গাছমানুষের ডায়েরি – ৭

সামনে মাথা-কাটা চাঁদের পাহাড়, পথের পাশে বরফ

সাইকেল যেখানে থেমেছিল:
হোরোম্বো হাট থেকে যাত্রা শুরু কিলিমাঞ্জারোর দিকে। মাওএনজি পিক আর কিলিমাঞ্জারোর মাঝে ঢেউখেলানো আশ্চর্য রাস্তা। ব্রুনো আর টিমের অন্যান্য সঙ্গীরা নাম দিল ‘কমান্ডার’। প্রশংসা কার না ভালো লাগে। কিন্তু, সুখ ধাতে সইল না। ব্রুনোর সাইকেলের চেন কেটে গেল। এখন একা একাই উঠতে হবে সামিট ক্যাম্প কিবো হাট-এ। 

সামনে বিস্তীর্ণ ফাঁকা প্রান্তর। অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। ইতস্তত মানুষজন। কারো অভিমুখ সামনের দিকে, বুকের মাঝে পর্বতশৃঙ্গ জয়ের স্বপ্ন। কেউ বা স্বপ্নপূরণের ভালো লাগা নিয়ে ফিরতি পথে। ফিরতি দলে দুই একজন মানুষ এমনও আছেন যারা স্বপ্নভঙ্গের কারণে মনমরা। হয়তো আবার আসিব ফিরে ভাবতে ভাবতে চলেছেন। প্রচণ্ড ঠান্ডা এবং বাতাসে অক্সিজেনের ঘনত্ব কমের কারণে কিছু শারীরিক অসুস্থতা দেখা দিতে পারে, যা মাউন্টন সিকনেশ নামে পরিচিত। সেরকম অসুস্থতা দেখা দিলে আর উপরের দিকে না গিয়ে নিচের দিকে নেমে যাওয়াই শ্রেয়। সেটাই সুস্থ হওয়ার ওষুধ। 

এখন আমি একা। না না, একা নই। আমি আর চেতক দুজনে চলেছি কিবোহাট বা বেস ক্যাম্পের দিকে। ওটা সামিট ক্যাম্পও। উচ্চতা ৪,৭২০ মিটার। জ্যাকসনদের ‘আকুনা মাতাতা’ বা ‘নো প্রবলেম’ বলে আমি প্যাডেলে চাপ দিলাম। ফাঁকা ডাঙা হলেও তা আস্তে আস্তে উপরের দিকে উঠেছে। বাতাসে অক্সিজেনের ঘনত্ব বেশ কম। তাই একটু সাইকেল চালালেই হাঁফ ধরে যাচ্ছে। থামছি কিন্তু নামছি না। ১০ মিনিট যাওয়ার পর এক মিনিট দু মিনিট বিশ্রাম সাইকেলে বসেই।

উপরের দিক থেকে নেমে আসা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। সামনে যাওয়া মানুষের সংখ্যা কম। যে কজন যাচ্ছেন তাদের মধ্যে পোর্টারের সংখ্যাই বেশি। এঁরা অনেক সকাল সকাল হোরোম্বো হাট থেকে বার হয়েছেন। আমি সাইকেলে যাচ্ছি তাই বেশিরভাগ ট্রেকারদের পার হয়ে এসেছি। সামনে যাওয়া মানুষজন আমার ঘন্টি শুনে সাইড দিচ্ছেন। উল্টোদিক থেকে আসা মানুষজন হাত তুলে বা কখনো কিছু বলে উৎসাহ দিচ্ছেন। আমার মনে এক অদ্ভুত সুন্দর ভালোলাগা। আমি আমার চেতকে চেপে একাকী চলেছি আফ্রিকা মহাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয় করতে। এ যেন স্বপ্নকেও ছাড়িয়ে গেছে। যেন কোনো কল্পলোকে বিচরণ করছি। 

