LGBTQIA+ : প্রান্তজনের ‘ডায়ালগস’ যখন হয়ে উঠছে সর্বজনের

কলকাতা আন্তর্জাতিক LGBTQIA+ চলচ্চিত্র উৎসব ২০২৩

কিছু কথা বলা প্রয়োজন। প্রয়োজন কথা জুড়ে জুড়ে কথোপকথনের। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে, ‘ডায়ালগসঃ কলকাতা আন্তর্জাতিক এলজিবিটি ফিল্ম অ্যান্ড ভিডিয়ো ফেস্টিভ্যাল’। শুধুমাত্র চলচ্চিত্র উৎসব নয়, চলচ্চিত্র উৎসবে সিনেমা-আলাপ-আলোচনার মধ্যে দিয়ে ১৭ বছর ধরে কলকাতায় ঘটে চলা এক নবজাগরণ বলা চলে একে। LGBTQIA+ কমিউনিটির মানুষদের ব্যাপারে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে গড়ে ওঠা ‘ডায়ালগস’ ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল আজ হয়ে উঠেছে সর্বজনের। ২০১৬ পর্যন্ত ‘ডায়ালগস’ অনুষ্ঠিত হত ম্যাক্স মুলার ভবনে। ২০১৭ সালে থেকে তা বদলে হয় বসুশ্রী সিনেমা হল। এবছর আবার স্থানবদল করে, ১৭ নভেম্বর থেকে সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট (SRFTI)-তে শুরু হচ্ছে ১৭তম ‘ডায়ালগস’।

অনেকেরই মনে হতে পারে, চলচ্চিত্র উৎসবের নাম ‘ডায়ালগস’ কেন? ডায়ালগস অর্থাৎ কথোপকথন। যে সমস্যাগুলো নিয়ে আমরা এত লুকোছাপা করি, সে গুলো নিয়ে যত বেশি করে কথা বলা যায়। সমস্যা অর্থাৎ লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সুয়াল এবং ট্রান্সজেন্ডারদের যে সমস্যা— তা নিয়ে ছবি, তা নিয়ে ভিডিয়ো, তা নিয়ে আলোচনা। দেশ এবং দেশের বাইরেও যে সমস্ত পরিচালকরা এলজিবিটি কমিউনিটির জন্য ছবি তৈরি করেন, মূলত তাঁদেরই ফিল্ম এবং ভিডিয়ো দেখানো হয় এই চলচ্চিত্র উৎসবে। ‘বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’, ‘ড্রেসডেন শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’-এর পার্টনার এই ‘ডায়লগস’।

এই চলচ্চিত্র উৎসবে শুধু যে LGBTQIA+ কমিউনিটির মানুষরাই অংশগ্রহণ করেন, এমনটা নয়। অন্যান্য ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের তুলনায় ভিড় কম হলেও এত বছর পেরিয়ে ‘ডায়ালগস’-এ সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ক্রমশ বেড়েছে।

‘ডায়ালগস’ ভারতের প্রথম LGBTQIA+ চলচ্চিত্র উৎসব, তথ্যটা কি ঠিক? এত বছর কেটে যাওয়ার পর এই উৎসব নিয়ে কী বলবেন? “প্রথমেই বলি, না এই চলচ্চিত্র উৎসবকে আমি প্রথম বলবো না। এর আগেও এ দেশে এই ধরনের একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যে কোনও কারণে সেটা বন্ধ হয়ে যায়। সেদিক দিয়ে ডায়ালগস-কে অন্যতম প্রাচীন বলাই ভালো। এবার দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে বলি, যখন শুরু করেছিলাম, তখন থেকে এখনও অবধি আমরা নিজেদের লক্ষ্যে অবিচল থেকেছি। এটি ভারতের অন্যতম প্রাচীন চলচ্চিত্র উৎসব যা ২০০৭ সাল থেকে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে হয়ে আসছে। আমরা অনেক টাকা খরচ করে যে সিনেমাগুলো নিয়ে আসি, সেগুলো অন্য কোনও চলচ্চিত্র উৎসবে দেখার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। এই চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণের জন্যে কোনো টিকিটের প্রয়োজন নেই, কোনো বানিজ্যিক উদ্দেশ্যে এর আয়োজন করা হয় না। এই উৎসবের মূল উদ্দেশ্যে হল ক্যুইয়ার এবং রূপান্তরকামী মানুষের জীবন অভিজ্ঞতার সম্পর্কে ধারনা এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করা।” বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন ‘স্যাফো ফর ইক্যুয়ালিটি’-র কো-ফাউন্ডার মিনাক্ষী সান্যাল।

