেও সেইদিনও সমস্ত ক্লাইম্বাররা বেসক্যাম্পেই অপেক্ষা করছিলেন। সেদিন সকালে বেসক্যাম্প পুজোর পর আমি ক্লাইম্বিং বুট (বিশেষ ধরনের একটু ভারি ও শক্ত জুতো যা বেসক্যাম্প-র ওপর থেকে হাই অল্টিটিউডে স্নো, আইস এবং টেকনিক্যাল ক্লাইম্বের জন্য অপরিহার্য) পরে বেসক্যাম্পের খানিকটা ওপরে ক্র্যাম্পন পয়েন্ট (জুতোয় লাগানোর জন্য ধাতুর তৈরি কাঁটা হল ক্র্যাম্পন। আর যে জায়গায় গিয়ে এটির ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে পড়ে সেটাই ক্র্যাম্পন পয়েন্ট) পর্যন্ত হাঁটা এবং খাড়াইতে চড়া প্র্যাকটিস করে এলাম।

পরদিন, ১৮ তারিখ, সকালে আমরা সবাই, প্রায় ১৫০জন ক্লাইম্বার, বেসক্যাম্প থেকে ক্যাম্প ১-এর উদ্দেশ্যে রওনা দিই অ্যাক্লাইমেটাইজেশন ও লোড ফেরি করার জন্য। ১৯তারিখে একইভাবে ক্যাম্প ২। ক্যাম্প ২-তে আরও ওপরে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত ক্লাইম্বিং গিয়ার এবং জিনিসপত্র রেখে ২০ তারিখ আবার আমরা  ক্যাম্প ২ থেকে বেসক্যাম্পে নেমে এলাম। এই কদিন আবহাওয়া ভালোই ছিল।

আমি এমনিতে খুবই মুখচোরা মানুষ। সেভাবে লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে পারি না (পাহাড়ে ওঠার থেকে কথা বলতে বেশি ভয় পাই)। অন্যদের দেখি সবার সঙ্গে মিলে বেশ হইচই করতে পারে, কিন্তু ওদের মতো আমি কেন হতে পারি না সেটাও জানি না। ওখানে আমি একাই ভারতীয় ছিলাম। বাকিরা সবাই বিদেশি। তাই ডাইনিং হলে যখন অন্যান্য দেশের ক্লাইম্বাররা সবাই আড্ডা দিত বা খেতে আসত আমি ওদের ধারে-কাছে থাকতাম না। ১৬-২১ তারিখ পর্যন্ত ছ'দিন এভাবেই কেটেছে। আমি শেরপাদের সঙ্গে কিচেনেই খাওয়া দাওয়া করতাম।

এটা ছিল আমার প্রথম আট হাজার মিটারের বেশি উঁচু শৃঙ্গ অভিযান। আট হাজার মিটার উচ্চতাকে বলা হয় ‘ডেথ জোন’। আমি এর আগে পর্যন্ত ছ’হাজার মিটারের শৃঙ্গ অভিযান করেছি। শৃঙ্গ অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা আমার ছিল। কিন্তু, আট হাজার মিটার এমন একটা উচ্চতা, যার পরিবেশ ও আবহাওয়ায় এমনই পার্থক্য যে মানুষের শরীরে এবং মনে খুবই গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে এবং পরিবর্তন ঘটিয়ে দিতে পারে। ফলে, খুব সতর্কভাবে এবং উপযুক্ত ট্রেনিং ছাড়া আট হাজার মিটারের উপরের শৃঙ্গ অভিযান করা যায় না। এখানে বাতাসে অক্সিজেনের ঘনত্ব ভীষণ ভাবে কম। যেখানে ০ মিটার অর্থাৎ সমুদ্রতল থেকে ৫০০ মিটার পর্যন্ত (লো অল্টিটিউড) অক্সিজেনের ঘনত্ব ২০.৯%, সেখানেই সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮০০০-৯০০০ মিটার উঁচুতে (আলট্রা হাই অল্টিটিউড) অক্সিজেনের ঘনত্ব মাত্র ৭%।