রাস্তা আস্তে আস্তে উপরের দিকে উঠছে। বেশ দম লাগছে সাইকেল চালাতে। মাঝে মাঝে জলের পাইপে টান দিচ্ছি। দু’ঢোঁক জল পেটে গেলে চরম শান্তি। কিলোমিটার তিনেক এইভাবে যাওয়ার পর আবার একটা বিশ্রামের জায়গা পেলাম। আগেরবারের মতোই দুটো উঁচু দুটো নিচু বেঞ্চ। জনা পাঁচেক পোর্টার বিশ্রাম নিচ্ছেন। একগাল হাসি দিয়ে ওঁরা আমাকে অভ্যর্থনা জানালেন। ভাষাগত সমস্যার জন্য সাহস করে কেউ নিজে থেকে কথা বলছেন না। আমি আমার সীমিত শব্দ ভাণ্ডার থেকে দু’চারটে শব্দ দিয়ে কথাবার্তা চালাবার চেষ্টা করছি।

এই জায়গাটার অবস্থান বেশ সুন্দর। বিশাল দুটো বোল্ডার পায়ে চলা পথ আগলে দাঁড়িয়ে। এতক্ষণ ধরে সরলরেখায় আসা রাস্তাটা পাথর জোড়াকে ডান হাতে রেখে বাঁ দিকে বাঁক নিয়েছে। সামনে আবারও বিস্তীর্ণ প্রান্তর। তবে সীমাহীন নয়। একটু পরেই কিছু বড় পাথর দেওয়াল তুলেছে। সেই দেওয়ালের ডান দিকে উঁকি মারছে কিবো হাটের সবুজ রঙের ঘর। আমার আজকের ক্যাম্প। এরা বলে বেস ক্যাম্প। আসলে সামিট ক্যাম্প। 

ওই পাথরের দেয়াল থেকে দৃষ্টিকে তুলে নিয়ে ঘাড় উঁচু করে আর একটু দূরে তাকাতেই দেখতে পেলাম সেই বিস্ময়। মাথা কাটা এক পর্বত মাউন্ট কিলিমাঞ্জারো। আগ্নেয় পর্বত হওয়ার কারণে এমন মাথা কাটা চেহারা। ছোটবেলায় যে রকম পাহাড় আঁকতাম সেরকম সিঙারার মত তিনকোনা নয়।  অনেকটা জায়গা নিয়ে এর মাথার বিস্তার। উপরে উঠলে আরো ভালো করে দেখতে জানতে পারব ক্রেটার কেমন হয়। 

পায়ে চলা পথটা একটু একটু করে উপরের দিকে উঠেছে। কিবো হাট থেকে সামনের দিকের ট্রেলটাও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। একটু জিরোবার জন্য বেঞ্চে বসলাম। প্যাক লাঞ্চের অনেকটাই এখনো ব্যাগের মধ্যে। আরো একটা স্যান্ডউইচ আর নেইমা চোমা অর্থাৎ মুরগির ঠ্যাং পোড়া খেলাম। চড়াইতে সাইকেল চালিয়ে গরম লেগেছিল। কিন্তু একটু বসতেই ঠান্ডা লাগতে শুরু করলো। পাতলা জ্যাকেটটা গায়ে জড়ালাম। মাথায় স্কার্ফ বাঁধা। গলায় ব্যান্ডানা যেটা নাক মুখ ঢেকে রাখার জন্য ব্যবহার করছি। পোড়া মুরগিটা খাওয়ার পর খুব কফি খেতে ইচ্ছে করল। কিন্তু উপায় নেই। আমার সাইকেল অভিযানে যেখানে খুশি দাঁড়িয়ে আমি কফি বানিয়ে খাই। কিন্তু এটা শুধুমাত্র দেশ-দেশান্তরে সাইকেল অভিযান নয়। আরো বেশি কিছু। সাইকেলে পর্বত অভিযান। তাই আমার সঙ্গে কফি বানাবার সাজ-সরঞ্জাম নেই। ক্যাম্পে পৌঁছে তবেই কফি পাব। খাবারের মধ্যে আমার একমাত্র নেশার জিনিস এই কফি। তাই বেশিক্ষণ বিশ্রাম না নিয়ে কফির টানে আবার প্যাডেলে পা। 

