অগ্নিবর্ণ ভাদুড়ী : দেশভাগের ক্ষত থেকে জন্ম নেওয়া এক পুতুল-সংগ্রাহক

তাঁর সংগ্রহে আছে লখনৌ’র ক্ষুদ্রাকৃতি পাখি পুতুল যা আজ দ্বিতীয় কোথাও নেই

মবেশি আমাদের প্রত্যেকর বাড়িতেই অথবা মনে, ছোটোখাটো সংগ্রহশালা রয়েছে। সংগ্রহের যেমন ঐতিহাসিক মূল্য আছে, তেমনই আমাদের অতীত ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দেয় বিভিন্ন সংগ্রহ। একবাক্যে বলতে গেলে, সংগ্রহ হল অতীতকে ব্যাখ্যা করে, তাকে বাঁচিয়ে তোলার আন্তরিক প্রয়াস। সংগ্রহ মানে শুধুই বড়ো বড়ো কাঁচের শোকেস-এ সাজানো গোছানো ফসিলস—মেমোরিয়া নয়, সংগ্রহ হল মানুষের ভাবনা, ঐতিহ্য ও ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার অক্সিজেন। আর এই অক্সিজেনের যোগান দেন অগ্নিবর্ণ ভাদুড়ীর (Agnibarna Bhaduri) মতো সংগ্রাহকরা। অধ্যাপক অগ্নিবর্ণ ভাদুড়ীর আগ্রহ আর গবেষণা শিল্প সাহিত্যের নানাবিধ বিষয়ে।

অগ্নিবর্ণবাবুর আক্ষেপ বেশ কিছু পুতুল হারিয়ে গেছে, যেমন- ইলামবাজারের গালার পুতুল, টাঙ্গাইলের বেশ কিছু হাতে টেপা পুতুল, ঘাড় নাড়া পুতুল। অগ্নিবর্ণবাবুর মাধ্যমে তাঁর পরিবারেও সঞ্চারিত হয়েছে এহেন আগ্রহ।

শুধু দেশ-বিদেশের পুতুল নয় ডাকটিকিট, পুরোনো আমলের মুদ্রা, বাংলার বিভিন্ন জেলায় গ্রামে গ্রামে ঘুরে নকশিকাঁথা, পুরোনো বিরল বইপত্র সংগ্রহও তাঁর নেশা। তাঁর বাবা ছিলেন ডাক্তার। পূর্ব বাংলার যশোর ও কুমারখালি অঞ্চলে তাঁর নামযশ ছিল। তাঁর বাবার কাছে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির চিঠিপত্তর আসতো, সেইসব চিঠির সঙ্গে প্রচুর ডাকটিকিটও পাওয়া যেত। সেগুলোই জমাতে শুরু করেছিলেন অগ্নিবর্ণবাবু ও তাঁর মেজদা। সেসব আজও তাঁর কাছে সযত্নে সংরক্ষিত আছে। কলকাতায় জন্ম হলেও তাঁর ছোটোবেলা কেটেছে নদিয়ায় কুমারখালিতে। বাংলা ভাগ হয়ে যাওয়ার পর যে গ্রামটি এখন কুষ্টিয়া জেলার অন্তর্গত বাংলাদেশে। ছোটোবেলায় এই কুমারখালির রথের মেলায় নৌকা বোঝাই করে প্রচুর পুতুল আসতো, বোনের সঙ্গে নিয়মিত যেতেন সেইসব পুতুল কিনতে। শুরুটা হয়েছিল এভাবেই। অগ্নিবর্ণবাবুর কথায়, দেশভাগের ক্ষত তাঁর ভিতরে এখনও থেকে গেছে। নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে চলে আসার সেই ক্ষত থেকেই, সংগ্রহ করে যাওয়ার তীব্র ইচ্ছের জন্ম। ফেলে আসা ছোটোবেলার পুতুলগুলি আর ফিরে না পেয়ে, যেটুকু পেরেছেন আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করে গেছেন। 

