রাজ্যের শিক্ষা মানচিত্রে স্বকীয় দীপ্তিতে আজও ভাস্বর পুরুলিয়া জিলা স্কুল

সাংবাদিক শিবপ্রিয় দাশগুপ্তের কলামে ‘আমাদের ইস্কুল’ – পর্ব ৪

ব্রিটিশ শাসন ভারতকে শুধুই শোষণ করেছে সেটা যেমন একদিকে ঠিক তেমন ব্রিটিশদের ভারতে আগমনের ফলে ভারত তথা বাংলার মানুষ অনেক জোটবদ্ধ, ঐক্যবদ্ধ, দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, লক্ষ্যে স্থির হয়েছে। বেড়েছে শিক্ষা, সংস্কৃতি রক্ষার দায় এবং দায়িত্ব। শোষণ ও শাসন মানুষকে যেমন নিষ্পেষিত করে তেমনি মানুষকে দৃঢ় সংকল্প হতেও সাহায্য করে। আর এই সংকল্প জন্ম দেয় এমন কিছু কাজের যা ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক এবং একেকটা মাইলফলক হয়ে থাকে। তেমনই একটি মাইলফলক পুরুলিয়া জিলা স্কুল (Purulia Zilla School)।

মানভূমের জেলা সদর মানবাজার থেকে পুরুলিয়ায় স্থানান্তরিত হয়েছিল ১৮৩৮ সালে। এটাও ছিল ব্রিটিশদেরই কাজ। ব্রিটিশরা চাইছিল সরকারি কাজকর্ম, কর আদায় ইত্যাদি সঠিকভাবে পরিচালিত করার জন্য উপযুক্ত ও দক্ষ কর্মী। আর তাই তারা বুঝতে পেরেছিল উপযুক্ত ও দক্ষ কর্মী পেতে হলে প্রয়োজন একটি স্কুল স্থাপনের। যেখান থেকে প্রশিক্ষিত হয়ে যাঁরা বেরোবেন তাঁরাই পরবর্তী সময়ে সরকারি ও প্রশাসনিক কাজের জন্য দক্ষ হয়ে উঠতে পারবেন। তারপর বেশ কয়েক বছর কেটেছে। শেষমেষ ১৮৫৩ সালের ১ মে প্রতিষ্ঠিত হল আজকের পুরুলিয়া জিলা স্কুল। এটা পুরুলিয়া স্কুল প্রতিষ্ঠার একটি ইতিহাস।

তবে স্কুলের বর্তমান প্রধান শিক্ষক বারিদবরণ মিশ্র এই ইতিহাসকে গ্রহণযোগ্য মনে করলেও তাঁর মতে পুরুলিয়া জিলা স্কুল সৃষ্টির আরও একটি ইতিহাস আছে। বারিদবরণ মিশ্র বলেন, “পুরুলিয়া জিলা স্কুল প্রতিষ্ঠার পিছনে ইংরেজ বিদ্বেষ একটা বড়ো কারণ। সে সময় পুরুলিয়া জেলার মানুষের মধ্যে ইংরেজ বিরোধিতা বড়ো প্রকট ভাবেই ছিল। ইংরেজরা তখন বিদ্রোহী জনসাধারণকে সেনাবাহিনী দিয়ে সাজা দেওয়া ও নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চালাত। এতে ইংরেজ বিদ্বেষ জেলার মানুষের মধ্যে আরও ভীষণ ভাবে বেড়ে যায়। ইংরেজরা জেলার মানুষের অসন্তোষকে প্রশমিত করার লক্ষ্যে সরকারি পরিষেবা দিয়ে পুরুলিয়া জেলার মানুষকে ঠান্ডা করার জন্যই পুরুলিয়া জিলা স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিল, এটাও এই স্কুল সৃষ্টির অন্য একটি ইতিহাস।” তবে ব্রিটিশদের মহানুভবতায় হোক কিংবা জেলার মানুষদের ক্ষোভের ফলেই হোক জন্ম নিল পুরুলিয়া জেলা স্কুল।

তৎকালীন ব্রিটিশ আমলে সমগ্র মানভূমে একমাত্র সরকারি স্কুল ছিল পুরুলিয়া জিলা স্কুল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকাল ১৮৫৭ সাল।  তার আগেই ১৮৫৩ সালে আজকের পুরুলিয়া জিলা স্কুলের জন্ম। তবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এই স্কুলটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চলে আসে। জন্মলগ্ন থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত পুরুলিয়া জিলা স্কুল  পরিচালনায় অনেক হাতবদল হয়েছে। 

