গাছমানুষের ডায়েরি- ৬

সামনেই চাঁদের পাহাড়, মাঝে বিছানো এক অলীক পথ

সাইকেল যেখানে থেমেছিল:
হোরোম্বো হাটে রাত্রিবাস হল। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকরা জানতে চাইলেন ‘গ্রিন অন হুইল’-এর কথা। হঠাৎ, ক্যাম্পে শুরু হল স্থানীয়দের গান ও নাচ। সামনে তখন আলস্য ভাঙছে মাওয়েনজি পিক।

২৫ জানুয়ারি, ২০১৯। ‘স্বপ্ন সেটা নয় যেটা আমরা ঘুমিয়ে দেখি, স্বপ্ন সেটাই যেটা আমাদের ঘুমাতে দেয় না’। ডক্টর আবদুল কালামের বিখ্যাত উক্তিটা গত রাত্রে আমার জন্য অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেল। ঘুম ভাঙলো সাড়ে ছ’টার অ্যালার্মে। এমনিতে আমার ঘুম খুব সকালে ভেঙে যায়। এলার্মের দরকার পড়ে না। কিন্তু গত রাত্রে চরম উত্তেজনায় ঘুম খুবই কাটা কাটা হয়েছে। তাই ভোরের দিকে ঘুমিয়ে গেছিলাম। ছোটবেলাকার স্বপ্ন চাঁদের পাহাড়কে ছুঁয়ে দেখব। সেই স্বপ্ন সত্যি হতে চলেছে। ঘুম হয় কী করে!

আজ আমার কিলিমাঞ্জারো অভিযানের তৃতীয় দিন। হোরোম্বো হাট থেকে কিবো হাট পৌঁছাবার দিন। দূরত্ব ৯ কিলোমিটার। বোর্ডে লেখা ৫ ঘন্টার পথ। রেডি হয়ে রাজকীয় প্রাতরাশ সেরে রওনা হলাম সকাল ৮টায়। আমি আর ব্রুনো। আমাদের সঙ্গে আমাদের দুই বাহন সাইকেল। পিঠে ছোট ন্যাপস্যাক। তাতে পাইপ লাগানো জলের পাউচ, প্যাক করা লাঞ্চ,‌ সাইকেল সারাবার উপকরণ, হাওয়া ভরবার পাম্পার। পাতলা জ্যাকেটও সঙ্গে রাখলাম। 

ব্রুনোর কথা অনুযায়ী প্রথম অর্ধেক রাস্তা ছোট বড় নুড়ি পাথরের এবং বেশ চড়াই। শেষ অংশটুকু সমান। সাইকেল চালানো যাবে।  হোরোম্বো ক্যাম্প থেকে বেরিয়েই খানিকটা খাড়া রাস্তা। শুরু হল সাইকেল ঠেলা। রোদ এখনো বেশ নরম আর মিষ্টি। সামনের দিক থেকে একটা ঠান্ডা হাওয়া আসছে। গত পরশু যে রাস্তা দিয়ে হোরোম্বো ক্যাম্পে এসেছিলাম সেই রাস্তাকে বাঁদিকে রেখে আমরা ডানদিকের বোল্ডারের রাস্তা ধরলাম। আমাদের সামনে গতকাল আলাপ হওয়া ৭ জন বয়স্ক মানুষের অস্ট্রেলীয় দলটা চলেছে। পাঁচজন মহিলা দুইজন পুরুষ। সকলেরই বয়স ষাটের ঊর্ধ্বে। নিজেদের মধ্যে গল্প করতে করতে আশেপাশের ছবি তুলতে তুলতে চলেছেন ওঁরা। আমাকে দেখেই গুড মর্নিং, হাই হ্যালো বললেন। আমাদের যাওয়ার জন্য রাস্তা ছেড়ে দিলেন।

অ্যালপাইন ফরেস্টের মধ্য দিয়ে চলেছি। কোন গাছই হাঁটুর উচ্চতার বেশি নয়। শুধু সিনাশিয়া গাছটা কিছুটা লম্বা। কিছু দূর গিয়েই জলের নালা পেলাম। মাওয়েনজির দিক থেকে নেমে এসেছে। ডিঙিয়ে পেরোবার মত চওড়া। তিরতির করে বয়ে চলেছে কাঁচের মতো স্বচ্ছ জল। ব্রুনো ওর পাউচে জল ভরে নিল। আমি মুখে একটা লজেন্স ভরে নিয়ে আবার চলা শুরু করলাম।  বেশি চড়াইয়ের জায়গাটা প্রায় পার হয়ে এসেছি। এখানটা আশেপাশের থেকে সবথেকে উঁচুতে। সামনে একটু দূরে দেখা যাচ্ছে বিস্তীর্ণ প্রান্তর। তার বামদিক ঘেঁষে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আফ্রিকা মহাদেশের সর্বোচ্চ পর্বত কিলিমান্জারো। 

আমি যেখানে দাড়িঁয়ে সেখান থেকে রাস্তাটা ঢালু হয়ে নেমে গিয়ে ওই ময়দানে মিশেছে। পায়ে চলা পথ সরু ফিতের মত পড়ে আছে। শুকনো, রুক্ষ। সবুজের চিহ্ন আর নেই। অ্যালপাইন ফরেস্টের এখানেই ইতি। কিলিমাঞ্জারো কোনো পর্বতমালার অংশ নয়। একা দাঁড়িয়ে থাকা এক পর্বত। ডান দিকে মাওয়েনজির মাথা। এই দুই পর্বতের মাঝে অবতল এক বিস্তীর্ণ চাতাল। হিমালয় পর্বতমালার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এর রূপ। এ এক অন্য সৌন্দর্য। 

