
সাংবাদিক শিবপ্রিয় দাশগুপ্তের কলামে ‘আমাদের ইস্কুল’ – পর্ব ৪৬
১৮৩৪ সালের ১৪ নভেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুল, শুরুতে স্কুলটি মেদিনীপুর সরকারি জিলা স্কুল হিসাবেই পরিচিতি ছিল। বাংলা তথা ভারতের প্রাচীনতম স্কুলগুলির মধ্যে একটি স্কুল হিসাবে মান্যতা পায় এটি।
এই স্কুলের ছাত্র ও শিক্ষকরা ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছিলেন। স্বাধীনতা সংগ্রামী শহিদ ক্ষুদিরাম বসু ছিলেন এই স্কুলের ছাত্র। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আরও কয়েকজন উল্লেখযোগ্য প্রাক্তন ছাত্র হলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মানিক বন্দোপাধ্যায়। প্রধান শিক্ষক হিসেবে ব্রাহ্মসমাজের নেতা ঋষি রাজনারায়ণ বসু প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলতে অবদান রেখেছিলেন। মেদিনীপুর জেলা ভাগের পর স্কুলটি পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় অবস্থিত। স্কুল ক্যাম্পাসে একটি বাস্কেটবল কোর্ট এবং বিজ্ঞান ল্যাবরেটরি রয়েছে। শিক্ষক, অশিক্ষক কর্মী মিলে মোট ৭০ জন কর্মরত। এর মধ্যে ৬২ জন শিক্ষক। ছাত্র সংখ্যা ১৫০০।

ইতিহাস বলছে, স্কুলটি মেদিনীপুরের তৎকালীন সাধারণ মানুষদের উদ্যোগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তেজচন্দ্র মেহতাব রায়বাহাদুর অর্থনৈতিক সাহায্য করেছিলেন স্কুল প্রতিষ্ঠায়। স্কুলটি কয়েকটি খড়ের ঝুপড়ি এবং ১৮ জন ছাত্র নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। প্রথম প্রধান শিক্ষক ছিলেন রসিকলাল সেন এবং যাত্রা শুরুর মাত্র দুই বছর পর ১৮৩৬ সালে স্কুলটি সরকারি জিলা স্কুলের মর্যাদা পায়। ১৮৫৭ সালে স্কুলটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে আসে।
ব্রিটিশ আমলে স্কুলের হেডমাস্টার স্যার এফ. টাইড এবং মিস্টার সিনক্লেয়ারের সময় তাঁদের চিন্তাভাবনায় স্কুল পরিচালিত হতো। তাঁরা মনে করতেন “জ্ঞান প্রচারের সহজতম এবং সবচেয়ে কার্যকর উপায় হিসাবে পণ্ডিতের অগ্রগতির প্রতিটি ধাপে শিক্ষাদানের জিজ্ঞাসাবাদমূলক পদ্ধতিটি যত্ন সহকারে অনুসরণ করা উচিত।”

রাজনারায়ণ বসু, সমাজ-ধর্মীয় সংস্কারক ও শিক্ষাবিদ ১৮৫১ সালে এই স্কুলে প্রধান শিক্ষকের পদ গ্রহণ করেন এবং ১৫ বছর পর ১৮৬৬ সালে অবসর গ্রহণ করেন। তখন কলকাতার সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন মেদিনীপুরের আরেক কৃতি সন্তান ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তিনি শিক্ষা পরিষদের আদেশ পেয়েছিলেন যে ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক রাজনারায়ণ বসুকে মেদিনীপুর স্কুলের চতুর্থ প্রধান শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ করা হোক। রাজনারায়ণ বসু তখন ব্রাহ্মসমাজ আন্দোলনের অন্যতম একজন ও বাংলার একজন তরুণ নেতা হিসাবে পরিচিত। রাজনারায়ণ বসু ২১ জানুয়ারি ১৮৫১ সালে প্রধান শিক্ষকের পদ গ্রহণ করেন। তিনি সেই সময়ের এমন একজন শিক্ষাবিদ ছিলেন, যিনি শিক্ষা ব্যবস্থায় সম্পূর্ণ সংস্কারের সূচনা করেছিলেন। তিনি পড়ুয়াদের উপর শারীরিক শাস্তি রহিত করেন এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে তাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক পরিবেশের প্রবর্তন করেন।
“স্মৃতিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং কাগজে বমি করার” অর্থাৎ বই মুখস্ত করে পরীক্ষার খাতায় উগরে দেওয়ার পদ্ধতিকে ঘৃণা করতেন। ছাত্র ও শিক্ষক, উভয়ের পারস্পরিক সম্পর্কের দ্বারা শিক্ষাদানের নিয়ম অনুসরণ করতেন। হাস্যরসাত্মক কৌতুকের সঙ্গে তাঁর বাকপটু বক্তৃতা ক্লাসের সকল ছাত্রদের আকৃষ্ট করত। তিনি জিজ্ঞাসাবাদমূলক শিক্ষার উপর জোর দিয়েছিলেন, যাতে শিক্ষার্থীর মৌলিক বিষয়গুলো শক্তিশালী হয়।
তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে ছাত্রদের শারীরিক ব্যায়াম এবং খেলাধুলার কতটা প্রয়োজন রয়েছে। তাই স্কুল প্রাঙ্গণে একটি লন টেনিস কোর্ট এবং একটি জিমনেসিয়াম তৈরি করেছিলেন। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে ব্যাক-সাপোর্ট ছাড়া বেঞ্চে বসে থাকা শিক্ষার্থীরা পিঠ সোজা রাখতে পারে না, তাই পড়াশোনা করার সময় তাদের মনোযোগের কমে যায়। তাই তিনিই প্রথমবার ব্যাক-সাপোর্ট সহ বেঞ্চ প্রবর্তন করেন।
ঋষি রাজনারায়ণ বসু ইয়ং বেঙ্গলের একজন সক্রিয় নেতা হওয়ার কারণে, হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওর ‘একাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন’ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। তাই স্কুল পর্যায়ে বিতর্ক সমিতি এবং পারস্পরিক উন্নতি সমিতি চালু করেছিলেন তিনি।
তাঁর এই ধারণার কারণে, স্কুলটি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, বিধবা-বিবাহ, নারী শিক্ষা, ব্রাহ্মসমাজ আন্দোলন এবং আরও অনেক সামাজিক-রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ ছিল। তিনিই সম্ভবত কোনো সরকারি স্কুলের প্রথম প্রধান শিক্ষক যিনি তাঁর ছাত্রদের স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগদানের জন্য উদ্বুদ্ধ করার সাহস দেখিয়েছিলেন এমনকি স্কুল প্রাঙ্গণে জাতীয় পতাকাও উত্তোলন করেছিলেন। ১৮৬৬ সাল পর্যন্ত তিনি প্রধান শিক্ষকের চেয়ার অলংকৃত করেছিলেন।
মেদিনীপুরের স্কুলটি ব্রিটিশ বিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে লালন করার জন্য বিখ্যাত ছিল। হেমচন্দ্র কানুনগো, জ্ঞানেন্দ্রনাথ বসু, প্যারিলাল ঘোষের মতো শিক্ষকরা তাঁদের জাতীয়তাবাদী শিক্ষার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। শহিদ ক্ষুদিরাম বসু ছিলেন স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র। এই ক্ষেত্রে তাঁর ‘গুরু’ ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু, তিনিও এই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র এবং পরবর্তীতে এই স্কুলের শিক্ষক হন। ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট ক্ষুদিরাম বসুর হাসিমুখে ফাঁসি বরণ করার নির্মম ঘটনাকে একটি ব্রিটিশ বিরোধী ঘৃণার অধ্যায় হিসাবে চিহ্নত করে রাখার জন্য স্কুলের বাগানে এখন তাঁর একটি মূর্তি স্থাপিত আছে।