এখান থেকে রাস্তা একটু বেশি চড়াই। তবুও হাল ছাড়লাম না। যতটা সম্ভব সাইকেল চালিয়ে পাথরের দেয়ালটার কাছাকাছি পৌঁছলাম। অবাক হয়ে দেখলাম পাথরের খাঁজে খাঁজে বরফ জমে আছে। যদিও সামান্য, তবু বেশ আনন্দ হল। সোনারপুর আরোহী মাউন্টেনিয়ারিং ক্লাবের সঙ্গে অনেকবার পর্বত অভিযানে গেছি। পাহাড় চড়ার বিভিন্ন কোর্সও করেছি। তাই পাহাড়ি বরফের সঙ্গে আমার পূর্ব পরিচয় রয়েছে। কিন্তু চেতককে সঙ্গে নিয়ে ১৫,০০০ ফুটের বেশি উচ্চতায় এই প্রথমবার। আমিও খুশি চেতকও খুশি। 

পাথরের দেওয়ালের দুই দিক দিয়ে দুটো পায়ে চলা পথ চলে গেছে কিবো হাটের দিকে। আমার সামনের দুজন পোর্টার আমাকে ডান দিকের পথটা হাতের ইশারায় দেখিয়ে দিলেন। ইঙ্গিতে বললেন, সাইকেলে ওই রাস্তাটা সহজ হবে। ওঁদের ‘আসান্তে’ অর্থাৎ ধন্যবাদ বলে আমি সেই রাস্তাটাই ধরলাম। বেশ কিছুটা চালিয়ে যাওয়া গেল। যদিও দম লাগছে সাইকেল চালিয়ে যেতে তবুও আমি যতটা সম্ভব চালিয়েই এলাম। এবার যেন রাস্তাটা হঠাৎ বেশি খাড়া হয়ে গেল। সামনে তাকিয়ে দেখি শ’খানেক মিটার দূরে বেশ কয়েকটা সবুজ রঙের ঘরবাড়ি। কিবোহাট। সামনেই একটা গোল বোর্ড সিমেন্টের খুঁটির মাঝে আটকানো। এতদূর থেকে বোর্ডের লেখা পড়তে পারছি না। তবে আন্দাজ করছি হোরোম্বো হাটের মতোই কিছু লেখা থাকবে। 

আমার আর দমে কুলোলো না। বাকি ১০০ মিটার রাস্তা সাইকেল ঠেলে উঠলাম। কিবো হাট লেখা বোর্ডের কাছে যখন পৌঁছলাম তখন আমার ঘড়িতে সময় দুপুর ১টা ৫ মিনিট। তানজানিয়ার স্থানীয় সময়। কাছাকাছি কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। আমার বাঁ দিকে কয়েকটা তাঁবু লাগানো। প্রচণ্ড হাওয়ায় তাদের ফ্ল্যাপগুলো পতপত করে উড়ছে। পারলে উড়িয়ে নিয়ে যায়। একটু দূরে লম্বা মতন একটা ঘরের পাশে জনা চারেক পোর্টার বসে আছেন। হাতে তাদের চায়ের মগ। পিছনে ফেলে আসা পথের দিকে তাকিয়ে আমি আমার সঙ্গী ব্রুনো বা জ্যাকসনদের কাউকে দেখতে পেলাম না। অনেক দূর অবধি কোনো অভিযাত্রীকেই দেখতে পাচ্ছি না। তাহলে কি আজ আমিই প্রথম অভিযাত্রী যে কিবো হাটে পৌঁছলাম! হবেও বা।

ব্রুনোর জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এই ফাঁকে বাকি খাবারের সদ্ব্যবহার করে ফেলা যাক। প্রচণ্ড হাওয়া তাই একটা বড় পাথরের আড়ালে বসলাম। মিষ্টি রুটি আর বাকি পোড়া মুরগিটা একটু একটু করে খেয়ে ম্যাংগো জুসের প্যাকেটে চুমুক দিলাম। নিচে রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে নজর পড়লো আমার কুক্ মার্টিন চেইন কাটা সাইকেলটা ঠেলতে ঠেলতে আসছে। মার্টিনের পিঠে বড়ো ব্যাগ লম্বা ছাতা। একগাল হাসি নিয়ে সে আমাকে কমান্ডার বলে সম্বোধন জানাল। ওর পিছনেই ব্রুনো আর জ্যাকসন এসে পৌঁছল। আমার পৌঁছনোর ৪৫ মিনিট পর ওঁরা পৌঁছাল। কয়েকটা ছবি তুললাম। ব্রুনো ওয়ার্ডেনের সঙ্গে কথা বলে আমার ফর্মালিটিস পূরণ করল। খাতায় এন্ট্রি করে রুম পেলাম। তিন নম্বর ঘরে চারটে খাট। উপর, নিচ করে আটটা বিছানা। ঘরে ঢুকে ব্যাগ রাখতেই মার্টিন কফির কাপ নিয়ে হাজির। ওকে জড়িয়ে ধরে বললাম আসান্তে অর্থাৎ ধন্যবাদ। কফির জন্য যেন আমি মরে যাচ্ছিলাম। মার্টিন আমাকে কারিবু অর্থাৎ ওয়েলকাম বলল।

