এদেশে প্রথম ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় বাংলার ময়দানে
শহর জুড়ে এখন একটাই উন্মাদনা, আই পি এল। ঘোর ঝড় বৃষ্টি উপেক্ষা করেও উপচে পড়া ভিড়-এর ছবিটাই জানান দিয়ে যাচ্ছে, বাঙালির ক্রিকেট প্রেম এখনও অক্ষত। তবে ক্রিকেট নিয়ে আজকের উচ্ছ্বাসের গোপন রহস্যটা কিন্তু লুকিয়ে আছে অতীতের কাহিনিতে।
ক্রিকেটের শহর কলকাতা (Kolkata)। পুরোনো কলকাতার ছবিটা মনে করলে এখনও অলিতে গলিতে ব্যাট বলের শব্দ শোনা যায়। ছোটোবেলা থেকেই কচিকাঁচাদের ক্রিকেট নিয়ে থাকে টানটান উত্তেজনা। আজকাল অবশ্য গলির ক্রিকেটের চিত্রটা বিলুপ্তির পথে, আধুনিকতার যুগে বাঙালি পরিবারে ক্রিকেট এখন খানিকটা বিলাসিতা বলা চলে।
আরও পড়ুন: বাংলার নতুন ক্রিকেট আইকন রিচা ঘোষ
ক্রিকেট (Cricket) খেলার জন্মটা ইংল্যান্ডে হলেও এদেশের মাটিতে প্রথম ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয় ১৭৫১ সালে বাংলার ময়দানেই। পরবর্তীতে ১৭৯২ সালে তৈরি হয় ক্যালকাটা ক্রিকেট ক্লাব এবং ১৭৯৩ সাল থেকে বাঙালির প্রথাগত ক্রিকেটের শুরু। শুটে ব্যানার্জি, শ্যামসুন্দর মিত্র, গােপাল বসু, পঙ্কজ রায় থেকে শুরু করে সৌরভ গাঙ্গুলি (Sourav Ganguly), ঝুলন গোস্বামী (Jhulan Goswami) ইত্যাদি অজস্র পরিচিত নাম জানান দিয়ে যায় এ বাংলায় ক্রিকেটের ভিত ঠিক কতটা মজবুত। ভারতের প্রাচীনতম ক্রিকেট স্টেডিয়াম রয়েছে এই শহরে – ইডেন গার্ডেন্স (Eden Gardens)।
খেলাটা অবশ্য এসেছিল ব্রিটিশদের হাত ধরেই। ব্রিটিশদের প্রথম রাজধানী ছিল কলকাতা। সুদূর ইউরোপ থেকে এসে আমাদের দেশে উপনিবেশ গড়ে তোলেন ইংরেজরা, এক নতুন সংস্কৃতিও নিয়ে এসেছিলেন সঙ্গে করে। নানা ধরনের খেলাও ছিল তাঁদের ঝুলিতে। নিজেদের মধ্যেই ফুটবল এবং ক্রিকেট ম্যাচের আয়োজন করতেন। এদেশের মানুষেরা অবাক হয়ে দেখতেন ‘গোরা সাহেব’দের খেলা।
ইংরেজদের টিম অনেক কষ্টে ২০ রান করতে পেরেছে। তার মধ্যেই একের পর এক উইকেট হারাতে হয়েছে তাঁদের। নরেন্দ্রনাথ একাই ৭টি উইকেট নিল সেই বার।
শোনা যায়, এভাবে দেখতে দেখতেই ক্রিকেটের নিয়ম-কানুন রপ্ত করে ফেলেন কয়েকজন ভারতীয়। খেলতেও শুরু করেন। পাতিয়ালা, কাশ্মীর, রাজপুতানা, মধ্যভারতের বেশ কিছু দেশীয় রাজ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠল ক্রিকেট। রাজা-রাজড়াদের উদ্দেশ্য ছিল ক্রিকেটের মাধ্যমে শাসক ইংরেজদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা। অন্যদিকে বাংলার জমিদার এবং মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকদের একাংশ চাইতেন অত্যাচারী ব্রিটিশদের খেলার মাঠে নিয়ে গিয়ে যোগ্য জবাব দিতে। বাংলার নানা প্রান্তে তাঁরা ক্রিকেট খেলা ছড়িয়ে দিতে থাকেন।
এঁদের মধ্যে একজন ছিলেন হেমবাবু। অভিজাত পরিবারের মানুষ। ছেলে-ছোকরাদের নিয়ে বানিয়ে ফেলেন একটি ক্রিকেট টিম। নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। নতুন প্রতিভার খোঁজও জারি থাকে। হঠাৎ হেমবাবুর চোখে পড়ে বলিষ্ঠ এক যুবক। অম্বুবাবুর ব্যায়ামাগারে নিয়মিত শরীরচর্চা করে। দেখেই বোঝা যায়, সম্ভ্রান্ত বাড়ির ছেলে। কুস্তি, লাঠি খেলা, তলোয়ার খেলায় দক্ষ। বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপে রুপো জিতে নিয়েছে ইতিমধ্যেই।
হেমবাবু একদিন তাকে ডেকে পাঠালেন। যুবক জানায়, তার নাম নরেন্দ্রনাথ দত্ত। জেনারেল অ্যাসেমব্লি থেকে এফএ এবং বিএ পাশ করেছে। হেমবাবু জিজ্ঞেস করলেন, ক্রিকেট খেলতে আগ্রহী কিনা। নরেন্দ্রর চটজলদি উত্তর, সুযোগ পেলে চেষ্টা করে দেখতে পারে। তাকে টিমে নিলেন হেমবাবু। বুঝেছিলেন, বলিষ্ঠ চেহারার এই ছেলেটি বোলিং করতে পারবে ভালো। সেই দায়িত্বই দিলেন। খেলার উত্তেজনায় আবেগতাড়িত হয়ে উঠেছিল নরেন্দ্র। হেমবাবু পরামর্শ দিলেন, “মনটাকে ঠিক রাখবে, দেখবে হাতের থেকে বল আপনিই লক্ষ্যে গিয়ে আছড়ে পড়বে!” সেই মতো অনুশীলন চালিয়ে যেতে লাগল যুবক।
এরই মধ্যে সে যোগ দিল ক্যালকাটা টাউন ক্লাবে। তখন ক্রিকেটের দুনিয়ায় ইউরোপিয়ান ক্লাবের দারুণ নামডাক। দক্ষ ব্রিটিশ ক্রিকেটাররা সেখানে খেলেন। একটি ম্যাচে তাঁদের মুখোমুখি হল নরেন্দ্রনাথ। কলকাতা সেদিন তার হাতে জাদু দেখল। ইংরেজদের টিম অনেক কষ্টে ২০ রান করতে পেরেছে। তার মধ্যেই একের পর এক উইকেট হারাতে হয়েছে তাঁদের। নরেন্দ্রনাথ একাই ৭টি উইকেট নিল সেই বার।
পরবর্তীকালে নরেন্দ্রনাথ পরিচিত হয়ে ওঠেন অন্য নামে। শিকাগোর ধর্মমহাসভায় গিয়ে উজ্জ্বল করেন ভারতের মুখ। ঠিকই ধরেছেন, তিনি আমাদের সবার প্রিয় বীর সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দ (Swami Vivekananda)। তাই বাঙালির ক্রিকেটের ইতিহাস লিখতে বসলে শুটে, সৌরভ, ঝুলনের সঙ্গে তাঁর গল্পটাও স্বীকার করতেই হয়।
ছবিঋণ : https://puronokolkata.com/