শতবর্ষে শ্রদ্ধা : ‘সাধারণ মানুষের পরিচালক’ তপন সিংহ

তপন সিংহের শতবর্ষ ঘিরে KIFF-এর আলোচনা ‘আপনজন’

ত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল ত্রয়ীকে বাঙালি যে আসনে বসিয়েছেন, সেখানে তপন সিংহ-কেও বসানো হলো না কেন? জীবিত থাকাকালীন তাঁকে নিয়ে গবেষণা-লেখালিখি-প্রচার সেভাবে হয়নি কেন? সাংবাদিক-সমালোচকদের কাছে কি তিনি কুলীনত্ব হারিয়েছিলেন? শতবর্ষ উপলক্ষে তাঁকে নিয়ে এত আয়োজন, শ্রদ্ধাভক্তি, এটা কি এক ধরনের ‘হিস্টোরিক্যাল কারেকশন’?

তপন সিংহ দেখিয়েছেন একজন সচেতন-শিক্ষিত ব্যক্তি দায়িত্ব নিয়ে সমাজের পিছিয়ে পড়া, নিরন্ন, অভাবী মানুষের কথা ভাবছেন। ‘আরোহী’, ‘হাটে-বাজারে’, ‘এক যে ছিল দেশ’, ‘এক ডক্টর কি মউত’, ‘হুইল চেয়ার’ ছবিগুলোর কথা বলা যেতে পারে এক্ষেত্রে।

রবীন্দ্র সদনের মঞ্চে দাঁড়িয়ে ঠিক এই প্রশ্নগুলোই বক্তাদের উদ্দেশ্যে ছুড়ে দিচ্ছিচ্ছেন প্রখ্যাত সাংবাদিক গৌতম ভট্টাচার্য। ১১ ডিসেম্বর, ৩০তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের শেষদিন কিংবদন্তি পরিচালক তপন সিংহ-কে ঘিরে আয়োজিত হয়েছিল ‘আপনজন’ শীর্ষক আলোচনা। সূত্রধরের ভূমিকায় ছিলেন গৌতমবাবু। বক্তা হিসেবে আমন্ত্রিত ছিলেন বিশিষ্ট তথ্যচিত্র-পরিচালক রাজা সেন (যিনি তপন সিংহ-র জীবদ্দশাতে ও শতবর্ষের প্রাক্কালে তাঁকে নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন), বিশিষ্ট সাংবাদিক-লেখক শংকরলাল ভট্টাচার্য, তপন সিংহ-র দীর্ঘদিনের সহকারী তথা বিশিষ্ট পরিচালক-অধ্যাপক অশোক বিশ্বনাথন, বিশিষ্ট সাংবাদিক-লেখক শিলাদিত্য সেন এবং লেখক অমিতাভ নাগ।

ঊনবিংশ শতক, যে সময়টাকে আমরা নবজাগরণ বা রেনেসাঁ বলি, বিতর্কিত এই সময়ে একটা বিষয় উঠে এসেছিল যে শিক্ষার প্রসার দরকার। শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। তপন সিংহ শিক্ষা, শিক্ষিত ব্যক্তি ও সমাজকেই তাঁর ছবিতে বারবার তুলে ধরতে চেয়েছেন। দেখিয়েছেন একজন সচেতন-শিক্ষিত ব্যক্তি দায়িত্ব নিয়ে সমাজের পিছিয়ে পড়া, নিরন্ন, অভাবী মানুষের কথা ভাবছেন। তপন-পরিচালিত ‘আরোহী’, ‘হাটে-বাজারে’, ‘এক যে ছিল দেশ’, ‘এক ডক্টর কি মউত’, ‘হুইল চেয়ার’ ছবিগুলোর কথা বলা যেতে পারে এক্ষেত্রে। নিজেও ছিলেন একজন প্রকৃত শিক্ষিত। জীবনে বহুবার তাঁকে সিনেমা সংক্রান্ত সমস্যা, সংকটের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। একক লড়াইয়ে বিশ্বাস করতেন, তাঁর ছবির চরিত্ররাও তাই। “সেই সময় তাঁকে কোণঠাসা করা বা প্রচারের আলোয় আনা হত না বোধহয় এই ‘একা বুঝে নেওয়ার’ প্রবণতার কারণেই। তাই একটা অপ্রাপ্তি ছিল, ব্রাত্য করে রাখা হয়েছিল। যদিও তপনবাবু এসবে কখনও পাত্তা দেননি। নিজস্ব আদর্শে চলতেন। গৌতম ভট্টাচার্যের প্রশ্নের উত্তরে এমনটাই বলছিলেন শিলাদিত্য সেন।