ডাকটিকিট সংগ্রহ

অপ্রচলিত মুদ্রা

তুফানগঞ্জ মহাবিদ্যালয় আর বঙ্গবাসী কলেজে বাংলার অধ্যাপক ছিলেন। এই সময় প্রচুর গবেষণার সুযোগ পেয়েছেন। তারই ফলপ্রসূ ‘এ কালের শিল্পচিন্তা’, ‘কার্তিক পুরান ও বাঙালি লোকবিশ্বাসে’, ‘পুতুলের সাত সতেরো’, ‘নন্দলাল বসু’ – বেশ কিছু বই লিখেছেন, যা সমালোচক বা আগামী প্রজন্মের গবেষণার কাজে লাগবে। গন্ধেশ্বরী ঘাটের কাছে একটি টেরাকোটা মন্দির ছিল একসময়, যা মন্দির সংলগ্ন একটি বটগাছ কাটার সঙ্গে সঙ্গে ধসে গেছিল। সেই মন্দিরের বেশ কিছু টেরাকোটা নিদর্শনও আছে আগ্নিবর্ণবাবুর সংগ্রহে। ভাঙাচোরা প্রত্ন-ভাস্কর্য, পট থেকে পাটা, কাঠ খোদাই ছবিযুক্ত বই, চাকা লাগানো পুতুল, প্রাচীন দীপলক্ষ্মী, হাতে টেপা পুতুল, মহিলা পটুয়াদের হাতে গড়া সাবেকি ষষ্টি পুতুল, মাটির গড়নে তালপাতার পাখা বিশিষ্ট মজিলপুরের পাখি-পুতুল, হাওড়ার দেউলপুরের শালতি-নৌকা বা বাংলাদেশের টাঙ্গাইলের ছড়ি-নৌকার আদলে চাকা লাগানো মাটির খেলনা নৌকা – একসময় যে পুতুল ২ পয়সা বা ২০ টাকায় কিনেছিলেন, আজ তা বহুমূল্যবান, গবেষণার বিষয়।

শুরুতে কোনও জায়গার পুতুল যেভাবে বানানো হত, অনেকক্ষেত্রেই সময় ও শিল্পীর ধারাবাহিক পরিবর্তনে সেসবের আদলেও বদল এসছে। এই ক্রমবিবর্তন অনুযায়ী অগ্নিবর্ণবাবু সংগ্রহ করেছেন একই পুতুলের পরিবর্তিত বিভিন্ন রূপ। আবার, অঞ্চল ভেদে একই পুতুলের রয়েছে বিভিন্ন নাম, বৈশিষ্ট্য। প্রত্যেকটি নামই তাঁর ঠোঁটস্থ, এখনও মনে করে বর্ণনা করতে পারেন প্রতিটি বৈশিষ্ট্য। তাঁর সংগ্রহে আছে লখনৌ’র ক্ষুদ্রাকৃতি পাখি পুতুল, যা আজ দ্বিতীয় কোথাও নেই। একেই বোধহয় বলে গবেষণা, সংরক্ষণের প্রতি প্রেম!

 

