ঐতিহ্য আর থিম পরস্পরবিরোধী মানেন না শাশ্বত-অভিষেকরা
এবারে উত্তর। মানে, উত্তর কলকাতা। নিজেদের পুজো নিয়ে তীব্র অধিকারবোধ উত্তর কলকাতাবাসীর। হবে না-ই বা কেন! আদি কলকাতার দুর্গাপুজোর ইতিহাস খুঁজলে আজকের ‘উত্তরের’ দিকে না তাকিয়ে উপায় আছে? সরু গলি, রক, মাঝেই হয়তো এক-চিলতে চৌকো জমি। তাতেই বাঁধা হচ্ছে মণ্ডপ। আর পুজো এগিয়ে আসতেই সেই মণ্ডপ-প্রাঙ্গনে ঠায় বসে-দাঁড়িয়ে তদারকিতে মত্ত কয়েজকন মানুষ। দুর্গাপুজোই যাঁদের জীবনে প্রধান নেশা, ভালোলাগা, ভালোবাসাও। বয়স মোটেও আর ছোট্টটি নেই যে, এই উৎসবের আনন্দে মনটা এমনিতেই নেচে উঠবে। তবু, পুজো এলে মনের পালে মন্দ-মধুর হাওয়া লাগে। চাকরি হোক বা ব্যবসা, সে’সব ভুলে লেগে পড়তেই হয় পুজোর আয়োজনে। আজ উত্তর কলকাতার তেমনই দু’জন পুজো-পাগল কর্মকর্তার কথা।
পুজো এলেই নাওয়া-খাওয়া শিকেয়
শাশ্বত বসু এবং অভিষেক ভট্টাচার্য। দুজনেই জড়িয়ে উত্তর কলকাতার দুই পুরোনো পুজোর সঙ্গে। হাতিবাগান সর্বজনীন আর টালা বারোয়ারি। একটা পুজোর বয়স চুরাশি বছর, আরেকটা পুজো প্রায় একশো ছুঁই-ছুঁই। আটানব্বই হল এইবারে। ফলে, একদিকে ঐতিহ্যের ভার আর অন্যদিকে আধুনিকতার ডাক। এই দুই দিকই সমান সামলে ‘থিম পুজোর’ চত্বরেও হইহই করে টিকে রয়েছে এই দুই ‘সাবেক’ পুজো। টিকিয়ে রেখেছেন যাঁরা, সেই শাশ্বত বসু আর অভিষেক ভট্টাচার্যর জীবনে পুজোর চাইতে বড়ো আর কিচ্ছু নেই। দুজনেরই প্রায় সারাবছর ধরে চলে পুজোর রেশ। পুজো শেষ হতে না হতেই পরেরবারের শিল্পী-নির্বাচন। তারপর স্পনসর জোগাড়। ‘থিম’কে ফুটিয়ে তুলতে তুলতে যা-যা প্রয়োজন, সব জোগাড়-যন্ত্রের দায়িত্বও অনেকটাই এঁদের ওপর। তারপর পুজো যখন প্রায় দোরগোড়ায়, তখন মণ্ডপ-প্রাঙ্গনই হয়ে ওঠে ঘরবাড়ি। নাওয়া-খাওয়া, ঘর-সংসার, দিন-রাতের হিসেব আর তখন থাকে না। এই পাগলামির ব্যাখ্যা অবশ্য পুজোপাগল ছাড়া বোঝা মুস্কিল।
হাতিবাগান সর্বজনীন
ঐতিহ্যে আছি, ‘থিমে’ও আছি