এই চলচ্চিত্র উৎসবে শুধু যে LGBTQIA+ কমিউনিটির মানুষরাই অংশগ্রহণ করেন, এমনটা নয়। অন্যান্য ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের তুলনায় ভিড় কম হলেও এত বছর পেরিয়ে ‘ডায়ালগস’-এ সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ক্রমশ বেড়েছে। “যাঁরা সিনেমা ভালোবাসেন, এরকম প্রচুর মানুষ আসেন আমাদের চলচ্চিত্র উৎসবে। এমন অনেকেই আছেন, যাঁরা আগে দর্শক হিসেবে যোগদান করতেন, এখন তাঁদের অনেকেই এই উৎসবে স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্বে পালন করছেন। কমিউনিটি’র মানুষদের জন্য এই উৎসব বিশেষ কারণ, এই চলচ্চিত্র উৎসব তাঁদের কাছে অনেকটা ঘরে ফেরার অনুভূতির মতো। বছরভোর ওঁরা অপেক্ষায় থাকেন ডায়ালগস-এ অংশগ্রহণ করবেন বলে। সারা বিশ্বে LGBTQIA+ ফিল্ম নিয়ে যা যা ভালো কাজ হচ্ছে সেসব দেখার সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের মতো করে আলোচনা-আড্ডা-সাজ সবটাই স্বাধীন ভাবে করতে পারেন তাঁরা। যাঁদের সঙ্গে সারা বছর যোগাযোগ থাকে না, বছরে এই কদিন সে সুযোগটা পাওয়া যায়। এই চলচ্চিত্র উৎসব কমিউনিটির মানুষদের মিলনক্ষেত্রও বটে।” বলেন মিনাক্ষী।

কিন্তু, কমিউনিটির মানুষ তো শুধু মাত্র শহরে থাকেন এমন নয়। গ্রাম-মফস্‌সলেও তো কমিউনিটির মানুষরা আছেন। তাঁদের কাছে আপনারা কতটা পৌঁছাতে পারছেন? এই চলচ্চিত্র উৎসব কি শুধু শহরকেন্দ্রিক? মিনাক্ষীর কথায় “এটা খুব দরকারি একটা প্রশ্ন। আমরা চেষ্টা করেছি। আমরা আসামে গিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছি কিন্তু যেটা হয়, গ্রাম বা শহরতলির মানুষের মনস্তত্ব আলাদা হওয়ার অনেক সমস্যায় পড়তে হয়, সহযোগীতা পাওয়া যায় না। তাছাড়া, দূরদূরান্তে গিয়ে সবকিছু আয়োজন করে চলচ্চিত্র উৎসব করার সামর্থ্য আমাদের নেই।  গ্রাম-শহরতলির কোনও এলজিবিটি+ কমিউনিটি যদি এ ধরনের আয়োজন করে আমাদের কাছে সিনেমা চায়, স্যাফো যে সিনেমাগুলো প্রডিউস করে, সেগুলো পাঠানোর ব্যবস্থা করি আমরা।”

১৭তম ডায়ালগস-এর উদ্বোধন হবে ১৭ নভেম্বর বিকেল সাড়ে ৫টায়। চলবে ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত। এই তিনদিন ধরে দেখানো হবে ভারত, জার্মানি, কিউবা, অস্ট্রিয়া, ক্রোয়েশিয়া, পর্তুগাল, সুইৎজারল্যান্ড, ইউকে, ফ্রান্স, কানাডা, চিলি, কলম্বিয়া ও রিপাবলিক, এ বছর মোট ১২ দেশের বাছাই করা ২৫টি ছবি দেখানো হবে। এর মধ্যে আছে পাঁচটি পূর্ন্যদৈর্ঘ্যের ছবি, ছ'টি তথ্যচিত্র এবং চোদ্দটি ছোটো ছবি।

সিনেমার তালিকা এবং সময়সূচী জানতে দেখুন : https://dialoguesfilmfest.in/

প্রবেশ পত্র পাওয়া যাবে ‘পড়শি’ এবং ‘চেতনা রিসোর্স সেন্টার’ থেকে বুধবার এবং বৃহস্পতিবার। শুক্রবার থেকে পাশ পাওয়া যাবে SRFTI থেকে। 

পড়শি’ র ঠিকানা : পি – ১৮৯ যোধপুর পার্ক, কলকাতা – ৭০০০৬৮

চেতনা রিসোর্স সেন্টারের ঠিকানা : ২১ যোগেন্দ্র গার্ডেন (সাউথ), হিন্দোল পার্কের কাছাকাছি, কলকাতা – ৭০০০৭৮

বিশদ জানতে ফোন করুন : ৭৪৩৯৪০৭৯৭০

Developed by DXDasia