চুঁচুড়াতেও রয়েছে বিখ্যাত এক গোরস্থান, পাহারা দেন ওলন্দাজ-ইংরেজরা

ওলন্দাজদের পাশাপাশি ইংরেজদেরও কবর রয়েছে এখানে

“হাঁসের প্রিয় গুগলি/ পর্তুগিজদের হুগলী,
গুনের প্রিয় তানপুরা/ ওলন্দাজদের চিনসুরা।” –

কবি অন্নদাশঙ্কর রায়ের কবিতায় সাক্ষাৎ নিদর্শন মেলে ইতিহাসের। এককালে এ শহরেই প্রায় ২০০ বছরের আস্তানা ছিল ডাচ অর্থাৎ ওলন্দাজদের। শহরের ঠিক মাঝখানে আজও নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে রয়েছেন সে সময়ের শাসকেরা। পার্কস্ট্রিটের মতো এ শহরেও রয়েছে বিখ্যাত এক গোরস্থান। নাম ওলন্দাজদের গোরস্থান (Dutch Cemetery)। যদিও সুরাটের ওলন্দাজ কবরখানা ভ্রমণপিপাসু আর ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে যতটা বিখ্যাত হয়েছে, সেই তুলনায় চুঁচুড়ার ওলন্দাজ সমাধিক্ষেত্র অনেকটাই অবহেলিত।

হাওড়া (Howrah) থেকে লোকাল ট্রেনে ঘন্টা খানেকের পথ। হুগলি নদীর (Hooghly River) তীরে অবস্থিত প্রাচীন শহর চুঁচুড়া। ভিসা, পাসপোর্টের জটিল ঝামেলা ছাড়াই এ যেন খাঁটি বিদেশি ইতিহাসের ডেরা। চুঁচুড়া শহরের আনাচে কানাচে আজও ছড়িয়ে রয়েছে ঔপনিবেশিক যুগের ঐতিহ্য এবং স্থাপত্য। সপ্তদশ শতকের গোড়ার দিকে ওলন্দাজ ঘাঁটি তৈরি হয় চুঁচুড়ায় (Chinsurah)। সেসময় ডাচ বণিকরা মূলত আফিম, নুন, মসলিন আর মশলার ব্যবসা করতেন এখানে।

ব্রিটিশদের হাতে ক্ষমতা চলে যাওয়ার আগে ১৬১৫ থেকে ১৮২৫ সাল পর্যন্ত চুঁচুড়া ছিল ডাচদের উপনিবেশ। এর মধ্যেই কোনো একটা সময়ে গড়ে উঠেছিল এই কবরখানাটি। তৎকালীন গভর্নর তিল্লেফার্ট এটির স্থাপন করেন। মোটামুটি পঁয়তাল্লিশটা কবর এখনও দেখতে পাওয়া যায় এখানে। ১৮-১৯ শতকে চুঁচুড়ার ওলন্দাজ প্রশাসক থেকে শুরু করে তখনকার দিনের বেশ কয়েকজন নামজাদা মানুষকে গোর দেওয়া হয়েছে এখানে। কবরগুলোর মধ্যে কিছু সমাধিস্তম্ভ যথেষ্ঠ বড়োসড়ো, তার সাথে মসোলিয়াম, ওবেলিস্ক বসানো কবরও আছে, এর পাশাপাশি একেবারে সাধারণ মানের ছোটো সমাধিফলক বসানো কবরও দেখতে পাওয়া যায়।

চুঁচুড়ার ফুলপুকুর রোড এবং জ্যোতিষচন্দ্র ঘোষ সরণির সংযোগস্থলেই অবস্থান করছে এই প্রাচীন গোরস্থানটি। গুস্তাভাস দুর্গের কাছে প্রায় ৭৪০০ বর্গ-কিলোমিটার এলাকা জুড়ে এর বিস্তার।

