
প্রতি আধঘণ্টা অন্তর ঢং ঢং শব্দে সময় মিলিয়ে দেয় ঘড়িটি
অটো থেকে নেমেই কানে এলো ঘড়ির ঢং ঢং শব্দটা। অবশ্য শব্দটা নতুন কিছু নয়, প্রতি আধ ঘণ্টা অন্তর নিয়ম করে চুঁচুড়াবাসী এই একই শব্দ শুনতে অভ্যস্ত। অভ্যাস চলে আসছে সেই ১৯১৪ সাল থেকে।
ইতিহাসের শহর চুঁচুড়া (Chinsura) নিয়ে কবি অন্নদাশঙ্কর রায় এক সময় ছড়ায় লিখেছিলেন,
“হাঁসের প্রিয় গুগলি
পর্তুগিজদের হুগলি
গুণের প্রিয় তানপুরা
ওলন্দাজদের চিনসুরা।”
গঙ্গাপাড়ের এই শহরের আনাচে কানাচে ইতিহাস ছড়িয়ে রয়েছে। পর্তুগিজ, ওলন্দাজদের সময়কার নানা ইতিহাস যেমন এখানে রয়েছে, তেমনি রয়েছে ব্রিটিশ শাসনকালের নানা স্মারক। রয়েছে রাজা জমিদারদের রোম খাড়া করা নানান সব কাহিনিও।
১৯৭৩ সালে ঘড়ির মোড়ের স্তম্ভঘড়িটির উত্তর প্রান্তে স্বাধীনতা সংগ্রামী ভূপতি মজুমদারের (১৮৯০ – ১৯৭৩) আবক্ষ মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়।
সময় এগিয়েছে, গঙ্গা নদীতেও এসেছে অনেক জোয়ার ভাঁটা। কিন্তু স্রোতের টানে স্মৃতি ভেসে যায়নি। চুঁচুড়ার দীর্ঘ ইতিহাসের সবচেয়ে বড়ো সাক্ষী হয়ে থেকে গেছে শহরের প্রাণকেন্দ্র ঘড়ির মোড়ের ‘ঘড়ি’। ১০৮ বছর ধরে টিকে থাকা এই ঘড়িটি আজও জানান দেয় সঠিক সময়। জানান দেয় বাকি সমস্ত কিছু অতীত হয়ে গেলেও সে আজও বর্তমান, প্রতিনিয়ত সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলেছে।
মোবাইল ঘড়ি কিংবা ডিজিটাল হাত ঘড়ির যুগেও জৌলুস হারায়নি সেই ঘড়ি। ছোটোবেলার ছড়ার মতো এই ঘড়ি অবশ্য টিক টিক নয়, ঢং ঢং শব্দে জানান দিয়ে চলেছে তার অস্তিত্ব। শতবর্ষ পার করেও তার বিরাম নেই। সময় মেনে পথ চলা মানুষের কাছে এখনও বড়ো ভরসা এই ঘড়ি।

১৯০১ থেকে ১৯১০ সাল পর্যন্ত ছিল বড়লাট সপ্তম এডওয়ার্ড-এর শাসনকাল। তাঁরই স্মৃতিতে ১৯১৪ সালে সুসজ্জিত স্তম্ভঘড়িটি চুঁচুড়ার চার্চের সামনের চার মাথার মোড়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়। স্তম্ভঘড়িটির চারদিকে রয়েছে চারটি ঘড়ি এবং উপরে রয়েছে একটি ধাতব ঘণ্টা। এছাড়া স্তম্ভটির গায়ে একটু নিচে উত্তর মুখে রয়েছে রাজা সপ্তম এডওয়ার্ডের অবয়বের একটি ধাতব পার্শ্বমূর্তি এবং বাকি তিন দিকে রয়েছে তিনটি কারুকার্যখচিত স্মৃতিফলক। ঘড়ির মূল যন্ত্রাংশ পিতল ও ইস্পাতের। প্রতি আধঘণ্টা অন্তর তার ঢং ঢং আওয়াজ শুনে আজও সময় (Time) মিলিয়ে নেন না এমন মানুষ মেলা ভার।
সেকালে অবশ্য এই অঞ্চলের নাম ছিল টাউন গার্ড রোড ঝাউতলা। ঐতিহাসিক ঘড়ির সঙ্গে সময় কাটাতে কাটাতে এক সময় মানুষের ভালোবাসায় এলাকার নামই বদলে, হয়ে যায় ঘড়ির মোড় (Ghorir More)। এখন যেখানে এই ঘড়িকে ঘিরে বাস, মিনিবাস, অটো, টোটো, রিকশা চলাচল করে তখন সেখানে এই রাস্তায় চলত ফিটন।