মাধ্যমিক পরীক্ষায় রাজ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্থান পেয়ে আসছে পুরুলিয়া জিলা স্কুল। ২০১২ সালে এই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় চতুর্থ, ষষ্ঠ ও দশম স্থান পেয়েছিল তিন ছাত্র। ২০১৬ সালেও মাধ্যমিকে অষ্টম স্থান পায় তিন ছাত্র। ২০১৭ সালের উচ্চমাধ্যমিকে অষ্টম স্থান এবং ২০১৮ সালের উচ্চমাধ্যমিকে পঞ্চম স্থান লাভ করে পুরুলিয়া জিলা স্কুল।

ইতিহাস বলছে, ১৯১৭ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত পুরুলিয়া জিলা স্কুল পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ছিল। আবারও ১৯৫১ সালে এই স্কুল বিহার বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। সেই থেকে ১৯৫৬ সালের কিছুটা পর্যন্ত বিহার বোর্ডই নিয়ন্ত্রণ করত পুরুলিয়া জেলা স্কুলের পঠনপাঠন। শেষ পর্যন্ত ১৯৫৬ সালেই পুরুলিয়া জেলা পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে চলে এলে প্রথমে পুরুলিয়া জিলা স্কুল পশ্চিমবঙ্গ শিক্ষা অধিকার ও পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ গঠনের পর পুরুলিয়া জিলা স্কুল পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের আওতায় আসে এবং আজও এই স্কুল পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের অধীনেই আছে।

১৯১২ সালে মানভূম ডিভিশন বিচ্ছিন্ন হয় বাংলা থেকে। এর ফলে মানভূমের সঙ্গে বাংলার শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। ১৯৫৬ সালে মানভূম ডিভিশন আবার বাংলার সঙ্গে যুক্ত হয়। এর ফলে মানভূম আবার বাংলার শিক্ষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়। এই কাজে পুরুলিয়া জিলা স্কুলের বড়ো ভূমিকা ছিল বলে বারিদবরণ মিশ্র মনে করেন।

লর্ড কর্নওয়ালিস ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন করেন। এর ফলে বাংলার সামন্ত প্রভুরা ব্রিটিশদের সাহায্যকারী হিসাবে কাজ করতে শুরু করেছিল। তবে পরবর্তী সময়ে এই সামন্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া বহু সন্তান পুরুলিয়া জিলা স্কুলে পড়ে ইংরেজ বিরোধীতার মশাল হাতে তুলে নিয়েছিলেন। এটাও পুরুলিয়া জিলা স্কুলের অন্য এক ইতিহাস। ১৯৫৬ সাল, অর্থাৎ স্বাধীনতার পরবর্তী বহু বছর পর্যন্ত একটানা ইংরেজ বিরোধীতার মশাল প্রজ্জ্বলিত ছিল।

১৮৫৩ সালের ১ মে পুরুলিয়া জিলা স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৯১১ সালে নডিহায় স্কুলের আজকের ভবনটি তৈরি হয়েছিল। পুরুলিয়া জিলা স্কুলে বহু কৃতী মানুষ শিক্ষকতা করেছেন। এঁদের মধ্যে অন্যতম বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী ঋষি নিবারণ চন্দ্র।

প্রাতঃবিভাগে প্রাথমিক, দিবা বিভাগে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক মিলিয়ে স্কুলের বর্তমান ছাত্র সংখ্যা ১২৫০ জন। উচ্চমাধ্যমিক স্তরে বাণিজ্য, কলা ও বিজ্ঞান পড়ানোর ব্যবস্থা আছে। এছাড়াও কম্পিউটার শিক্ষার ব্যবস্থাও রয়েছে পুরুলিয়া জিলা স্কুলে। এই স্কুলের মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকের ফল বরাবরই উল্লেখযোগ্য। পড়ুয়ারা সমাজ, বিজ্ঞান, প্রকৃতি সম্পর্কেও স্কুল থেকে যথাযথ শিক্ষা পায়। এছাড়াও খেলাধুলা, শিল্প-সংস্কৃতিমূলক কাজেও এই স্কুলের পড়ুয়ারা সাফল্য পেয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। 