স্বাধীনতার আগে শুরু হওয়া বহু ‘সর্বজনীন’ আর ‘বারোয়ারির’ সঙ্গেই মিশে গিয়েছিল ইংরেজ-বিরোধী স্বাদেশিকতার ইতিহাস। শাশ্বত আর অভিষেক দুজনেই সেই ঐতিহ্য নিয়ে ঘোরতর সচেতন। এ-ই তো তাঁদের শিকড়। শাশ্বতবাবু বলছিলেন হাতিবাগান সর্বজনীনের সেই আশ্চর্য গল্প। ১৯৩৫ সাল থেকে শুরু হয়ে স্বাধীনতার কয়েকবছর পরেও হাতিবাগানের এই পুজোর প্রতিমার পিছনে রাখা থাকত অখণ্ড ভারতের মানচিত্র। বহু বিপ্লবী ভিড় জমাতেন পুজোয়। টালা বারোয়ারির ইতিহাসও এমনটাই। সেখানে উদ্যোক্তাদের মধ্যে ছিলেন স্বয়ং বিপ্লবী গণেশ ঘোষ। অভিষেক ভট্টাচার্য বলছিলেন, টালা বারোয়ারির আরও একটা গৌরবের ইতিহাস আছে। অভিজাত-বড়লোক-উচ্চশ্রেণির আওতা থেকে বেরিয়ে এই পুজো গ্রহণ করে নিয়েছিল অন্ত্যজ, তথাকথিত ‘নিম্নশ্রেণির’ মানুষদেরও। ‘বিল্পবীদের পুজো তো, সেখানে সবাই সমান।’— বলছিলেন অভিষেক। এই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারটুকু দুজনের কাছেই গৌরবের। এবং একইসঙ্গে চান, কলকাতার পুজোর ‘নতুন’ হয়ে ওঠারও শরিক হতে। তাই, প্রতিবছর নতুন উদ্যমে নতুন কিছু করার চেষ্টা। হাতিবাগানে ‘থিম পুজো’র সূত্রপাত ১৯৯৭তে। প্রথম বছরেই অস্কার, থুড়ি এশিয়ান পেইন্টস-এর সেরার শিরোপা। শাশ্বতবাবুরও কর্মকর্তা হিসেবে সেটাই প্রথম পুজো। তারপর নয়-নয় করে একুশ বছর ধরে এই পুজোর ভার কাঁধে করে বইছেন তিনি। চোখের সামনে কলকাতার পুজোর চরিত্র বদলেছে। নিজেই বলছেন, ‘কর্পোরেট হয়ে গেছে গোটা পুজোটাই। এখন আর চাঁদা তুলে পুজো করা সম্ভবই নয়।’ কিন্তু, এত বড়ো একটা পুজো নতুন পুজোদের ভিড়ে হারিয়ে যাক, সেটা চাননি। তাই, কোমর-বেঁধে নেমেছেন প্রতিযোগিতায়। ‘ঐতিহ্য কিন্তু আছেই। তাকে মুছে ফেলা যাবে না। যেসব শিল্পীরা আমাদের পুজোয় কাজ করতে আসেন, সবাই বলেন এই পুজোর মাটিতে নাকি একটা অন্য গন্ধ আছে।’ হাসতে হাসতে বলছিলেন শাশ্বত বসু।
টালা বারোয়ারি
অভিষেক ভট্টাচার্যর বক্তব্যও অনেকটা এমনই। ‘সাবেকি’ গড়ন ছেড়ে প্রথম বেরোনো ২০০৬-এ। তার আগে অবশ্য ২০০০ সালে বন্ধই হয়ে যাচ্ছিল এই পুজো। পুজো-বাঁচাতে নিজেদের ঘাড়ে সেই প্রথম দায়িত্ব তুলে নেওয়া অভিষেকদের। অবশ্য, থিমের প্রতিযোগিতায় নামাকে পাড়ার অনেকেই ভালোভাবে নেননি প্রথমে। অভিষেকদের তখন বোঝাতে হয়েছিল ‘সাবেকিয়ানা’ বলে স্থানু কিছু হয়ই না। ‘যে বাগবাজারের প্রতিমা আর তাঁর সাজকে আমরা সাবেক বলি, তা একশো বছরের পুরোনো। কিন্তু কলকাতার পুজো তো আরও বহু বহু বছরের প্রাচীন। সেখানে বদল ঘটেনি? তাহলে সাবেক বলতে কী বুঝব?’ –প্রশ্ন করছিলেন অভিষেক। বলছিলেন, ‘যে প্রতিমা দেখে ভক্তিতে আপনা-আপনি প্রণাম করতে সাধ হয়, সেটাই ঐতিহ্য।’ বোঝাতে পেরেছিলেন সবাইকে শেষমেশ। আর, তারপর থেকেই জনস্রোতের নতুন ঠিকানা হয়ে ওঠে টালা বারোয়ারিও।
