বালিগঞ্জ গভর্মেন্ট স্কুলের শতবর্ষ
সালটা ১৯০৮, সমাজ গড়ার কারিগরদের প্রস্তুত করার উদ্দেশ্যে কলেজ স্ট্রিটের ১১৫ নম্বর বাড়ি অর্থাৎ অ্যালবার্ট হলে প্রতিষ্ঠিত হয় ডেভিড হেয়ার ট্রেনিং কলেজ। কিন্তু লিজে নেওয়া সেই বাড়ি ছিল কলেজের উন্নয়নের পথে প্রধান অন্তরায়। তারপর ঘটনা প্রবাহের পথ ধরে ঘটে চলে একের পর এক নানান ধরনের ঘটনা। নবজাগরণের আলোকে শিক্ষিত বাঙালি তখন শিক্ষার পাঠক্রম শিখছে নতুনভাবে। ভারতের শিক্ষা নিয়ে নতুনভাবে চিন্তা ভাবনার জন্য ১৯১৭ সালে পাঁচজন ব্রিটিশ এবং দু’জন ভারতীয় সদস্যদের নিয়ে গঠিত হয় স্যাডলার কমিশন। এই সদস্যদের মধ্যে একজন ছিলেন আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। শিক্ষা সম্পর্কে তার দূরদৃষ্টি জন্ম দিল এক নতুন মহীরুহের। সেই মহীরুহের নাম বালিগঞ্জ গভর্মেন্ট স্কুল। সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, রাহুল দেব বর্মন, শম্ভু মিত্র, সুব্রত মিত্র, শেখর বসু, তপন রায়চৌধুরী, প্রসাদ রঞ্জন রায়, নবারুণ ভট্টাচার্য প্রমুখ দিকপাল বাঙালি যে বিদ্যালয়ের ছত্রছায়ায় কৈশোর থেকে যৌবনে উত্তীর্ণ হয়েছেন, সেই স্কুল ক্যালেন্ডারের হিসাব ধরে এবার পৌঁছে গেল গৌরবময় শতবর্ষে।

১৯২৭ থেকে ২০২৬, ক্যালেন্ডারের হিসাব বলছে বিদ্যালয়টি পৌঁছে গেছে শতবর্ষে। সেই উপলক্ষে কেমন ভাবে সেজে উঠছে বিদ্যালয়, কিভাবেই বা উজ্জ্বল প্রাক্তনীদের স্মরণ করছেন আজকের ছাত্র ও শিক্ষকরা?
প্রশিক্ষণ বিদ্যালয় থেকে বালিগঞ্জ গভমেন্ট হাই স্কুল, এই যাত্রা পথে ছিল অনেক ওঠাপড়া। প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের নাম। স্যাডলার কমিশনে যে দুইজন ভারতীয় সদস্য ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন তিনি। এই শিক্ষাব্রতী মানুষটির দূরদৃষ্টি ও প্রশাসনিক দক্ষতা দক্ষিণ কলকাতার শিক্ষক-শিক্ষণ কলেজ হিসেবে ডেভিড হেয়ার ট্রেনিং কলেজ এবং প্রশিক্ষণ বিদ্যালয় হিসেবে বালিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপনের কাজ ত্বরান্বিত হয়। কিন্তু তাঁর মৃত্যু সাময়িক স্তব্ধ করে দেয় উন্নতির গতিকে। গতি শ্লথ হলেও থেমে থাকেনি বালিগঞ্জ গর্ভমেন্ট হাই স্কুল স্থাপনের ইতিহাস। যুগে যুগে বাংলার কৃতি সন্তানদের মস্তিষ্কের উর্বর জমিতে মননের উপযুক্ত সার, জল প্রয়োগ করে তাদের মহীরুহে পরিণত করেছে এই বিদ্যালয়।
‘হীরক রাজার দেশে’ ছবিতে সত্যজিৎ দেখিয়েছিলেন, একটি ছাত্রের জীবনে বিদ্যালয়ের এবং শিক্ষকদের ভূমিকা ঠিক কতটা। তাঁর জীবনের উদয়ন পন্ডিতের পাঠশালা ছিল বালিগঞ্জ গর্ভমেন্ট হাই স্কুল। প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত ছাত্রসমাজ ভয় ধরাতে পারে অত্যাচারী শাসকের মনেও, এই ভাবনার বীজ হয়তো অঙ্কুরিত হয়েছিল নিজের বিদ্যালয় জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই। শুধু সত্যজিৎ নন, আন্তর্জাতিক মঞ্চে যাঁরা পৃথিবীর নাম উজ্জ্বল করে তুলেছেন, তাদের অনেকেরই শিকড়ের টান রয়ে গেছে এই বিদ্যালয়ের সঙ্গে। এ বিদ্যালয়ের ক্লাস রুমগুলি চেনে দিকপাল বাঙালিদের কৈশোরকালকে।

