দেবরাজ নাইয়ার সিনেমা ‘বীজাঙ্কুর’ : যুদ্ধের ময়দানে অসহায় শিশুদের স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন

সাউথ এশিয়ান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হবে দেবরাজ নাইয়ার ছবি ‘বীজাঙ্কুর’

মেরিকার প্রখ্যাত কবি ল্যাংস্টন হিউজ (Langston Hughes) বলেছিলেন, “আমি এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি, যেখানে মানুষ মানুষকে ঘৃণা করে না।” কিন্তু তবুও ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ে দেশ-দশের মধ্যে। ভালোবাসার চেয়েও ফেটে পড়ে তীব্র ঘৃণার চিৎকার। মানুষ মানুষকে ছোটো চোখে দেখতে শুরু করে। যুগ বদলায়, মানুষ বদলায় না। এরপরেও রয়ে যায়, সেই অমোঘ সত্যটি। যেখানে বলা হয়, ঘৃণার চেয়ে ভালোবাসা অনেক বেশি মানুষকে প্রভাবিত করে। তাই সকলের উচিত ভালোবাসায় থাকতে। তবুও তো দেশে যুদ্ধ হয়। অসম শক্তির লড়াইয়ে কেউ জিতে যায়, কেউ হেরে যায়। কেউ শোনে না শিশুদের কান্না। যাদের মধ্যে প্রোথিত রয়েছে আগামী। তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা দেবরাজ নাইয়ার ছবি ‘বীজাঙ্কুর’ (Beejankur/Seedligs) যুদ্ধবিরোধী কিছু শিশুদের কথা বলতে চেয়েছে। কেমন হবে, যদি দেশের শান্তির সংজ্ঞা রচনা করে শিশুরা? এ দৃশ্য অলীক। কল্পনা মাত্র। তবুও কিছু কথা রহিয়া যায়…

শিশুদের কথা নেই পৃথিবীর কোনো রাজনৈতিক ম্যানিফেস্টোতে। অথচ শিশুদের মতো উজ্জ্বল ফুল এ দুনিয়ায় বিরল। তাদের মনস্তত্ব নিয়ে বিভিন্ন দেশে পড়াশোনা হয় বটে। কিন্তু কে শোনে কার কথা! দেবরাজ নাইয়া (Debraj Naiya) তাঁর সাম্প্রতিকতম ছবি ‘বীজাঙ্কুর’-এর প্রধান চরিত্র করেছেন একদল শিশুকে। তাদের জন্ম এক যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে। যুদ্ধের ময়দান থেকে উড়ে আসা ভাঙাচোরা জিনিস হয়ে ওঠে শৈশবের খেলনা। মৃতপ্রায় মায়ের আর্তনাদ চাপা পড়ে যায় যুদ্ধবিমানের ভয়ানক আওয়াজে। এ যেন এক সমান্তরাল দুনিয়া। যাকে অস্বীকার করা মানুষের সাধ্যের বাইরে। ঋত্বিক ঘটকের (Ritwik Ghatak) ‘সুবর্ণরেখা’ ছবিতে ছোট্ট সীতা খুঁজে চলেছে নতুন বাড়ি। তার শিশুচোখে ধরা পড়ে মায়ের কোল হারানো চিৎকার, দাদার জন্য চিন্তা হয় তার। ঋত্বিক ঘটক সীতার মধ্যে দিয়ে এঁকেছেন চিরন্তন এক শৈশব, যেখানে যুদ্ধশেষে কঠিন বাস্তব দাঁড়িয়ে থাকে তার সামনে। দেবরাজ নাইয়া ‘বীজাঙ্কুর’-এ দেখালেন যুদ্ধ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কীভাবে প্রভাবিত করে শিশুমনকে।

দেবরাজ নাইয়া তাঁর সাম্প্রতিকতম ছবি ‘বীজাঙ্কুর’-এর প্রধান চরিত্র করেছেন একদল শিশুকে। তাদের জন্ম এক যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে। যুদ্ধের ময়দান থেকে উড়ে আসা ভাঙাচোরা জিনিস হয়ে ওঠে শৈশবের খেলনা। মৃতপ্রায় মায়ের আর্তনাদ চাপা পড়ে যায় যুদ্ধবিমানের ভয়ানক আওয়াজে। এ যেন এক সমান্তরাল দুনিয়া।