রাজা সেনের বক্তব্যেও শোনা গেল একই সুর। তিনি জানাচ্ছিলেন, তপন সিংহ-র মতো নির্মোহ, স্বল্পভাষী, সৎ, মানবতাপ্রেমী পরিচালক বাংলার সম্পদ, তবু, তাঁকে মর্যাদা দেওয়া হয়নি যতটা তাঁর প্রাপ্য ছিল। “তপনদা অসংখ্য জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন, অথচ তাঁকে নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে দেখেছি সেই পুরস্কারগুলো খুঁজে পাওয়া যায়নি। কোথায় যে রেখেছেন, মনে করতে পারেননি। মানে, কোথাও সাজানো ছিল না। তাঁর কথায়, আমার আসল পুরস্কার সাধারণ মানুষের ‘অ্যাকসেপ্টেন্স’। নিজেকে গুরত্ব না দিয়ে আজীবন ‘মানুষের পরিচালক’ হয়েই থাকতে চেয়েছিলেন।”

সেই সময় যাঁরা বাংলা সিনেমার অভিমুখ তৈরি করছিলেন, তাঁরা কি বড়ো বেশি সত্যজিতে আচ্ছন্ন ছিলেন? শংকরলাল ভট্টাচার্য বলছিলেন, “তখন সত্যজিৎ নিয়ে বিশাল হুজুগ, সিনেমার আর্ট-ক্রাফটস এইসব নিয়ে চর্চা তুঙ্গে। আর তপন সিংহ ভালোবাসতেন পর্দায় জীবনের গল্প বলতে, যে জায়গাটা সেই সময়ে দর্শক বা সমালোকচরা বিশেষ গুরুত্ব দেননি বলেই আমার ধারণা। ‘বাঞ্ছারামের বাগান’-এ শুধুমাত্র গল্পের বুনোটে দেখিয়েছিলেন একজন গরিব-অসহায় মানুষ অবদমন করছেন একজন ক্ষমতাশালী-ধনী ব্যক্তিকে।” 

লেখক-সমালোচক অভিতাভ নাগ বলছিলেন, “তপন সিংহ বঞ্চিত হয়েছেন এই ন্যারেটিভে আমি যাচ্ছি না। শুধু বলবো, তপন সিংহ ছিল তখনকার দিনে ফিল্ম-সোসাইটি করা লোকজন যাঁরা সত্যজিৎকে নিয়ে সমালোচনা করতে পারতেন না, তাঁদের কাছে তপন সিংহ ছিল সহজ ‘টার্গেট’।”

তখন সত্যজিৎ নিয়ে বিশাল হুজুগ, সিনেমার আর্ট-ক্রাফটস এইসব নিয়ে চর্চা তুঙ্গে। আর তপন সিংহ ভালোবাসতেন পর্দায় জীবনের গল্প বলতে, যে জায়গাটা সেইসময়ে দর্শক বা সমালোকচরা বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি বলেই ধারণা।

সিনেমা পরিচালনার নিগূঢ় একটা দিক হলো, সিনেমা পরিভাষায় যাকে বলে মিজ-অঁ-সেন। অর্থাৎ, পরিচালক একটা দৃশ্যকে যেভাবে উপস্থাপন করেন শটের মাধ্যমে। অশোক বিশ্বনাথন মনে করিয়ে দিলেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা দিক; তপন সিংহ-র মিজ-অঁ-সেন নিয়ে কখনও লেখা হয়নি, তিনি কেমন শট পছন্দ করতেন সেটা নিয়ে লেখা হয়নি। “তপন সিংহ প্রথম দূরদর্শনের জন্য যে ছবি করেছিলেন, তার নাম ‘আদমি অউর অউরত’। সেখানে মিডিয়াম শট বেশি ব্যবহার করেছিলেন। সকলে যা বিশ্বাস করেন যে টেলিভিশন মানেই ক্লোজ মিডিয়াম, তিনি তা মনে করেননি। বিমল মুখোপাধ্যায়, সৌমেন্দু রায়ের মতো চিত্রগ্রাহক-কে ব্যবহার করেছেন। তপন সিংহ-র শট ডিভিশনের কায়দা, ক্যামেরা বিচরণ এটা গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়নি কখনও।” বলেন অশোক।

জন্মশতবর্ষে তপন সিংহ-কে শ্রদ্ধা জানিয়ে ৩০তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব শুরু হয়েছিল তাঁর পরিচালিত ‘গল্প হলেও সত্যি’ ছবি দিয়ে। ‘আপনজন’ শীর্ষক এই মনোজ্ঞ আলোচনাটির পর এদিন সমাপ্তি অনুষ্ঠানেও ছিল তপনজ্যোতি। সংবর্ধিত করা হয় তপন সিংহের ছবির অভিনেতা ও কলাকুশলীদের। তাঁর ছবির অন্যতম এক মুখ্য অভিনেতা অর্জুন চক্রবর্তী মঞ্চ থেকে অনুরোধ জানান যে, নতুন প্রজন্মের জন্য তপনবাবুর ছবি সংরক্ষণ করে আর্কাইভ করার।
 

Developed by DXDasia