বিশ্বকাপে সর্বাধিক উইকেটের মালিক ঝুলন গোস্বামী, রেকর্ড ভাঙলেন বাংলার মেয়ে

পাঁচটি বিশ্বকাপের ৩১টি ম্যাচ, ঝুলন গোস্বামী দখল করেন মোট ৪০টি উইকেট

দিয়ার (Nadia) এক মফস্‌সলের ধন্যি মেয়ে সে। দীঘল, ছিপছিপে, খেলুড়ে। ছোটোবেলা থেকেই সে মাঠের মেয়ে। ছেলেদের সঙ্গে রীতিমতো পাল্লা দিয়ে খেলে বেড়াত। নদিয়ার চাকদহের মতো মফস্‌সলে যা মোটেই স্বাভাবিক নয়। তাতে অবশ্য কিছু এসে যেত না মেয়েটির। একদম ছোট্ট থেকেই বাবুল ওরফে ঝুলন গোস্বামী (Jhulan Goswami) ছিল এরকমই। 

সময়টা ১৯৯২, টিভিতে চলছে ওয়ার্ল্ড কাপ (World Cup) ক্রিকেট। ঝুলনের বয়স তখন মাত্র ১০ বছর। ওই বয়সেই ঝুলন যেন এক অন্যরকম টান অনুভব করেছিল। ডানপিটে সেই মেয়েটি স্থির করেছিল, পুরোদমে ক্রিকেট খেলবে সে। যাকে বলে পেশাদারি ক্রিকেট (Cricket)। কিন্তু সেই সময়ে দাঁড়িয়ে একটা মেয়ের জন্য এই ভাবনা যে শুধু বিরল ছিল এমন নয়, নদিয়ার মতো জায়গা থেকে এই লড়াইটা করা ছিল খুবই কঠিন। কিন্তু সাহসের অন্ত ছিল না বাংলার ধন্যি মেয়ের। তাই সেই কঠিন কাজটাই করে দেখিয়েছিলেন ঝুলন ওই স্কুলে পড়া বয়স থেকে। চাকদহ থেকে কলকাতা ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করে বিবেকানন্দ পার্কে কোচ স্বপন সাধুর কাছে প্রথাগত ট্রেনিং শুরু করেন তিনি।

বাঙালি পরিবারের মেয়ে হয়ে ‘ছেলেদের মতো’ মাঠে ঘাটে খেলে বেড়ানো খুব একটা সহজ কাজ ছিল না কোনোদিনই। আত্মীয়-পরিজনের বাঁকা হাসি, তির্যক মন্তব্য সবকিছু সয়েও লড়াইটা চালিয়ে গিয়েছিলেন ঝুলন। একদিকে অদম্য জেদ, অন্যদিকে স্বপ্নপূরণের খিদে, চকদহের (Chakdaha) সেই বাবুলকে করে তুললো আজকের ঝুলন গোস্বামী। চাকদহের ফ্রেন্ডস ক্লাব আর নবারুণ সমিতির মাঠ থেকে ক্রিকেট শুরু করেন ঝুলন গোস্বামী, তারপর থেকে দীর্ঘ জার্নি পেরিয়ে তিনি আজ ভারতের মহিলা ক্রিকেট টিমের আইকন। বাংলার গর্ব।

শনিবারের ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ১টি উইকেট নেওয়া মাত্রই এককভাবে গড়ে ফেলেন নতুন নজির। গত বৃহস্পতিবার নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধ-ম্যাচেই ছুঁয়ে ফেলেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার লিন ফুলস্টনেপর ৩৯ উইকেটের বিশ্বরেকর্ড। এবার ঝুলনই বিশ্বের শীর্ষে।