উল্লেখযোগ্য, সমাধিগুলির মধ্যে একটি হল লুকাস জুলিয়েন জুদান্দের। লুকাস ছিলেন তৎকালীন ফরাসি নৌবাহিনীর সেনাপতি। রয়েছে ভারতের নারীশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ প্রচারক রবার্ট মে-এর সমাধি। এছাড়াও বাংলায় ডাচ-ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রথম তৈরি হওয়া কারখানার পরিচালক পিটার স্টারথিমাস, শেষ ওলন্দাজ গভর্নর ড্যানিয়েল ওভারবিক, ডাচ কোম্পানির বিশিষ্ট কর্মকর্তা জান আলবার্ট সিচটেরমান প্রমুখদের কবরও দেখা যায় এখানে।

চুঁচুড়ার ওলন্দাজ গোরস্থানে পাওয়া সবচেয়ে পুরোনো কবরটি হল কর্নেলিস ডে জং-এর, যিনি মারা গিয়েছিলেন ১৭৪৩ সালে। আর সময়ের দিক থেকে এখানকার সবচেয়ে নবীন যে কবরটি পাওয়া গেছে সেটা এমা ড্রাপার-এর। মৃত্যু ১৮৪৭ সালে। প্রাচীন এই কবরখানার নামে কেবল ওলন্দাজদের উল্লেখ থাকলেও ডাচদের পাশাপাশি ইংরেজদের কবরও আছে এখানে।

বর্তমানে চুঁচুড়া শহরের এই গোরস্থানটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার (Archiological Survey Of India)। সময়ের সঙ্গে ধস নেমেছে প্রাচীনত্বে। বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়ে কবরখানার বেশ কয়েকটা ইটের কাঠামো যথেষ্ঠ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়াও বেশ কিছু জায়গা সংস্কারের অভাবে আগাছায় ছেয়ে গিয়েছে।

যদিও দীর্ঘদিন জীর্ণ দশায় থাকার পর অবশেষে সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে। গোরস্থানের একদিকের গেটে তালা ঝোলানো থাকলেও অন্যদিকের গেট খোলা জনসাধারণের জন্য। ওলন্দাজ সমাধিক্ষেত্রের মধ্যে কবরগুলি ঘিরে হাঁটার জন্য রয়েছে আঁকা বাঁকা সরু পথ। কাছ থেকে খতিয়ে দেখতে হলে অবশ্য ঘাসে নেমে হাঁটতে হতে পারে দর্শনার্থীদের। ভিতরে এখনও চলছে সংস্কারের কাজ। সংস্কারকর্মীদের কথাতেই জানা গেল, প্রতিদিন সকাল আটটা থেকে বিকেল পাঁচটা অবধি খোলা থাকে গোরস্থানের গেট।

চুঁচুড়ার ফুলপুকুর রোড এবং জ্যোতিষচন্দ্র ঘোষ সরণির সংযোগস্থলেই অবস্থান করছে এই প্রাচীন গোরস্থানটি। গুস্তাভাস দুর্গের কাছে প্রায় ৭৪০০ বর্গ-কিলোমিটার এলাকা জুড়ে এর বিস্তার। চুঁচুড়ায় গেলে এই গোরস্থান ছাড়াও মিলবে ওলন্দাজদের বেশ কিছু শিল্পের নিদর্শন। চুঁচুড়ার ডাচ গির্জা, সুসান্না আন্না মারিয়ার সমাধি, বর্ধমানের ডিভিশন কমিশনারের বাংলো ইত্যাদি। কলকাতা থেকে একদিনের ভ্রমণে চুঁচুড়া শহর তাই আপনাকে দিতে পারে ইতিহাস ঘেঁটে দেখার মিস্টিক অনুভূতি।

তথ্যসূত্র – 
১. প্রতিলিপি.কম
২. আনন্দবাজার
৩. নিউজ১৮

ছবি সৌজন্যে – প্রতিবেদক

Developed by DXDasia