ইএম বাইপাসে নজর কাড়ছে ৮০ ফুটের ম্যুরাল : নন্দিনীদের ক্যুইয়ার-আর্ট

অফবিট সিসিইউ-এর দেওয়ালে ঝলমল করছে চিত্রকর্মটি

শিল্প করতে চাও করো, ছবি আঁকতে চাও আঁকো কিন্তু তার সঙ্গে ‘ক্যুইয়ার’, ‘রূপান্তরকামী’, ‘জেন্ডার ফ্লুয়িডিটি’, ‘কমিউনিটি’ এসব থাকলে চলবে না। এই শর্তেই জায়গা দেবো। একের পর এক ‘না’ শুনতে হচ্ছিল তরুণ শিল্পী-ক্যুইয়ার আর্টিস্ট নন্দিনী মৈত্রকে। ইতিমধ্যেই দেশে-বিদেশে কাজ ছবির মধ্যে দিয়ে মানুষের কথা, সমাজের কথা তুলে ধরে প্রশংসিত হয়েছেন। এখন ইএম বাইপাসের (তপসিয়া) অফবিট সিসিইউ-এর দেওয়ালে ঝলমল করলেও, ৮০ ফুট ম্যুরাল আঁকার জন্য কলকাতা শহরে উপযুক্ত একটা দেওয়াল পেতেই কালঘাম ছুটে গেছিল নন্দিনীর।

জায়গাই পাচ্ছিলেন না শুরুতে। প্রায় তিনমাস ধরে বড়ো একটা দেওয়াল খুঁজছিলেন কাজটা করার জন্য, তিনি চাইছিলেন কাজটা প্রভাব ফেলুক, বেশি করে মানুষের চোখে পড়ুক। অনেকদিন ধরেই ফিয়ারলেস কালেকটিভের সঙ্গে কাজ করেন তিনি। বঙ্গদর্শন.কম-কে নন্দিনী জানান, “আমার ইচ্ছে ছিল নিউ মার্কেটের একটা দেওয়ালে কাজটা করবো। সেই মতো আমি কথা বলি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে, কাজটা করবো সব ঠিকঠাকও হয়ে গেছিল, কিন্তু যখন ওঁরা জানতে পারলেন আমি ট্রান্সম্যানদের নিয়ে কাজটা করছি এবং আমি নিজেও কমিউনিটির একজন, তখন ‘না’ বলে দেন। (জনসমক্ষে বলা হয়তো ঠিক হবে না, আমি মেট্রোরেলের কাছেও দেওয়াল চেয়েছিলাম। পাইনি।) অবশেষে ইএম বাইপাসের অফবিট সিসিইউ রাজি হয় আমার প্রস্তাবে।”

এই শিল্পকর্মে দেখানো হয়েছে ট্রান্স-কমিউনিটির সদস্যরা অন্যদের মতো দৈনন্দিন জীবনযাপন করছেন, একজন আরেকজনের চুল আঁচড়াচ্ছেন, একজন পুরুষ একটি শিশুকে ধরে রেখেছেন। এই কাজের লক্ষ্য হলো, পাবলিক আর্টের মাধ্যমে কলকাতার বাসিন্দাদের মধ্যে ট্রান্স-কমিউনিটির সচেতনতা বৃদ্ধি করা। কিন্তু, পাবলিক-আর্ট হিসেবে কলকাতায় আদৌ প্রাধান্য পাচ্ছে ক্যুইয়ার-আর্ট? নন্দিনীর কথায়, “কলকাতায় এই ধরনের কাজ আমি প্রথমবার করেছি। ব্যক্তিগত পরিসরে আমার কমিউনিটি, বন্ধুবান্ধব, পরিবার-পরিজন সবাই খুব খুশি, একথা নিজেরাই সরাসরি আমাকে জানিয়েছে। তবে, ইন্টারনেটে অনেকে ‘হেট-কমেন্টস’ বা ঘৃণামূলক মন্তব্য করছেন। আমি দেখেছি, ছেলেরাই বেশি রেগে যাচ্ছে। ‘পুরুষত্ব’-র যে সংজ্ঞা, সেখানে একটা চ্যালেঞ্জের ব্যাপার চলে আসছে।”

