যে বাগানবাড়িতে ‘কল্পতরু’ হয়েছিলেন রামকৃষ্ণ

রামকৃষ্ণের মহাপ্রয়াণ ঘটে এই বাড়িতেই

রামকৃষ্ণ পরমহংসের গলা থেকে রক্তক্ষরণ শুরু হয় ১৮৮৫ সালে। ডাক্তারি পরিভাষায় এই যন্ত্রণাময় অবস্থার নাম ক্লার্জিম্যান’স থ্রোট। তাঁর চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছিলেন তখনকার বিখ্যাত ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার। চিকিৎসার জন্য ওই বছরের অক্টোবর মাসে রামকৃষ্ণকে দক্ষিণেশ্বর থেকে নিয়ে যাওয়া হয় কলকাতার শ্যামপুকুরে। ডাক্তার মহেন্দ্রলালের মতে, রামকৃষ্ণ ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন। শ্যামপুকুরে রোগের উপশম ঘটল না, বরং কষ্ট বেড়েই চলল। মাস তিনেক সেখানে থাকার পর ডাক্তার সরকারের পরামর্শে ভক্তরা ১১ ডিসেম্বর বিকেলে রামকৃষ্ণকে কাশীপুর বাগানবাড়িতে নিয়ে গেলেন। কলকাতা থেকে মাইল তিনেক উত্তরে জায়গাটা বেশ নিরিবিলি, রামকৃষ্ণের খুবই পছন্দ হয়ে গেল।

বরানগরের এই বাগানবাড়ির মালিক ছিলেন জমিদার রানি কাত্যায়নীর জামাই গোপাললাল ঘোষ। রামকৃষ্ণের ভক্তরা মাসিক ৮০ টাকায় প্রথমে ৬ মাস, তারপর আরও ৩ মাস বাড়িটি ভাড়া নেন। বাগানবাড়ির মোট এলাকার আয়তন ছিল ১১ বিঘা ৪ কাঠা ২ ছটাক। চারদিক ছিল উঁচু পাঁচিলে ঘেরা। উত্তর-পশ্চিম কোণে আছে প্রধান ফটক। উত্তর অংশে কয়েকটা ছোটো ছোটো ঘর আছে, যেগুলো রান্নাঘর এবং ভাঁড়ার হিসেবে ব্যবহার করা হত।

তাদের সামনেই দোতলা বসতবাড়ি, যার একতলায় চারটি এবং দোতলায় আরও দুটি ঘর। ওপরের বড়ো ঘরটিতে রামকৃষ্ণ থাকতেন। এখন সেটি কাশীপুর উদ্যানবাটী মঠের প্রধান উপাসনাঘর। পাশের ঘরটি রামকৃষ্ণ স্নান এবং অন্যান্য কাজ সারতেন। বড়ো ঘরটির নিচে একতলায় যে হলঘরটি আছে, সেখানে ভক্তরা বসতেন, এখন সেটি উদ্যানবাটী মঠের দ্বিতীয় উপাসনাঘর। নিচে পুবদিকের ঘরে থাকতেন সারদাদেবী, এখন সেখানে সারদাদেবীর মন্দির। দক্ষিণের যে ঘরটিতে সেবকরা থাকতেন, সেই ঘরে এখন ছোট্ট একটি সংগ্রহশালা রয়েছে।

উদ্যানবাটীতে থাকাকালীন কলকাতার বেশ কয়েকজন স্বনামধন্য চিকিৎসক রামকৃষ্ণকে দেখতে এসেছিলেন। আর ডাক্তার মহেন্দ্রলাল তো ছিলেনই। চিকিৎসকরা রামকৃষ্ণকে কথা না বলতে কঠোর নির্দেশ দিয়েছিলেন, যদিও, সেকথা তিনি মানেননি। কথিত আছে, এই বাড়িতে নরেন্দ্রনাথ দত্ত নির্বিকল্প সমাধি লাভ করেছিলেন। এখানেই নরেন্দ্রনাথ এবং আরও কয়েকজন ভক্তকে রামকৃষ্ণ গৈরিক বস্ত্র ও সন্ন্যাস প্রদান করেন। এভাবেই রামকৃষ্ণ সংঘের বীজ বপন করেন রামকৃষ্ণ পরমহংস নিজেই। তিনি নরেন্দ্রনাথকে সন্ন্যাসী সংঘের নেতা হিসেবে বেছে নেন এবং অন্যান্য সন্নাসী শিষ্যকে দেখভালের দায়িত্ব অর্পণ করেন প্রিয় নরেনকে।

১৮৮৬ সালের ১ জানুয়ারি বিকেলে গিরিশচন্দ্র ঘোষ এবং অন্যান্য শিষ্যদের আশীর্বাদ করেন রামকৃষ্ণ। তিনি সমাধিস্থ হন, শিষ্যরাও ভাবোন্মাদ হয়ে উঠেছিলেন। ভক্তরা বলে থাকেন, রামকৃষ্ণ সেদিন পুরাণে বর্ণিত ‘কল্পতরু’-তে পরিণত হয়েছিলেন। সেই উপলক্ষ্যে রামকৃষ্ণ সংঘের সন্ন্যাসীরা এবং রামকৃষ্ণের গৃহী ভক্তরা প্রতি বছর ১ জানুয়ারি ‘কল্পতরু দিবস’ পালন করেন। নানা জায়গায় এই দিনটি উদযাপিত হলেও কাশীপুর উদ্যানবাটীর কল্পতরু উৎসব সবচেয়ে বিখ্যাত।

এই বাড়িতেই ১৮৮৬ সালের ১৬ আগস্ট প্রয়াত হন রামকৃষ্ণ পরমহংস। তাঁর মৃত্যুর পর নরেন্দ্রনাথ এবং অন্যান্য সন্ন্যাসী শিষ্যরা বরানগরের একটি পোড়ো বাড়িতে আশ্রয় নেন। গৃহী শিষ্যদের অর্থসাহায্যে সেখানেই প্রতিষ্ঠিত হয় প্রথম মঠ। ১৯৪৬ সালে কাশীপুর বাগানবাড়িতে রামকৃষ্ণ মঠের একটি শাখা গড়ে ওঠে।

 

Developed by DXDasia