সাউথ এশিয়ান চলচ্চিত্র উৎসবে (South Asian Film Festival) আগামী ৬ অগাস্ট, কলকাতার নন্দন-এ প্রদর্শিত হবে দেবরাজ নাইয়া পরিচালিত ছোটোছবি ‘বীজাঙ্কুর’। ১৯৪৫ সালের ওই একই দিনে (৬ অগাস্ট) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনী জাপানের হিরোশিমায় বোমা ফেলে। সেই দিনটিকে স্মরণ করে প্রতিবছর বিশ্বে হিরোশিমা দিবস (Hiroshima Day) পালিত হয়। এমন দিনে শহরে প্রদর্শিত হবে যুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত এই যুদ্ধবিরোধী ছবি (Anti-War Film)।

পরিচালক দেবরাজ নাইয়া পেশায় একজন শিক্ষক। তিনি বলেন, “কাজের সূত্রে সারাদিনের একটা বড়ো অংশ কাটে শিশুদের সঙ্গ। যদি ছোটোদের স্কুলে পড়াতে না আসতাম, তাহলে নতুন করে শৈশবকে আবিষ্কার করতে পারতাম না। ছোটোদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুবিধা অনেক। আমার মনে হয় জীবনকে অনেক সহজভাবে দেখাতে ও শেখাতে পারে একমাত্র শিশুরাই।”

আমরা ভারতবর্ষীয় আধুনিক মানুষরা সচক্ষে তেমন যুদ্ধ দেখিনি। কিন্তু বিশ্বের একাংশ প্রতিনিয়ত যুদ্ধ দেখছে। ইরাক, ইরান, আজারবাইজান, সিরিয়া, প্যালেস্টাইন, আফগানিস্তান, লিবিয়া, ইথিওপিয়া-র মতো যুদ্ধপ্রবণ দেশগুলিতে যুদ্ধের ময়দানেই নির্মিত হয়েছে বহু শক্তিশালী চলচ্চিত্র। যা আক্ষরিক অর্থে যুদ্ধবিরোধী ছবি। ইরানের পরিচালক মোহম্মদ রসৌলফের (Mohammad Rasoulof) ‘দেয়ার ইজ নো ইভিল’, যেখানে চারজনকে মৃত্যুদণ্ড মোকাবেলা করতে হয় তাদের নিজস্ব উপায়ে। কেউ শাসকদের হয়ে জল্লাদের কাজ করেন, কিন্তু জীবনের অন্তিম দিন পর্যন্ত অক্ষত থাকে ভালোবাসা। রাষ্ট্রকে ফাঁকি দিয়ে কেউ আবার সংশোধনাগার থেকে পালাতে চায়। আবার স্যাম ম্যান্ডেসের (Sam Mendes) অস্কারজয়ী ছবি ‘১৯১৭’-র একটি ছোট্ট দৃশ্যে আমরা দেখি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ময়দানে মা-সন্তানের কাকুতি। মনে পড়ে যায় ফারহা নাবুলসি (Farah Nabulsi) পরিচালিত প্যালেস্টাইনের ছবি ‘দ্য প্রেজেন্ট’-এর কথাও।

আমরা ভারতবর্ষীয় আধুনিক মানুষরা সচক্ষে তেমন যুদ্ধ দেখিনি। কিন্তু বিশ্বের একাংশ প্রতিনিয়ত যুদ্ধ দেখছে। ইরাক, ইরান, আজারবাইজান, সিরিয়া, প্যালেস্টাইন, আফগানিস্তান, লিবিয়া, ইথিওপিয়া-র মতো যুদ্ধপ্রবণ দেশগুলিতে যুদ্ধের ময়দানেই নির্মিত হয়েছে বহু শক্তিশালী চলচ্চিত্র। যা আক্ষরিক অর্থে যুদ্ধবিরোধী ছবি।

