গাছমানুষের ডায়েরি-৪

মাওয়েনজি পিক্-এর গায়ে সাদা সুতোর মতো বরফের দাগ

সাইকেল যেখানে থেমেছিল:

 বিপুল চড়াই ভেঙে হোরোম্বো ক্যাম্পের দিকে চলা। সূর্য ডুবে গেছে। কিলিমাঞ্জারো থেকে বয়ে আসা ঠান্ডায় হাড় জমে যাচ্ছে। সাইকেল ঠেলতে ঠেলতে চোখে পড়ছে দূরে ক্যাম্পের আলো। খিদেয়, ক্লান্তিতে, ঠান্ডায় তখন নুইয়ে আসছে শরীর। অবশেষে ক্যাম্পে পৌঁছানো রাত আটটায়। ৩৮২০ মিটার উচ্চতায় হোরম্বো ক্যাম্প। এবার চাঁদের পাহাড়ে ওঠার পালা।

হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল। শরীরে প্রচণ্ড একটা অস্বস্তি। ঘেমে-নেয়ে একসার হয়ে গেছি। উঠে বসতে গিয়ে আটকে গেলাম। মনে পড়ল, আমি স্লিপিং ব্যাগের ভিতরে। ফ্ল্যাশব্যাকের মতো হুরহুর করে মনে পড়ে গেল আমি ৩৭২০ মিটার উচ্চতায় হোরোম্বো হাট-এর ক্যাম্পে এক কাঠের তৈরি ঘরে ঘুমাচ্ছি। 

আফ্রিকা মহাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কিলিমাঞ্জারো অভিযানের প্রথম রাত্রি। সঙ্গে আমার সাইকেল, আমার বাহন, চেতক। স্লিপিং ব্যাগের চেনটা খুলে উঠে বসে দেখলাম আমি ফেদার জ্যাকেট উলের মোজা পরেই স্লিপিং ব্যাগের ভেতর ঢুকে ছিলাম। শরীর এখন চাঙ্গা হয়েছে। অ্যাক্লিমেটাইজেশন ঠিকঠাক হচ্ছে। তাই এত জামাকাপড় পরে গরম লেগে গেছে। হাতঘড়িটা মাথার কাছেই ছিল। টর্চ জ্বেলে দেখলাম মাঝরাত। রাত্রি দুটো। আমার গাইড ব্রুনো এই ঘরেই অন্য বিছানায় অঘোরে ঘুমোচ্ছে। আমি যতটা সম্ভব শব্দ না করে ফেদার জ্যাকেট আর উলের মোজাটা খুলে রাখলাম। দু’ঢোঁক জল খেলাম। জল তো নয় যেন কেউ বরফ গলিয়ে খেতে দিল। ঠান্ডার ভয়ে আর ছোটো বাইরে যাবার সাহস হলো না। স্লিপিং ব্যাগের চেন টেনে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম।

ঘুম ভাঙলো একেবারে সকালে। জানলার কাঁচ গলে সূর্যদেবের লাল আলো জানান দিল আজ আমার কিলিমাঞ্জারো অভিযানের দ্বিতীয় দিন। গতকাল রাত্রে ব্রুনো আর জ্যাকসনের সঙ্গে যা আলোচনা হয়েছে সেই অনুযায়ী আজ আমাদের অ্যাক্লিমেটাইজেসান ডে। অর্থাৎ এই উচ্চতার ঠান্ডা আর কম অক্সিজেন-এর পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেবার দিন। তার মানে আজ এখানেই রাত্রিবাস। কিছুটা উচ্চতায় হেঁটে গিয়ে আবার এই হোরোম্বো ক্যাম্পে ফিরে আসা। আমার দলের বাকি দুইজন পোর্টার আজ নিচের ক্যাম্প থেকে এই ক্যাম্পে পৌঁছে যাবে। তারপর কাল সকলে মিলে পরের ক্যাম্প ‘কিবো হাট-এ যাওয়ার পালা। এই কিবো হাট-ই বেস ক্যাম্প বা সামিট ক্যাম্প নামে পরিচিত। 

ব্রুনো এখনো ঘুমাচ্ছে। ওকে বিরক্ত না করে আমি ফ্রেশ হয়ে জ্যাকসনের খোঁজে বেরোলাম। আমার এক কাপ গরম কফি দরকার। খুঁজে খুঁজে পোর্টার কোয়ার্টারে জ্যাকসনের দেখা মিলল। 
-‘জাম্বো জাকসন’।
-‘জাম্বো উজ্জ্বল স্যার’।

সহেলি ভাষায় কুশল বিনিময় হওয়ার পর আমাকে কফি দিল জ্যাকসন। কফির মগ হাতে আমি এই হোরোম্বো হাট সাইট একটু ঘুরে ঘুরে দেখলাম। প্রথমেই নজর গেল উত্তর দিকে পাহাড়ের দেওয়ালের ওপাশে দূরে কিলিমাঞ্জারো শৃঙ্গের দিকে। ধ্যানমগ্ন হয়ে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। তাঁর সৌন্দর্যে মন ভরে গেল। 