যাই হোক, ২২ তারিখ একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। আমি রোজকার মতোই কিচেনে শেরপা স্যারদের সঙ্গে দুপুরের খাবার খাচ্ছিলাম। খাওয়া-দাওয়ার পর শেরপা স্যার আমাকে বললেন, “এত আনস্মর্ট হলে চলবে না, স্মার্ট হতে হবে। তুমি একজন মেম্বার ক্লাইম্বার, বিদেশিদের দেখেছ, ওদের মত স্মার্ট হতে হবে। ওদের থেকেও সব কিছু শিখতে হবে।” এই বলে আমাকে সঙ্গে করে ডাইনিং হলে নিয়ে গেলেন তিনি। তখন সব বিদেশি ক্লাইম্বাররা সেখানে ছিলেন। আমাকে নিয়ে গিয়ে তেম্বা শেরপা স্যার বিদেশিদের কাছে আমার পরিচয় দিলেন, আমি ভারতীয় সেটাও বললেন। বললেন আমি খুব লাজুক। ওরাই যেন আমার সঙ্গে কথা বলে এবং প্রয়োজনীয় আদবকায়দা শিখিয়ে দেয়। সেরজি মিংগোটে বলে একজন খুব বড়ো মাপের স্পেনীয় ক্লাইম্বারের (তখনও অবশ্য জানতাম না ইনি সেই বিখ্যাত ক্লাইম্বার, যার কথা আমি আগেই শুনেছিলাম, কিছুক্ষণ পরে সেটা জানতে পারি) পাশে আমাকে বসিয়ে দিয়ে, তেম্বা সেরজি স্যারকেও আমায় বিদেশি আদবকায়দা শেখানোর দায়িত্ব দিয়ে চলে গেলেন। বিদেশি ক্লাইম্বাররা প্রত্যেকেই খুবই ভালো ছিলেন, খুব মিশুকেও ছিলেন। আমাকে আপন করে নিয়েছিলেন সবাই।

এই সময়েই এমন একটা ঘটনা ঘটে যা আমাকে পরবর্তীতে আরও কিছু কঠিন চ্যালেঞ্জ নেওয়ার জন্য আত্মবিশ্বাসী ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করে তুলেছে। 

সেখানে ব্রাজিলের একজন ক্লাইম্বার মোজেসের কাছে অক্সিমিটার ছিল। অক্সিমিটার এমন একটি যন্ত্র, যেটা আমাদের তর্জনীতে লাগালে আমাদের রক্তে অক্সিজেন-সম্পৃক্তি ওই মুহূর্তে কত আছে তা মাপা যায়। বিদেশিরা অক্সিমিটার দিয়ে তাদের অক্সিজেন-সম্পৃক্তি মাপছিলেন। তাদের কারো পরিমাপ আসছে ৮০, কারো ৮২। সর্বোচ্চ এল ৮৫। বেসক্যাম্পের উচ্চতায় (৪৮৯৫ মিটার) অক্সিজেনের ঘনত্ব ১১% সমুদ্রতলের (২০.৯%) প্রায় অর্ধেক। সেই হিসেবে ওদের অক্সিজেন-সম্পৃক্তি ঠিকই ছিল। কিন্তু, রক্তে অক্সিজেনের সম্পৃক্তি যার যত বেশি থাকে অধিক উচ্চতায় মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা, শারীরিক সক্ষমতাও তার তত বেশি থাকে। এবার ওরা আমার অক্সিজেন-সম্পৃক্তি মাপার জন্য অনুমতি চাইলেন। আমি অনুমতি দেওয়ার পর মাপতে গিয়ে অক্সিমিটারে পরিমাপ এল ৯৭। যা সমুদ্রতলে মানুষের অক্সিজেন-সম্পৃক্তির সমান। ওরা তো প্রথমে ভাবছে এত বেশি উচ্চতায় ৯৭ কীভাবে হওয়া সম্ভব! ওদের মেশিন বোধহয় খারাপ হয়ে গেল। ফের নিজেদের আর আমার অক্সিজেন-সম্পৃক্তি মেপে অবশেষে ওরা নিশ্চিত হল– মেশিন ঠিকই আছে, একই রিডিং আসছে।

এটা জানতে পারা আমার পক্ষেও একটা মোড় ঘোরানো ঘটনা ছিল। কারণ, এই প্রথম আমি বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণ-সমেত আমি জানতে পেরেছিলাম, যে আমার একটা বিরল ক্ষমতা আছে। আমি সেই সময়ই ভবিষ্যতে আরো কিছু কঠিন চ্যালেঞ্জ নেওয়ার জন্য নিশ্চিত হয়ে যাই। আমাদের ভারতীয়দের কাছে যেহেতু এই ধরনের যন্ত্র থাকে না, তাই এতদিন আমি আমার এই বিশেষ ক্ষমতার কথা জানতেই পারিনি। তবে, বেশি উচ্চতার ক্ষেত্রে যে আমার বিশেষ কিছু ক্ষমতা আছে তা আমি অন্যান্য ক্লাইম্বারদের সঙ্গে আমার তুলনা করে অনুমান করতে পারতাম অনেক বছর ধরেই। সেই অনুমান এবং আত্মবিশ্বাস থেকেই আমি এই ৮০০০ মিটারের বেশি উচ্চতার, পৃথিবীর অষ্টম উচ্চতম শৃঙ্গ মানাসলু অভিযানের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণ এই প্রথম। বিদেশি ক্লাইম্বাররা এটা জানার পর থেকেই আমাকে নানা প্রশ্ন করা শুরু করলেন— আমি কী কী খাই? আমি কি অনেক হাই অল্টিটিউড-এ বাস করি ইত্যাদি।  

(চলবে)

Developed by DXDasia