১৯৭৩ সালে ঘড়ির মোড়ের স্তম্ভঘড়িটির উত্তর প্রান্তে স্বাধীনতা সংগ্রামী ভূপতি মজুমদারের (১৮৯০ – ১৯৭৩) আবক্ষ মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়। যার উদ্বোধন করেন পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শ্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়।

রাস্তার ঠিক মাঝ বরাবর ১৬ স্কোয়ার ফুট জায়গা নিয়ে রয়েছে ঘড়ির স্তম্ভ। উচ্চতায় ৩০ ফুট এই ঘড়িটি যেন শহরের ঠিক মাঝখান থেকে প্রতিনিয়ত নজর রাখছে চারপাশের সবকিছুকে। শতাব্দী পেরিয়েও একই ছন্দে সময় জানান দিচ্ছে সে। কোনো ক্লান্তি নেই, নেই কোনো বিশ্রাম নেওয়ার তাগিদ। এতো বছরে মাত্র একবারই দিন পনেরোর জন্য থেমে গিয়েছিল ঐতিহাসিক ঘড়ির কাঁটা। ২০০৯ সালে আয়লার সময়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে টাল সামলাতে পারেনি সেবার। থেমেছিল ঠিকই তবে সেটা সাময়িক, রোগ সারতে যেটুকু সময় লাগে আরকি!
আজও পুরসভার তত্ত্বাবধানে প্রতি চার বছর অন্তর ঘড়ির সার্বিক মেরামতি হয়। মেরামতির আনুমানিক খরচ পড়ে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা।

ব্রিটিশ রাজত্বে ঘড়ি মেরামতির দায়িত্ব পালন করত ‘কুক অ্যান্ড কেলভি’ সংস্থা। ক্রমে দেশ স্বাধীন হল। মেরামতির দায়িত্ব পেল কলকাতার বিবি দত্ত কোম্পানি। ১৯৫৪ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত ঘড়ির স্বাস্থ্য রক্ষার ভার ছিল তাঁদের হাতে। পরবর্তীতে চুঁচুড়ার এম এস হোসেন অ্যান্ড কোম্পানি পায় ঘড়ির দেখভালের দায়িত্ব। এখনও পর্যন্ত তাঁরাই ঘড়ির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে। আজও পুরসভার তত্ত্বাবধানে প্রতি চার বছর অন্তর ঘড়ির সার্বিক মেরামতি হয়। মেরামতির আনুমানিক খরচ পড়ে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। শোনা যায় আগে প্রতি চারদিন অন্তর দম দিতে হতো এই ঘড়িতে, কিন্তু এখন আর সেই প্রয়োজন পড়েনা। বর্তমানে যুগে ব্যাটারি চালিত ঘড়িতে আর দম দেওয়ার সেই খাটনিও নেই।
সকালের ঘুম ভাঙার অ্যালার্ম থেকে শুরু করে পথ চলতি ব্যস্ততা সব কিছুতেই ঘড়ির বিকল্প কিছুই নেই। শহরের আনাচে কানাচে আজ অনেক ঘড়ি। গির্জার মুখে ঘড়ি, ডাকঘরে ঘড়ি, বাজারের মাঝখানে ঘড়ি, রাস্তার মোড়ে ঘড়ি, স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ঘড়ি। এছাড়াও আমাদের কব্জিতে ঘড়ি, আবার পকেটের মোবাইলেও ঘড়ি। আর এইসব কিছুই জানান দেয় সময়ের প্রয়োজনীয়তা। তাকেই প্রতি আধ ঘন্টায় সশব্দে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে ঐতিহাসিক প্রাচীন ঘড়িটি। একশো আট বছর পরেও ঐতিহ্যে অমলিন হয়ে ছুঁয়ে রয়েছে প্রাচীন ইতিহাসের চৌকাঠ।
তথ্যসূত্র –
- “চুঁচুড়ার অন্যতম ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী প্রাণকেন্দ্র ঘড়ির মোড়”, হুগলি হেরিটেজ
- “১০৬ বছরে মাত্র একবারই থেমেছিল এই ঘড়ির কাঁটা”, ডেইলিহান্ট
ছবি – প্রতিবেদক