অগ্নিবর্ণবাবুর আক্ষেপ বেশ কিছু পুতুল হারিয়ে গেছে, যেমন- ইলামবাজারের গালার পুতুল, টাঙ্গাইলের বেশ কিছু হাতে টেপা পুতুল, ঘাড় নাড়া পুতুল। অগ্নিবর্ণবাবুর মাধ্যমে তাঁর পরিবারেও সঞ্চারিত হয়েছে এহেন আগ্রহ। তাঁর পুত্র অশনি ভাদুড়ীও একজন সংগ্রাহক, অধ্যাপনা করেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনিও দেশ-বিদেশ থেকে রাজস্থানের পেঁচার মতো বহুমূল্যবান ও বিরল পুতুল সহ নানা জিনিস সংগ্রহ করে থাকেন। অগ্নিবর্ণবাবুর ভাইপো অনলাংশু ভাদুড়ীও বিভিন্ন কিছু সংগ্রহ করে দিয়েছেন তাঁকে। তাঁর স্ত্রী মধুমাধবী ভাদুড়ী, একজন সংগীতশিল্পী এবং যথার্থ শিল্প-রসিক। প্রকৃত সহধর্মিনীর মতোই অগ্নিবর্ণবাবুর যেকোনও কাজে পাশে থেকে, তাঁকে উদ্বুদ্ধ করে, তাঁর যাবতীয় সংগ্রহকে সন্তানস্নেহে আগলে রেখেছেন দাম্পত্যজীবনের শুরু থেকেই। তিনি বলছিলেন, “আমার শাশুড়িমা একদিন ওঁর ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তুই যেসব জিনিসগুলো ঘরে এনে রেখেছিস, বৌমাকে দেখা। প্রথমে একটু অবাকই হয়েছিলাম, বুঝতে পারিনি। তারপর একদিন ওঁর সংগ্রহ থেকে টেরাকোটার কারুকার্য, বিরল বইপত্র, বিভিন্ন পুতুল, ভাস্কর্য ইত্যাদি দেখতে দেখতে বেলা গড়িয়ে গেল। তখনই ভেবে নিয়েছিলাম, উনি যদি আমায় সাহায্য করেন, আমি ওঁর যাবতীয় সংগ্রহ সংরক্ষণ করবো। কাঁচরাপাড়ায় আমাদের বিরাট বাড়ি ছিল, ভেবেছিলাম সেই বাড়ির দোতালাটা মিউজিয়াম করবো। পরবর্তীতে সংগ্রহ বাড়তে থাকলো কিন্তু সেই মিউজিয়াম আর হয়ে উঠলো না। পাঁচটা বাড়ি পাল্টে শেষে আমরা যে বাড়িটায় উঠলাম সেখানে একটু জায়গা পাওয়া গেল। এখন বাড়িতে দু’আলমারি ভর্তি পুতুল। মূলত পুতুল সংগ্রহের দিকেই ওনার ঝোঁক ছিল, তারপর আমার ছেলেও সংগ্রহ করতে শুরু করলো। সারা ভারতবর্ষ বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের মোটামুটি সব জেলার পুতুলই আমাদের সংগ্রহে রয়েছে। এভাবে বাড়িতেই ছোটোখাটো একটা সংগ্রহশালা গড়ে উঠেছে।”

কথা বলতে গিয়ে আজকাল মাঝেমধ্যেই অন্যমনস্ক হয়ে পড়েন বছর ৮৩-র সংগ্রাহক। এই অমূল্য সংগ্রহের ভবিষ্যৎ কী, নতুন প্রজন্মই বা কীভাবে দেখছে বিষয়টা? বঙ্গদর্শন.কম-কে অগ্নিবর্ণবাবু জানান, “গত বছর মে মাসে গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশনে একটা প্রদর্শনী হয়েছিল। সেখানে প্রায় ৭০-৮০জন পুতুল-সংগ্রাহক অংশ নিয়েছিলেন। প্রচুর মানুষের সাড়া পাওয়া গিয়েছিল। অনেক উৎসাহী ব্যক্তি পুতুল সম্বন্ধে খোঁজ নিতে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ইদানিং ইউটিউব ইত্যাদির জন্য পুতুল সংগ্রহ বা সংগ্রাহকদের নিয়ে সচেতনতা, একটা ভাবনার পরিসর তৈরি হয়েছে। পড়ুয়া, গবেষকরা নিয়মিত খোঁজখবর করছেন। আগামীর জন্য এটা একটা ভালো দিক। আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব আপাতত আমার ছেলে ও স্ত্রীয়ের উপরেই।”​ 

অস্ট্রেলিয়া, মিশরের পুতুল

অগ্নিবর্ণবাবুর এই সংগ্রহ এবং গবেষণার বিষয়কে কেন্দ্র করে একটি ২৮ মিনিটের তথ্যচিত্র ‘এক পাগলের গল্প’ নির্মাণ করেছেন অরিন্দম সাহা সরদার। নিবেদন জীবনস্মৃতি আর্কাইভ (Jibansmriti Archive)। তথ্যচিত্রে অগ্নিবর্ণ ভাদুড়ী’র পাশাপাশি এই সংগ্রহ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রেখেছেন ভারতীয় যাদুঘরের প্রাক্তন অধিকর্তা অনুপকুমার মতিলাল এবং মধুমাধবী ভাদুড়ী। ৮ জুলাই ছবিটি জীবনস্মৃতি আর্কাইভের ইউটিউব চ্যানেলে মুক্তি পেয়েছে। রইল তার লিংকঃ https://www.youtube.com/watch?v=_hcgKVrTtsI&t=185s&ab_channel=JIBANSMRITIARCHIVE
 

_______________

বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানাই অরিন্দম সাহা সরদারকে।

ছবি-ঋণ: জীবনস্মৃতি আর্কাইভ

Developed by DXDasia