পাটুলির রাস্তাজুড়ে পাকাপাকি ভাবে জায়গা করে নিল বাংলার আলপনা

শিল্পী গুরুপদ বাছার রাঙিয়ে তুলছেন পাটুলিকে

বেশ কয়েক বছর ধরে দক্ষিণ কলকাতার পার্শ্বস্থ ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাসের পাটুলি হয়ে উঠেছে নতুন আকর্ষনীয় স্থান। স্থানীয় মানুষ গত কয়েকবছরে দেখেছেন থাইল্যান্ড স্টাইলের ভাসমান বাজার, দুদিকে গাছ দিয়ে ঘেরা চলার পথ (যার দেখা সাধারণত বিদেশেই পাওয়া যায়), লেকের ধারে সুরম্য বেঞ্চ এবং আলোয় সুসজ্জিত পার্ক, আর ফুটপাথে সার দেওয়া মুখরোচক খাবারের দোকান, যা প্রতিটি অর্থনৈতিক শ্রেণীর মানুষই কিনতে সমর্থ হবেন। পার্কের ভিতরের এবং বাইরের খাবারের স্টলগুলি খাদ্যরসিকদের রসনা তৃপ্ত করবে, তাতে সন্দেহ নেই। আগন্তুকরা এখানে এলে দেখতে পাবেন দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের একটি প্রতিরূপ, বিশাল বিশাল দুর্গামূর্তি, তার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রামকৃষ্ণ পরমহংস, সারদা দেবী এবং স্বামী বিবেকানন্দের মূর্তি। ছোটা ভীম, বাল গণেশ প্রভৃতি মূর্তিগুলি শিশুদের মুগ্ধ করবেই।

পাটুলির নতুন পর্যায়ের সৌন্দর্যায়নের কাজ এবছর দুর্গাপূজার আগেই শেষ হয়ে যাবে। প্রথমবারের জন্য পাটুলির একটি গোটা রাস্তাকে গ্রাফিতি (Graffiti)  দিয়ে সাজিয়ে তোলা হচ্ছে। এই স্ট্রিট আর্ট-এর ধরনটি আয়ারল্যান্ডের বেলফেস্টের অনুরূপ। রাস্তার ৩০০ ফিট লম্বা এবং ১২ ফিট চওড়া অংশটি ইতিমধ্যেই উজ্জ্বল জ্যামিতিক নকশায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। 

বার্লিন, বেথলেহেম, বেলফেস্ট প্রভৃতি শহরের দেওয়ালগুলি ছবি আর গ্রাফিটির মাধ্যমে যেন কথা বলে। সেই কথায় উঠে আসে তাদের ইতিহাসের ক্ষত। উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেলফেস্টে গ্রাফিটির মাধ্যমে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু তরুণ শিল্পীরা ধীরে ধীরে পাল্টে দিচ্ছেন শিল্পের মাধ্যম এবং উদ্দেশ্য, দুটোকেই। রংবাহারি স্ট্রিট আর্ট (Street Art) বেলফেস্ট শহরকে করে তুলেছে আরও সুন্দর। বহু তরুণ শিল্পী অতীতের ‘দ্য ট্রাবলস’-এর ইতিহাসকে পিছনে ফেলে খুঁজে নিচ্ছেন নতুন পথ। প্রসঙ্গত, ‘দ্য ট্রাবলস’ (The Troubles) হলো অনেকগুলি ম্যুরালের সমষ্টি, যার মধ্যে দিয়ে ফুটে উঠত রাজনৈতিক বার্তা। ১৯২০-এর দশকে, এই ধরনের ম্যুরালে ছেয়ে গিয়েছিল বেলফেস্টের রাস্তা, যার থেকে এখন সরে আসছেন এই প্রজন্মের শিল্পীরা। কলকাতাও এই স্ট্রিট আর্টের উদ্যোগে সামিল হচ্ছে। খুব শীঘ্রই পাটুলির একটি রাস্তাকে বর্ণোজ্জ্বল হয়ে উঠতে দেখবেন শহরবাসী। 

‘হিট দ্য নর্থ’ (Hit the North)-এর মতন স্ট্রিট আর্ট ফেস্টিভ্যাল (Street Art Festival) বেলফেস্টকে বিশ্বের অন্যতম রঙিন এবং সুন্দর শহর বানিয়ে তুলেছে। প্রতি বছর অসংখ্য পর্যটক বেলফেস্টের এই ম্যুরালগুলি দেখতে ভীড় করেন। আশা করা যায়, স্ট্রিট আর্টের এই কাজটি শেষ হলে পাটুলিও মানুষকে নতুন করে আকর্ষণ করবে। আশা করা যায়, বেলফেস্টের মতন আমাদের শহরও ম্যুরাল আর গ্রাফিতিতে রঙিন আর সুসজ্জিত হয়ে উঠবে। 