নন্দিনী মনে করেন, ভাবনা-বিনিময় বা কনভারসেশন খুব দরকারি। হেট-কমেন্টসগুলো তো একধরনের কনভারসেশনই। ৮০ ফুটের ম্যুরালটি দেখে অনেকেই মন্তব্য করেছেন, ‘একটা ছেলে কেন বাচ্চা সামলাচ্ছে!’  কেন সামলাবে না? বাবারা কি বাচ্চাদের দেখভাল করতে পারে না? হেট-কমেন্টেসের মাধ্যমে এই প্রশ্ন গুলোই উঠে আসছে। এর মাধ্যমে সামাজিক রক্ষণশীল ভাবনার পরিকাঠামোই প্রকাশ্যে আসছে আবার। 

 

তবে, নন্দিনীদের ৮০ ফুটের এই কাজে লিফট-অপারেটর হিসেবে যিনি নিযুক্ত ছিলেন, সেই রাজুদা কিন্তু বুঝিয়ে দিয়েছেন কিছুই বিশেষ বদলায়নি। এই সমাজে অন্ধকারের পাশাপাশি আলোও আছে, গড়পড়তার সঙ্গে ব্যতিক্রমীও আছে। “আমাদের সঙ্গে উনিও শুরু করলেন ছবি আঁকা। ওঁর স্ট্রোক দেখেই বুঝেছিলাম আঁকার ‘হাত’ আছে। লিফটে আমাদের ওঠানো-নামানোর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সঙ্গে ছবি আঁকতে শুরু করেন রাজুদা। রাজুদার বাড়ি সুন্দরবনে। বাবা মূর্তি বানাতেন আর তাতে রং করতেন, আঁকতেন রাজুদা। পরে সেসব বন্ধ হয়ে যায়। এটাও একটা কনভারশেসন। রাজুদা নিজের হারিয়ে যাওয়া ভালোলাগা ফিরে পেল এই কাজটার মাধম্যে।” বলেন নন্দিনী।

সমকামী, রূপান্তরকামী-সহ সকল প্রান্তিক যৌনতার মানুষদের সম্পর্কে তীব্র কুসংস্কার ছড়িয়ে আছে দেশের প্রায় সমস্ত কোণেই। রূপান্তরকামী মানুষদের কথাই ধরা যাক; তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে রূপান্তরকামীদের মানবাধিকার বিষয়ে পরিচালিত এই সমীক্ষাটি বলছে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, ভোটাধিকার, পরিবার ও বিবাহ, এমন নানান গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে রূপান্তরকামীরা অ-রূপান্তরকামী মানুষদের সমান অধিকার ভোগ করেন না আদৌ। গ্রামের স্বল্পশিক্ষিত মানুষ হয়েও, লিফটম্যান রাজুদা বিনীত ভাবে নন্দিনীদের জিজ্ঞেস করেছিলেন, কাকে দিদি/কাকে দাদা বলবেন। অত্যন্ত কৌতূহলী হয়ে জানতে চেয়েছিলেন, ‘ট্রান্সম্যানদের বাচ্চা কীভাবে হবে?’ শুধু রাজুদা নয় অফবিট সিসিইউ-র অনেক কর্মচারিই নন্দিনীদের এই প্রশ্নগুলো করেছিলেন। যথাসম্ভব উত্তর দিয়েছিলেন নন্দিনীরা। এই ছোটো ছোটো ঘটনাগুলোই নন্দিনীদের উৎসাহ দেয়, স্বপ্ন দেখায় সমান্তরাল পৃথিবীর।

ছবি সৌজন্যে: ফিয়ারলেস কালেকটিভ 

Post Tags
Developed by DXDasia