মৈত্রী সংযোগ সোসাইটি নামক একটি এনজিও’র প্রধান দায়িত্বে রয়েছেন সুমি দাস
কোচবিহার নিবাসী অরিন্দম দাস, সুমি হিসেবেই পরিচিত। দীর্ঘ পনেরো বছর ধরে প্রান্তিক লিঙ্গ এবং দলিত রূপান্তরকামী মানুষের অধিকার এবং জীবিকা নিয়ে কাজ করছেন। এই মুহূর্তে মৈত্রী সংযোগ সোসাইটি নামক একটি এনজিও’র প্রধান দায়িত্বে রয়েছেন। স্টেশনে রাত কাটানো, যৌন পেশায় যুক্ত হওয়া থেকে এনজিও তৈরি করে আজ সফল রূপান্তরকামী হওয়া, এই লড়াইয়ে বারবার জিতে গেছেন তিনি।

অরিন্দম দাস ওরফে সুমি। রূপান্তরিত হওয়ার পর অরিন্দম থেকে নিজের নাম পরিবর্তন করে সুমি হয়েছিলেন তিনি। বাস কোচবিহারের মাথাভাঙা রোডের কাছে। এলাকায় সবার কাছে তিনি 'সুমিদি' নামেই অধিক পরিচিত। এলজিবিটিকিউ+ কমিউনিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবাদী মুখ তিনি। সারা বছর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজেকে ব্যস্ত রাখেন। ইতিমধ্যেই কিছু মাস আগে আমেরিকায় গিয়েছিলেন তথাকথিতভাবে পিছিয়ে পড়া কিছু মানুষদের কথা বলতে। যৌনপল্লীর বাচ্চাদের বিনামূল্যে পড়াশোনার দায়ত্বিও নিয়েছিলেন নিজের কাঁধে।

একটা অদৃশ্য মারণ জীবাণু এই দুই মাসে আমাদের জীবন আমূল পাল্টে দিয়েছে। লক্ষাধিক দরিদ্র মানুষ কাজের অভাবে, খাবারের অভাবে মারা যাচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন অসংখ্য বৃহন্নলা। এবার সুমি দাঁড়িয়েছেন তাঁদের পাশে। কোচবিহার এবং তৎসংলগ্ন এলাকার বৃহন্নলাদের বাড়িতে কমিউনিটি কিচেনের মাধ্যমে খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন সুমি এবং তাঁর প্রায় ৩০ জনের মতো টিম। লকডাউনের প্রথম পর্যায় থেকেই এই কাজ করছেন তিনি। বঙ্গদর্শনকে সুমি জানিয়েছেন, "এই সময় কিন্নরদের ডিপ্রেশন হওয়া স্বাভাবিক। তারা সারাবছর মেলায় বা বিয়েবাড়িতে বা লটারিতে নাচ করে, ট্রেনের যাত্রীদের আশীর্বাদ করে অর্থ উপার্জন করে। এখন সব বন্ধ। তাদের দিশেহারা পরিস্থিতি। এখন যেমন সামাজিক দূরত্ব অবলম্বন করা খুব জরুরি, তেমনই মানসিকভাবে পাশে থাকাটাও জরুরি। আমরা সেই চেষ্টাই করছি। কেউ যেন নিজেদের একা না ভাবে। লকডাউন উঠে গেলেও সবকিছু স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত আরও ছয় মাস চলবে আমাদের এই কমিউনিটি কিচেন।"
মূলত কোচবিহার এবং আলিপুরদুয়ার এই দুই জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে কমিউনিটি কিচেন। কলকাতার বহু তৃতীয়লিঙ্গের মানুষ রয়েছেন, যাঁরা কমিউনিটির বেশ উচ্চস্তরে রয়েছেন। কেউই স্ব স্ব উদ্যোগে এগিয়ে আসেননি। তৃতীয়লিঙ্গের মানুষদের জন্য এমন উদ্যোগ এই প্রথম। কোচবিহার দিনহাটার চিকিৎসক উজ্জ্বল আচার্য এই উদ্যোগে সামিল হয়েছেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ, যাঁদের অধিকাংশেরই এই লকডাউনে উপার্জন বন্ধ হয়ে গেছে। তাঁদের পাশে দাঁড়াতেই সুমির এই উদ্যোগকে কুর্নিশ জানাচ্ছে সমাজের বৃহত্তর অংশ। যে সময়ে একাধিক মানুষ অর্থাভাবে খাদ্যাভাবে মারা যাচ্ছেন, করোনার চেয়েও যাঁদের জীবনের বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে লকডাউন, তাঁদের কথা ভেবেই সুমি দাসের এহেন কর্মকাণ্ড। সুমিরা এভাবেই বেঁচে থাকেন যুগের পর যুগ।


ছবি সৌজন্যে— সুমি দাস