পাটুলির এই নতুন সজ্জার মূল কাণ্ডারি হলেন অভিজ্ঞ শিল্পী গুরুপদ বাছার। তিনি এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা- যাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন হলেন গভর্নমেন্ট কলেজ অফ আর্ট অ্যান্ড ক্রাফটের প্রাক্তনী- স্ট্রিট আর্টগুলি তৈরি করতে নিরলস পরিশ্রম করে চলেছেন। পাটুলিতে গেলে যে সমস্ত মূর্তি চোখে পড়ে, সেগুলির বেশিরভাগটাই গুরুপদ বাছারের হাতেই তৈরি। এই স্ট্রিট আর্ট তাঁর মুকুটে নতুন পালক হতে চলেছে। তিনি, ২০০৪ সালে,  বাংলার তৎকালীন রাজ্যপাল বীরেন জে. শাহ-র ছবি এঁকে প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। স্বয়ং বীরেন জে. শাহ মুগ্ধ হয়েছিলেন সেই ছবি দেখে।  

স্ট্রিট আর্টের বিভিন্ন ধরন রয়েছে। এর জন্য বিভিন্ন কৌশলও ব্যবহার করা হয়। পাশ্চাত্যে স্প্রে রঙের সাহায্যে স্ট্রিট আর্ট করা হয়। এছাড়াও রয়েছে স্টেনসিলিং, পেস্ট-আপ পোস্টার, স্ল্যাপ-আপ স্টিকার, বিভিন্ন রঙের বৈদ্যুতিক তারের ব্যবহার। এরোসল পেইন্ট একটি অন্যতম প্রচলিত মাধ্যম, যার সাহায্যে দ্রুত এই কাজ করা যায়। ব্যবহার করা হয় মার্কার, বিভিন্ন ধরনের পেইন্ট, এমনকি অগ্নি নির্বাপক যন্ত্রের ভিতরে রং ভরে স্প্রে করার প্রথাও রয়েছে। স্ট্রিট আর্টিস্টরা যে কোনও উপলব্ধ মাধ্যমই ব্যবহার করে থাকেন, যেমন- স্টেনসিল, স্টিকার, পোস্টার, টেক্সটাইল, এলইডি লাইট, মোজাইক, ভিডিও প্রোজেকশন। স্ট্রিট আর্টের দুনিয়ায় একটি নতুন পদ্ধতি হলো ইয়ার্ন বম্বিং, অর্থাৎ রঙিন, গিঁটবদ্ধ ইয়ার্ন বা সুতোর মাধ্যমে রাস্তা বা দেওয়ালকে রাঙিয়ে তোলা। 

গুরুপদ বাছার এবং তাঁর সহকর্মীরা আবহাওয়া-প্রতিরোধী রং ব্যবহার করছেন, যাতে বৃষ্টিতেও তাঁদের শিল্পকর্মগুলি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। তিনি একসময় ছবির পোস্টার আঁকতেন। কিন্তু এখন হাতে আঁকা পোস্টারের জায়গা দখল করেছে ডিজিটাল পেইন্টিং। গুরুপদ বাছারও সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজের কাজের ধারাকে বদলে ফেলেছেন। তাঁর পুত্র পার্থপ্রতিম বাছার (গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র) এবং তাঁর কন্যা প্রতিমা বাছার (গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী) তাঁকে এই কাজে সাহায্য করছেন। তাঁরা মূলত চারটি মুখ্য রং ব্যবহার করছেন- টেরাকোটা, সবুজ, কালো, সাদা। তাঁদের শৈল্পিক হাত কালো পিচের রাস্তার উপরে ফুটিয়ে তুলছে জ্যামিতিক ও অন্যান্য নকশার আলপনা। স্ট্রিট আর্টের মাধ্যমে সামাজিক, রাজনৈতিক বা পরিবেশজনিত বার্তা দেওয়া হয়ে থাকে। আর গুরুপদবাবুদের স্ট্রিট আর্ট মেলে ধরছে দেশীয় নকশার সৌন্দর্য ও অভিনবত্ব।

Post Tags
Developed by DXDasia