পুরুলিয়া জিলা স্কুলের মধ্যেই ছাত্রাবাস রয়েছে। এই ছাত্রাবাসে সপ্তম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির পড়ুয়াদের ১০০ জনের থাকার ব্যবস্থা আছে। তবে চাহিদার তুলনায় এই ছাত্রাবাসে স্থানের ঘাটতি আছে বলেই স্কুল কর্তৃপক্ষ ও পড়ুয়াদের বক্তব্য।

মাধ্যমিক পরীক্ষায় রাজ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্থান পেয়ে আসছে পুরুলিয়া জিলা স্কুল। ২০১২ সালে এই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় চতুর্থ, ষষ্ঠ ও  দশম স্থান পেয়েছিল তিন ছাত্র। ২০১৬ সালেও মাধ্যমিকে অষ্টম স্থান পায় তিন ছাত্র। ২০১৭ সালের উচ্চমাধ্যমিকে অষ্টম স্থান এবং ২০১৮ সালের উচ্চমাধ্যমিকে পঞ্চম স্থান লাভ করে পুরুলিয়া জিলা স্কুল।

খেলাধুলাতেও সমান দক্ষ স্কুলের পড়ুয়ারা। ২০১৪ সালে রাজ্য চ্যাম্পিয়ানশিপে জিমন্যাস্টিকে একের বেশি সোনার পদক পায় পুরুলিয়া জিলা স্কু্লের পড়ুয়ারা। ২০১৩ সালে সিএবি দলে অনুর্ধ ১৫ বিভাগে এই স্কুলের ৩ পড়ুয়া স্থান পেয়েছে। ২০১০ সালে পুরুলিয়া জিলা স্কুলের দল সুব্রত কাপে অনুর্ধ ১৪ বিভাগে জেলা ও জোন চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। ২০১৩ সালে অনুর্ধ ১৪ ও ১৭ বিভাগে রানার্স হয়।

এছাড়াও জেলা স্তরে সরকারি বিদ্যালয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় পুরুলিয়া জিলা স্কুল ২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত পরপর টানা চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। একই ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ২০১৬ সালেও সাফল্যের গৌরব অর্জন করে। ২০১২ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত পর পর স্কুল ক্রিকেটে জেলা ও ২০১৭ সালে জোন চ্যাম্পিয়ন হয়। কবাডি, দাবা ও যোগব্যায়ামে ধারাবাহিক রাজ্যস্তরীয় সাফল্য পেয়ে আসছে পুরুলিয়া জিলা স্কুল। 

২০০৯ সালে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে মেলবন্ধন ও বিশ্বব্যাপী এই কাজে পড়ুয়াদের উন্নতিকরণের জন্য অক্সফোর্ড অ্যাকাডেমির সঙ্গে পুরুলিয়া জিলা স্কুল “এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম”-এ কাজ করার সুযোগ পায়।

তবে রাজ্যের আর পাঁচটা সরকারি স্কুলের মতোই এই স্কুলেও শিক্ষকের ঘাটতি আছে বলে জানান প্রধান শিক্ষক। মোট ৫৬ জন শিক্ষক ও ২১ জন শিক্ষাকর্মী এই স্কুলে থাকার কথা, কিন্তু তা নেই। ল্যাবরেটরি অ্যাসিস্ট্যান্ট নেই, লাইব্রেরিয়ানের সমস্যাও আছে। তবে এই সব প্রতিবন্ধকতাকে বড়ো করে না দেখে বর্তমান শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীরা নিজেদের উদ্যোগে স্কুলের পঠনপাঠন সঠিকভাবেই চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

তাই বলা যায় পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমতম প্রান্তে শাল-পলাশ-মহুয়ায় ঘেরা একটা মালভূমিতে ১৮৫৩ সালে যে স্কুলটি মানুষ তৈরির কারিগর হিসাবে কাজ শুরু করেছিল, আজ ২০২৩ সালে এসেও সেই একই কাজ সদর্পে করে চলেছে পুরুলিয়া জেলা স্কুল। রাজ্যের শিক্ষা মানচিত্রে স্বকীয় দীপ্তিতে আজও ভাস্বর পুরুলিয়া জিলা স্কুল।

তথ্য সূত্রঃ বারিদবরণ মিশ্র, প্রধান শিক্ষক, পুরুলিয়া জিলা স্কুল

ছবিঃ সংগৃহীত

Developed by DXDasia