আত্মত্যাগ না করলে পুজো হবে না
শাশ্বত বসুর ব্যবসা আর অভিষেক ভট্টাচার্যের চাকরি। পুজো এলেই অবশ্য উপার্জনের ব্যবস্থা ভালোমতোই ক্ষতিগ্রস্ত হয় দুজনেরই। একবাক্যে দুজনেই বলছেন, পুজোর দায়িত্ব নিলে আত্মত্যাগ তো করতেই হবে। সংসারে সময় দেওয়া হয়ে ওঠে না এই মাস তিনেক। শাশ্বতবাবুর তেরো বছরের মেয়েকে নিয়ে পুজোর কেনাকাটায় যাওয়াই হয় না। হয় না মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানোও। পুজো বলতে তাঁদের কাছে এই হাতিবাগানের মণ্ডপই। অভিমান নিয়েই মেনে নিয়েছে পরিবারের লোকজনও। ব্যবসারও ভালোই ক্ষতি হয় এইসময়। তাছাড়া, শাশ্বতবাবু এখন কলকাতার ‘ফোরাম ফর দুর্গোৎসবের’ জয়েন্ট সেক্রেটারি। শুধু আর হাতিবাগান নয়, কলকাতার ৩৫০টি পুজোর পরোক্ষ দায়িত্বও তাঁর কাঁধে। সারাবছর লেগে থাকে নানা উদ্যোগ। কম্বল বিতরণ, বস্ত্র বিতরণ থেকে বিনামূল্যে চক্ষুপরীক্ষা। এসব বাদ দিয়ে আর জীবনকে ভাবতেই পারেন না তিনি। কিন্তু শরীর? শাশ্বতবাবুর বয়স এখন পঞ্চাশ। পুজোর ধকল শরীর ভালোমতোই জানান দেয়। কিন্তু, এই নেশা ছাড়া যাবে না।
হাতিবাগান সর্বজনীন
আর, অভিষেক তো একাধিকবার চাকরিই খুইয়েছেন পুজোর জন্য। ‘আমাকে তাড়িয়েই দিয়েছে বলতে পারেন। বুঝেছে, পুজো এলেই একে দিয়ে আর চলবে না।’ সহাস্য মন্তব্য তাঁর। তারপরেও পুজোর দায়িত্ব ছাড়েননি। একুশ বছর বয়স থেকে টানা ষোল বছর ধরে সেক্রেটারি তিনি। বোনের বিয়ের জন্য রাখা ফিক্সড ডিপোজিটও ভাঙতে হয়েছে পুজোয় টাকার প্রয়োজন পড়েছে বলে। সেই টাকা এখনও ফেরত আসেনি। ‘কার থেকেই বা ফেরত চাইব? নিজের বাড়ি থেকে চুরি করব নাকি?’ পুজো এমনই ব্যাপার পুজোপাগলদের কাছে।
উত্তর বনাম দক্ষিণ: স্পনসরের বৈষম্য