ক্ষুদিরামের রাজনৈতিক গুরু, সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে ওই ১৯০৮ সালের ২৩ নভেম্বর ফাঁসি দেওয়া হয়। স্কুলের আরেক প্রাক্তন ছাত্র অনাথবন্ধু পাঞ্জা ১৯৩৩ সালে ফাঁসির মঞ্চে গিয়েছিলেন। অত্যাচারী জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জেমস পেডিকে ৭ এপ্রিল ১৯৩১ সালে স্কুলের ভিতরে দুই মুক্তিযোদ্ধা শ্রী বিমল দাশগুপ্ত এবং জাতিজীবন ঘোষ গুলি করে হত্যা করেছিলেন।
সেই অগ্নিগর্ভ দিনগুলিতে, স্কুলে প্রবোধ কুমার বন্দোপাধ্যায় নামে একজন ছাত্র ছিলেন যিনি ১৯২৬ সালে বাধ্যতামূলক এবং ঐচ্ছিক গণিতে লেটার মার্কস নিয়ে প্রথম বিভাগে পাশ করে কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন। কিন্তু বাংলা সাহিত্য জগত তাঁকে ভিন্ন নামে চেনে, তিনি হলেন মানিক বন্দোপাধ্যায়।

অনেক ইতিহাসকে সঙ্গে নিয়ে মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুল এখন আর পাঁচটা সরকারি স্কুলের মতোই চলছে। স্কুলে মাধ্যমিক, উচ্ছ মাধ্যমিকের ফল ভালোই হয়। তবে সরকারি বাংলা মাধ্যম স্কুলে পড়াবার ক্ষেত্রে গত বেশ কয়েক বছর ধরে অভিভাবকদের মধ্যে একটা অনীহা এসেছে। তাছাড়া বহু ক্ষেত্রে সটকারি স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষিকার ঘাটতি পূরণ না হওয়া এর অযতম কারণ। এ ছাড়াও আরও একটি কারণ হচ্ছে, আজকাল বেশিরভাক অভিভাবকেরই একটি মাত্র সন্তান। তাই তাঁরা তাঁদের সামর্থ অনুযায়ী সন্তানকে সেরা স্কুলে পড়ানোর ইচ্ছে থেকেই বাংলা মাধ্যম স্কুলে পড়ানোর নিস্পৃহতা তৈরি হয়েছে। তবে এর পরেও মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলে ১৫০০ ছাত্র পড়তে আসছে। ঋষি রাজনারায়ণ বসুর আদর্শকে সামনে রেখে স্কুলের পঠনপাঠন চলছে নিজস্ব পথ ধরে।
তথ্য সূত্র : স্কুলের প্রাক্তনী ও স্কুলের ইতিহাস সংক্রান্ত নথি
ছবি :সংগৃহীত
*কলকাতা, শহরতলি বা জেলার কোনও না কোনও স্কুলের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে গর্বের ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বুনিয়াদি গল্প। এবার সেদিকেই ফিরে তাকিয়ে চলছে নতুন ধারাবাহিক ‘আমাদের ইস্কুল’। সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন। চোখ রাখুন প্রতি বুধবার সন্ধে ৬টায়, শুধুমাত্র বঙ্গদর্শনে।