ঘরোয়া ক্রিকেট ম্যাচ থেকে বিশ্বকাপের ২২ গজ, সবেতেই দুরন্ত পারফরমেন্স দিয়েছে ঝুলন গোস্বামী। সম্ভবত ভারতের জার্সিতে এই শেষবার বিশ্বকাপ খেলতে নামলেন তিনি। আর শেষে এসেও যুদ্ধ জয়ে নজির গড়লেন বাংলার মেয়ে ঝুলন। হ্যামিলটনের চলতি বিশ্বকাপে বাংলার তারকা পেসার পরিণত হলেন মেয়েদের ওয়ান ডে বিশ্বকাপে সব থেকে বেশি উইকেট নেওয়া বোলারে।

শনিবারের ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ১টি উইকেট নেওয়া মাত্রই এককভাবে গড়ে ফেলেন নতুন নজির। গত বৃহস্পতিবার নিউজিল্যান্ডের (New Zealand) বিরুদ্ধ-ম্যাচেই ছুঁয়ে ফেলেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার লিন ফুলস্টনেপর ৩৯ উইকেটের বিশ্বরেকর্ড। এবার তিনিই বিশ্বের শীর্ষে। ঝুলন ২০০৫ থেকে ২০২২ পর্যন্ত ৫টি বিশ্বকাপের ৩১টি ম্যাচে মাঠে নেমে দখল করলেন মোট ৪০টি উইকেট।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক একদিনের ক্রিকেটে (One Day Cricket Match) প্রথম মহিলা ক্রিকেটার হিসেবে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারের মুকুট ছিল ডানহাতি মিডিয়াম ফাস্ট বোলার ঝুলনের মাথায়। ২০০৭-এ আইসিসি বর্ষসেরা মহিলা ক্রিকেটার নির্বাচিত হন ঝুলন গোস্বামী। ২০১০-এ পান অর্জুন পুরস্কার, ২০১২-তে পদ্মশ্রী পুরস্কার।

ঝুলন গোস্বামী নামটা যেন আজ এক স্বপ্নের নাম। বাংলার ঘরের মেয়ে থেকে ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের অধিনায়ক, এ যেন এক অনন্য জার্নি। আজও যেসব মেয়েরা মাঠে নামার জন্য উৎসাহী, তাদের সকলের কাছে সাহসের নাম ঝুলন গোস্বামী। লড়াইয়ের নাম ঝুলন গোস্বামী। চাকদহের সেই ঝুলনের জীবনের লড়াই এবার মাঠ থেকে উঠে আসতে চলেছে সিলভার স্ক্রিনেও। বাংলার ঝুলনকে নিয়ে তৈরি হচ্ছে বায়োপিক। ইতিমধ্যেই মুক্তি পেয়েছে বায়োপিক ‘চাকদা এক্সপ্রেস’-এর টিজারও। ছবিটির কাহিনি নির্মাণ করেছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। পরিচালনার ভার নিয়েছেন পরিচালক প্রসিত দে। ‘চাকদা এক্সপ্রেস’–এ (Chakda Express) ঝুলনের ভূমিকায় অভিনয় করছেন অনুষ্কা শর্মা। ১০ বছর বয়স থেকে আজকের বিশ্বকাপ পর্যন্ত ঝুলন গোস্বামীর গোটা জীবনের জার্নি এবং ২২ গজের গল্প যেন মিলেমিশে যাবে রুপোলি পর্দায়। বাঙালিও তাই অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে সেই দিকেই। না শুধু বাঙালি বললে ভুল হবে, ঝুলন গোস্বামী গোটা ভারতের গর্ব।

জাতীয় জার্সি পরে, হাতে বল নিয়ে দুরন্ত গতিতে ছুটে আসছেন ঝুলন, আর নিমেষের মধ্যে মিডল স্ট্যাম্পটা ভূপতিত, পলকের মধ্যে যেন এক স্বপ্নের মহল তৈরি হওয়া। ঝুলন গোস্বামী মানে আজও গ্যালারি ভর্তি উন্মাদনা কিংবা ড্রয়িংরুমের টিভির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা। নদিয়ার চাকদহ থেকে মহিলা ক্রিকেটে সর্বকালের সেরা বোলার হয়েই থেকে যাবেন বাংলার আইকন ঝুলন গোস্বামী।

Post Tags
Developed by DXDasia