সাইকেল চালিয়ে ঢাল বেয়ে নেমে এলাম সেই ময়দানের মত অঞ্চলটায়। ঢালটা যেখানে শেষ হল সেখানটা একটা হালকা জল জমা জায়গা। যার ওপর দিয়ে বড়ো বড়ো বোল্ডার বসানো। সেটাই পেরোবার রাস্তা। আমি সাইকেল থেকে নেমে জলের জায়গাটা হাঁটিয়ে পার হলাম। পেরিয়েই একটা বসবার জায়গা বানানো আছে। দুটো বসার বেন্চ। সঙ্গে দুটো উচু বেন্চ। স্কুলে যেমন থাকে। পাশে পাকা টয়লেট। কম বয়সি এক বিদেশি দম্পতি বসে বিশ্রাম করছেন। আলাপ হল। ওঁরা নরওয়ে থেকে এসেছেন।  

আমার পেট তখন খিদেয় চুঁই চুঁই করছে। প্যাক লাঞ্চ খুলে স্যান্ডউইচ খেলাম। খুব সুন্দর বানিয়েছে। খিদের পেটে একটু বেশি যেন ভালো লাগল। ততক্ষণে ব্রুনো এসে গেছে। কিন্তু একি! ওর সাইকেলের চেন ঝুলছে যেন। ব্রুনো কাছে এসে মুখ ভার করে জানালো চেন কেটে গেছে। যাহ্! এ তো শুকনো বিপদ। আমি ভার কমানোর জন্য অনেক যন্ত্রপাতি সঙ্গে আনিনি। চেইন কাটারটাও সঙ্গে নেই। ততক্ষণে জ্যাকসন পৌঁছে গেছে। আমরা তিনজনে বেশ কিছুক্ষণের চেষ্টায় প্লাস, স্ক্রু ড্রাইভার আর পাথরের সাহায্যে মোটামুটি কাজ চলার মত করে চেনটা লাগালাম। আমার মনে একটা খিঁচ্ লেগে গেল। কারণ বুঝতে পারছিলাম চেনটা আবার খুলে যাবে। 

কিছুক্ষণ বিশ্রাম। একটু খাওয়া, জলপান। আবার চলা। সাইকেল চালিয়ে যেতে পারছি। দু-এক জায়গা বোল্ডারের। সেখানে একটু নেমে পার করতে হচ্ছে। পাহাড় থেকে নেমে আসা পোর্টার আর ট্রেকারদের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। কুশল বিনিময় হচ্ছে ইংরেজি আর সহেলিতে। কখনো জাম্বো কখনো হ্যালো কখনো হাই। আমাকে সাইকেলে দেখে অনেকেই অবাক হচ্ছেন। বোল্ডারের জায়গাগুলোয় যেখানে হেঁটে যাওয়াই কষ্টকর সেখানে সাইকেলে যেতে দেখে অবাক হচ্ছেন। অনেকে প্রশংসা করলেন। তাতে উৎসাহিত হলাম। এবার গড়ানো জায়গাটা থেকে নেমে ময়দান মতো জায়গাটায় পড়লাম। আমাদের দলের বাকি সদস্যরা সামনে হেঁটে চলেছে। সবারই আজ ভার বেশি। সবার ব্যাগেই জলের ডাব্বা। উপরের ক্যাম্প মানে কিবো হাটে কোন জলের উৎস নেই। তাই হোরোম্বো হাট থেকে জল বয়ে নিয়ে যেতে হয়। সব দলের পোর্টাররা তাদের নিজ নিজ দলের জন্য প্রয়োজনীয় জল নিচের থেকে ওপরের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। 

আমার মানুষজন আমাদের অনেক আগেই বেরিয়েছে। আমি আর ব্রুনো ওদের এখানে ধরে ফেললাম। রাস্তায় আমরা আরো অনেক অভিযাত্রী দলকে পেরিয়ে পেরিয়ে এসেছি। ব্রুনো সহেলি ভাষায় সঙ্গীদের কী সব বলল। তার পরেই ওরা আমাকে কমান্ডার বলে ডাকতে শুরু করল। কারণ জিজ্ঞেস করাতে জানাল, ওরা আমার পারফরমেন্সে খুব খুশি। আমি নাকি অন্যান্য অভিযাত্রীদের থেকে অনেক বেশি শক্তপোক্ত। নিজের প্রশংসা শুনতে কার না ভালো লাগে। আমিও আনন্দে ডগোমগো হয়ে সাইকেলে দু-চক্কর ঘুরে নিলাম। সকলে মিলে ছবি তোলা হল।

আমরা আবার সাইকেল চালিয়ে চলতে শুরু করলাম। দু’প্যাডেল যেতেই ব্রুনোর সাইকেলে খটাং করে একটা শব্দ হল। চেনটা কেটে ঝুলে গেল। পরীক্ষা করে দেখি ঠোকাঠুকি করে যে জায়গাটা জুড়ে ছিলাম সেখানেই আবার খুলে গেছে। এবং আর জোড়ার মতো অবস্থায় নেই। ব্রুনো বলল, তুমি সাইকেল চালিয়ে এগোও। আমরা একসঙ্গে সাইকেল হাঁটিয়ে আসছি। বাকিরাও বলল কমান্ডার তুমি এগোও।

(চলবে)
 

Developed by DXDasia