১৯২৭ থেকে ২০২৬, ক্যালেন্ডারের হিসাব বলছে বিদ্যালয়টি পৌঁছে গেছে শতবর্ষে। সেই উপলক্ষে কেমন ভাবে সেজে উঠছে বিদ্যালয়, কীভাবেই বা উজ্জ্বল প্রাক্তনীদের স্মরণ করছেন আজকের ছাত্র ও শিক্ষকরা? বঙ্গদর্শন.কম-কে এ কথা জানালেন স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র তথা স্কুলের এলেম নিয়ে এসোসিয়েশনের সেক্রেটারি অনির্বাণ বসু। তাঁর কথায়, প্রতিষ্ঠানের শতবর্ষ উপলক্ষে আয়োজন করা হয়েছে বেশ কিছু অনুষ্ঠান। বর্তমান প্রতিযোগিতার দুনিয়ায় পড়াশোনা করার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উপার্জন, কিন্তু কোন পথে গেলে পাওয়া যাবে সঠিক দিশা? প্রতিবছরই এই বিষয়ে কেরিয়ার কাউন্সেলিং-এর আয়োজন করা হয়, প্রথা মেনে এই বছরেও সেই ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এবং ১০০ বছর উপলক্ষ্যে কাউন্সেলিং-এর সংখ্যা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

শতবর্ষ-অনুষ্ঠানের সূচনা হয় ৩ জানুয়ারি, এক বর্ণাঢ্য প্রভাত ফেরির মাধ্যমে। গৌরবের পথহাঁটার পাশাপাশি ছাত্রদের পুনর্মিলন উৎসবে স্কুল বাড়ি সেজে উঠেছে সেই পুরনো ধাঁচে।
শতবর্ষ-অনুষ্ঠানের সূচনা হয় ৩ জানুয়ারি, এক বর্ণাঢ্য প্রভাত ফেরির মাধ্যমে। গৌরবের পথহাঁটার পাশাপাশি ছাত্রদের পুনর্মিলন উৎসবে স্কুল বাড়ি সেজে উঠেছে সেই পুরনো ধাঁচে। কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একদিন স্কুলে যাওয়ার রোজ নিত্য পোশাকটি পরার দিন শেষ হয়ে গেলেও স্মৃতিগুলো তো আর পিছু হাঁটে না। তাই পুরনো স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে উদ্যোক্তারা সাবেক স্কুলের চেহারার কথা মনে রেখে মঞ্চ সাজিয়ে তুলেছেন সেই সময়কার স্কুলবাড়ির চেহারা অনুযায়ী। স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই কাজে এগিয়ে আসছে ছোটোরাও। পুজোর সময় বাড়ি ফেরার মতোই স্কুলের আবেগঘন দিনে ফিরে যাওয়ার জন্য মুখেই থাকে ছাত্ররা। এই আবেগঘন পরিবেশ তাদের ফিরিয়ে দিল বর্তমান শিক্ষক ও শিক্ষিকাদের। এই বিদ্যালয়ে শতবর্ষ উদযাপন চলবে আগামী ২ জানুয়ারি, ২০২৭ পর্যন্ত।
গল্পের মত স্কুলবাড়ি বালিগঞ্জ গর্ভমেন্ট হাইস্কুল। সেই স্কুলেই মিলিত হলেন ছাত্ররা। বিভিন্ন বিষয়ে পারদর্শিতার পুরস্কার গত জানুয়ারি মাসে তুলে দেওয়া হয় ছাত্রদের হাতে। নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী, শ্রীকান্ত আচার্য ছাড়াও ছিলেন জয়দীপ মুখোপাধ্যায়, সুগত সিনহা, সৌমিত্র বসু, প্রসাদ রঞ্জন রায় প্রমুখ স্কুলের উজ্জ্বল প্রাক্তনীরা। গানে গানে মাতিয়ে রেখেছিলেন গায়িকা সোমলতা আচার্য চৌধুরী।

শৈশব থেকে যৌবনে পৌঁছে যাওয়ার স্বপ্নপথের নাম স্কুল। যে বাড়ি বন্ধুত্বের মানে বোঝায়, শিক্ষার প্রদীপ জ্বালায় আর শেখায় শ্রদ্ধা। তাই মনের কোণে ওই মন্দির চির ভাস্বর হয়েই থাকে। সেই আবেগই বেঁধে রাখে বন্ধুদের, সেই টানেই চেনা স্কুলের পথে মিলে গেলেন বালিগঞ্জ গর্ভমেন্ট স্কুলের নবীন ও প্রবীণ প্রজন্ম।