এবার পরপর কয়েকটা কাজ হল। ব্রুনো রুমে এসে পরবর্তী পদক্ষেপ সম্বন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করল। বিকেল ৫টার মধ্যে ডিনার শেষ করে শুতে যাওয়ার কথা। ১১টায় ঘুম থেকে উঠে অল্প কিছু খেয়ে ১২টায় সামিট মার্চে বেরোতে হবে। ব্রুনো আমার সঙ্গে থাকা জামা কাপড় সব দেখে কী কী পড়তে হবে সেই সম্বন্ধে সবিস্তার জানাল। আমাদের কথার মধ্যেই জ্যাকসন আর মার্টিন বেশ কিছু খাবার নিয়ে এল। এটা নাকি লাঞ্চ। আমার তো মনে হলো কয়েক দিনের খাবার একসঙ্গে নিয়ে এসেছে। আমি অল্প খেলাম আর বললাম কিছু পরে আমাকে বড়ো বাটি ভর্তি স্যালাদ দিতে। আমার রুমে একজোড়া মানুষ এলেন। পুরুষটি কেপটাউন অর্থাৎ সাউথ আফ্রিকার এবং যিনি নারী তিনি সুইডেনের। পথে ওঁদের আলাপ। এখন একসঙ্গে। কত সহজে সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়।

প্রায় চারটের সময় এল আমার রুমমেট জাপানি বন্ধু কিওতো। ওকে দেখেই বুঝলাম উচ্চতা ওকে কিছুটা কাবু করেছে। এসেই শুয়ে পড়তে চাইছিল। আমি কিছুক্ষণ বাইরে ঘোরাঘুরি করার পরামর্শ দিলাম। সঙ্গে আমিও বেরোলাম রুম থেকে। ততক্ষণে ভারতীয় দলটিও এসে পৌঁছেছে। দলের মধ্যে যে মেয়েটা ছোটো সে প্রচুর বমি করতে শুরু করল। ওকে জিজ্ঞেস করে জানলাম, সকাল থেকে কোনো খাবার খায়নি। আর খুব কম জল খেয়েছে। মাথা প্রচণ্ড ধরে আছে। এখানে একজন ডাক্তার রয়েছেন। তিনি ওঁর অক্সিজেন লেভেল মেপে বললেন পঞ্চাশের কম। এটা অল্টিটিউড সিকনেসের লক্ষণ। ওঁর জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হল।

আমার সঙ্গীর সাইকেল সামিটে যাবে না। এখানেই থাকবে। কিন্তু নিচে যাওয়ার জন্য তো দরকার। তাই আবার অনেকক্ষণের চেষ্টায় সাইকেলটার চেন মেরামত করা হল। আমার চেতকের একটু প্রয়োজনীয় কাজকর্ম করে নিলাম। পরে ক্যাম্প সাইটেই একটু হাঁটাহাঁটি করলাম। অন্যান্য অভিযাত্রীরাও এসে পৌঁছেছেন। ঠিক পাঁচটায় জ্যাকশন ডিনার আনল। আবারো অনেক খাবার। আলুর বড়া, মিষ্টি রুটি, ফিঙ্গার চিপস, বাঁধাকপির সবজি, আনারস, আমার পছন্দের কফি। বাইরে প্রচণ্ড হাওয়া এবং বেশ ঠান্ডা। হাত-পা যেন জমে যাচ্ছে। খাওয়া শেষে সাড়ে পাঁচটায় স্লিপিং ব্যাগে ঢুকে পড়লাম। উত্তেজনায় ঘুম আসবে কিনা জানি না, তবুও রাত্রি ১১টায় উঠবার জন্য এলার্ম দেওয়া রইল।

(চলবে)
 

Developed by DXDasia