দেবরাজ নাইয়ার ‘বীজাঙ্কুর’ দেখতে গিয়ে ঘুরে দেখলাম এ মহাবিশ্ব। কেমন আছে মানুষ? কেমন আছে শিশুরা? দেবরাজ বলেন, “যুদ্ধ আসলে কী, সে বিষয়ে আমার কোনো ধারণা নেই৷ কারণ আমি কখনও যুদ্ধ দেখিনি।  যুদ্ধ আমার কাছে শুধুমাত্র একটা তথ্য। যা যেকোনো মিডিয়া মারফৎ আমার কাছে এসে পৌঁছায়। এবং সেই তথ্যটুকুই আমাকে খানিক বিচলিত করে।”

বহির্যুদ্ধ ছাড়াও আমাদের সমাজে আড়ালে থেকে যায় অন্তর্যুদ্ধ। যা চাপা। যা গোপন। ব্যক্তিজীবনের এই যুদ্ধের খানিক অভিজ্ঞতা হয়েছে দেবরাজের। তিনি জানাচ্ছিলেন এক স্কুল-পড়ুয়ার কথা। দেবরাজ তখন সদ্য স্কুলে চাকরি পেয়েছেন। একদিন ক্লাসে একটি মেয়ে আসে, যার মুখে ক্ষতচিহ্ন। দেখে আন্দাজ করা যায়, ঘটনাটি সদ্য ঘটেছে। “আমি যখনই তাকে জিজ্ঞাসা করলাম এটা কী করে হল? মেয়েটি খানিক  হাসে এবং এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করে। একটু পীড়াপীড়ি করার পর ওর এক বন্ধু জানায় যে, মেয়েটির বাবা তার মাকে মারধর করছিল পয়সার জন্য। ওই সময় মাকে ঠেকাতে গেলে বাচ্চা মেয়েটিকে কাঠের জলচৌকি ছুঁড়ে মারে। সেই অবস্থায় মেয়েটি স্কুলে আসে। …এই ঘটনা মেয়েটির জীবনে স্বাভাবিক। কারণ রোজই সে এই দৃশ্যের সাক্ষী। …তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া বাচ্চার এই মানসিক অবস্থা কোনো যুদ্ধক্ষেত্রের থেকে কম নয় বলে আমার ধারণা।” বলছিলেন ‘বীজাঙ্কুর’ ছবির পরিচালক দেবরাজ নাইয়া।

এমন শিশুবয়সে ফুল-প্রজাপতির পিছনে ঘুরে বেড়াবার কথা। কিন্তু শিশুটি প্রতিনিয়ত দেখছে পারিবারিক যুদ্ধ। মনে রাখতে হবে, একজন শিশুর কাছে তার বাড়িটিই একমাত্র দেশ এবং পৃথিবী। সেখানে ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি হলে শিশুমনে তা গভীর ছাপ ফেলে।

দেবরাজ নাইয়ার ‘বীজাঙ্কুর’ এক অন্ধকার সময়ের ফসল। ব্যতিক্রমী মেধাযুক্ত কাজ। যেখানে দৃশ্যায়িত হয় পৃথিবী একটি যুদ্ধক্ষেত্র। সেখানে সবচেয়ে কষ্ট পায় অসহায় শিশুরা। ব্যথা, ধ্বংস এবং মৃত্যু তাদের দুঃস্বপ্নের মতো তাড়া করে। তবুও কীভাবে যেন এই ছোট্ট হাতগুলো বেঁচে থাকে স্বপ্নের, আশার, উদযাপনের দেশে। এভাবে নির্মিত হয় সময়। মাত্র পনেরো মিনিটে এমন অসম্ভব চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন দেবরাজ। ছবিতে চিত্র এবং দৃশ্যভাবনা কথা বলেছে দর্শকদের সঙ্গে। তৈরি হয়েছে কথোপকথনের নানান স্তর। এমন ছবি দর্শককে প্রশ্ন করবে, আশা জাগাবে, নিশ্চিত।

ট্রেলার লিংক

Developed by DXDasia