এখন তো পুজোয় ঢালাও স্পনসর, তারপরেও নিজদের ভাঁড়ার থেকে টাকা দিতে হয়? প্রশ্ন শুনে অভিষেক ভট্টাচার্য বলছিলেন, প্রায় কোনও পুজোতেই মোট বাজেটের সবটা উঠে আসে না স্পনসরদের থেকে। তাছাড়া, উত্তর কলকাতার পুজোগুলোর ক্ষেত্রে স্পনসররা খানিক কৃপণ। তা নিয়ে ভালোমতোই ক্ষোভ আছে অভিষেকের মনে। ‘অনেক স্পনসরের মাথারা ভাবেন, কলকাতার পুজো শুরু হয় রুবি থেকে। তারপর কসবা, গড়িয়াহাট হয়ে রাসবিহারী পেরিয়ে বেহালা, নিউ আলিপুর অবধিই নাকি আসল কলকাতার পুজো। কিন্তু, কলকাতার পুজো বলতে কিন্তু আদতে উত্তর কলকাতাই।’ টাকাপ্রাপ্তির নিরিখে ভালোমতোই বৈষম্য আছে উত্তর-দক্ষিণে, মত অভিষেকের। উত্তর-দক্ষিণের পুজোর আসল ফারাকটাই ‘আর্থসামাজিক’। ওখানে বড়োলোক বেশি। টাকা বেশি। ‘টাকার অভাবেই তাই দেখা যায়, উত্তর কলকাতার পুজোগুলো অস্তিত্বের সঙ্কটে ভুগছে। এক-দু’বার ভালো পুজো করেই হঠাৎ হঠাৎ হারিয়ে যায় অনেক পুজো’—বলছিলেন অভিষেক। এই বৈষম্যের কথা স্বীকার করে নিচ্ছেন শাশ্বত বসুও। দক্ষিণের পুজোয় জাঁকজমক বেশি, স্পনসরও বেশি এই কথা মেনে নিয়েও তাঁর বক্তব্য, তাসত্ত্বেও এই নিয়ে বেশি তুলনা টানা ঠিক নয়। তাছাড়া, দক্ষিণেও অনেক পুজো তেমন স্পনসর পায় না। ‘আসলে দক্ষিণের এলাকাটাও অনেকটা বড়ো তো।’ শাশ্বতবাবু এই নিয়ে ক্ষোভ উগড়োতে চান না। কিন্তু, তারপরেও ঝুলি থেকে কিন্তু আসল কথাটা বেরিয়েই আসে—‘ওঁদের জাঁক, আমাদের আন্তরিকতা আর ঐতিহ্য। পাড়া, রক, একসঙ্গে থাকার কমিউনিটি ফিলিং দক্ষিণের পুজোয় কোথায়?’
টালা বারোয়ারি
পুরস্কার, নেশা এবং…
কীসের টান কে জানে? শাশ্বতবাবু শুধু বলছিলেন, পুজো ছাড়া ভাবতেই পারি না। গর্ব? হয়তো তাই। সনাতন দিন্দার মণ্ডপ-তৈরিতে হাতেখড়ি হাতিবাগানেই। আরও অনেক বড়ো বড়ো শিল্পীদের কাজের শুরু এই মন্ডপ-চত্বরেই। এসেছে প্রচুর পুরস্কার। সেই স্বীকৃতি সারাবছরের পরিশ্রমকে ধুইয়ে দেয়। অভিষেকও বলছিলেন, এই পুরস্কারই নতুন নতুন ভাবতে চাওয়ার অনুপ্রেরণা। ‘পুজোর সময় গোটা কলকাতাটাই যেন হয়ে ওঠে একটা চলমান প্রদর্শনী।’ কিন্তু, পুরস্কারই সব নয় মানছেন দুজনে। আরও কিছু আছে পুজোর গন্ধে। তাই তো, পুজো এলে দাড়ি কাটার সময় হয় না, চোখ ঢুকে যায়। ছেড়া গেঞ্জি পরেই কারিগরের ভাগের রোলে কামড় বসান অভিষেক। অলীক সুখ। ইতিহাস, জনস্রোতের প্রশংসার লোভ, পুরস্কার… সবটার যোগফলেও এই আনন্দের কারণ ধরা পড়বে না। কোন পাগলামোর কারণই বা আসলে ধরতে পেরেছি আমরা?