এই ক্যাম্পে বেশ কয়েকটা কাঠের তৈরি ‘এ’ সেপের হাট রয়েছে। প্রত্যেকটাতে ৬-৮ জন করে থাকতে পারে। সর্বমোট ১২০ জন ক্লাইম্বারের থাকার মতো ব্যবস্থা রয়েছে হোরোম্বোয়। এছাড়া আলাদা ক্যাম্প সাইট রয়েছে, যেখানে কেউ নিজের তাঁবু খাটিয়েও থাকতে পারেন। আর রয়েছে রান্নার জন্য আলাদা ঘর, পোর্টারদের থাকার ঘর, ডাইনিং হল, ক্যাম্প ওয়ার্ডেনের অফিস, টয়লেট কমপ্লেক্স। এখন আরও নতুন দুটি বড়ো ঘর তৈরি হচ্ছে। কাছাকাছি একটা জলের ধারা থাকার জন্য এই ক্যাম্প সাইটে জলের কোনো অভাব নেই। হোরোম্বো হাট আমার ক্ষেত্রে প্রথম ক্যাম্প হলেও এই মারাংগু রুটের এটি দ্বিতীয় ক্যাম্প। প্রথম ক্যাম্প মান্ডারা হাট। ইতিমধ্যে ব্রুনো ঘুম থেকে উঠে বাইরে বেরিয়েছে। আমাকে বলল ব্রেকফাস্ট করে রেডি হয়ে নিতে। ডাইনিং রুমে আমার জন্য টেবিল সাজিয়ে জ্যাকসন অপেক্ষা করছিল। ব্রেড, জ্যাম, মার্জারিন, মাসালা ওমলেট, সসেজ, আনারস ফ্রেন্চ ফ্রাই, কফি। 

রাজাদের মতো ব্রেকফাস্ট করে বার হলাম অ্যাক্লিমেটাইজেশন ওয়াক্-এর জন্য। ব্রুনো আর জ্যাকসন সহেলি ভাষায় বকবক করতে করতে আগে হাঁটছে আর আমি ইতিউতি চাইতে চাইতে পিছনে চলেছি। ক্যাম্প সাইট থেকে একটু উপরে উঠে একটা পায়ে চলা পথ ডান দিকে জেব্রা রক্-এর দিকে চলে গেছে। এখানে মূরলেন ভেজিটেশন শেষ হয়ে অ্যালপাইন ভেজিটেশনের শুরু। হোরোম্বো ক্যাম্পে থাকা ট্রেকার্সরা জেব্রা রক্ পর্যন্ত হেঁটে যান আবার ফিরে আসেন নিজেদেরকে এখানের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেবার জন্য। এর ফলে উপরের ক্যাম্পগুলিতে আর অতটা অসুবিধা হয় না। মাউন্টেন সিকনেস হওয়ার সম্ভাবনা কম হয়।

হোরোম্বো ক্যাম্প থেকে জেব্রা রক ২ কিলোমিটার, উচ্চতা ৪০১০ মি অর্থাৎ হোরোম্বো হাট থেকে প্রায় ৩০০ মিটার উচ্চতায়। ব্রুনো জ্যাকসন-এর সঙ্গে কথা বলতে বলতে মাঝে মাঝে পিছিয়ে এসে আমাকে গাছ চেনাচ্ছিল। আমাদের ডান দিকে মাওয়েনজি পিক্। আফ্রিকা মহাদেশের তৃতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ। উচ্চতা ৫১৪৮ মিটার। খোঁচাখোঁচা ৬-৭টা মাথা নিয়ে দাঁড়িয়ে। যার নিচের ঢালে এক অদ্ভুত ধরনের গাছ বেশ অনেক সংখ্যায় দেখা যাচ্ছে। ব্রুনো যার নাম বলল সিনাসিয়া। এই গাছ যেখানে থাকে তার কাছাকাছি অবশ্যই জলের কোনো ধারা থাকে। আমরা বড়োসরো এক সিনাসিয়া গাছকে সঙ্গী করে ছবি তুললাম। পায়ে চলা এই পথের ধারে ছোটো ছোটো নানান অজানা গাছ যার কোনো-কোনোটায় হলুদ ফুল ফুটে রয়েছে, কোনোটায় মস্ শ্যাওলার মতো জড়িয়ে আছে। শুকনো গাছের গুঁড়ি দেখতে ঠিক যেন ফসিল। খুব ইচ্ছে হচ্ছিল ‘কাটুম কুটুম’-এর জন্য কিছু সংগ্রহ করার। কিন্তু বয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় বলে লোভ সংবরণ করতে হলো। 

আধঘন্টার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম জেব্রা রক্-এর কাছে।  লাভা জমে তৈরি হওয়া এক ছোট দেওয়াল, যার গা বেয়ে নানান লবণ বৃষ্টির জলের সঙ্গে গড়িয়ে নেমে সাদা কালো দাগ তৈরি করেছে। ঠিক জেব্রার গায়ের মত দেখাচ্ছে বলে ওই নাম। জেব্রা রক্-এর মুখোমুখি দাঁড়ানো মাওয়েনজি পিক্-এর গায়ে সাদা সাদা সুতোর মতো বরফের দাগ। জ্যাকসন জানাল, বেলা আরেকটু বাড়লে রোদের তাপে ওই বরফ গলে যাবে। এখানে আমাদের কিছুক্ষণের বিরতি। সঙ্গে আনা বোতল থেকে একটু জলপান। একটু ফটো-সেশন। ছোট্ট ছোট্ট এক ধরনের পাখি দেখতে পেলাম। ব্রুনো জানাল, কিছু রোডেন্টসও দেখা যায়। বেলা ১১ টায় আমরা আবার ক্যাম্প সাইটে ফিরে এলাম। এক পাত্তর কফি খেয়ে আমাদের দুজনের সাইকেল বাইরে আনলাম। তাদের একটু তদারকি দরকার। 

কাল থেকে তো ফের অত্যাচার শুরু হবে এদের ওপর।

(চলবে) 
 

Developed by DXDasia