প্রাক-শতবর্ষে সত্যজিৎ, ঋত্বিক, নবারুণের ‘বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল’

সাংবাদিক শিবপ্রিয় দাশগুপ্তের কলামে ‘আমাদের ইস্কুল’ – পর্ব ২

৯২৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল। ২০২৭ সালে ১০০ বছরে পা রাখবে। কলকাতার বিশেষ করে দক্ষিণ কলকাতার বিগতদিনের তো বটেই এই সময়েরও বাংলা স্কুলের মধ্যে অগ্রগণ্য এই স্কুল। বর্তমানে অবশ্য বাংলা এবং ইংরেজি উভয় মাধ্যমেই শিক্ষাদানের ব্যবস্থা আছে এই স্কুলে। ১৯২৮ সালে এই স্কুল থেকে প্রথম ব্যাচের ছাত্ররা স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা দেয়। কে পড়েননি এই স্কুলে? এই স্কুলে পড়ে বাংলার বহু পড়ুয়া পরবর্তীতে বাংলা তথা দেশে এবং বিশ্বের দরবারে উজ্বলতার ছাপ রেখেছেন। বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুলে পড়েছেন যাঁরা এঁদের মধ্যে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, রাহুলদেব বর্মন, শম্ভু মিত্র, চিত্রগ্রাহক সুব্রত মিত্র, নিউক্লিয়ার বিজ্ঞানী শেখর বসু, ইতিহাসবিদ তপন রায়চৌধুরী, নবারুণ ভট্টাচার্য’র নাম উল্লেখযোগ্য।

দীপক দাসের সঙ্গে কথা হচ্ছিল বালিগঞ্জ গভর্মেন্ট হাই স্কুল প্রসঙ্গে। দীপকবাবু এই স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক। এ ছাড়াও তাঁর অন্য আর একটি পরিচয় তিনি দীর্ঘদিন সরকারি স্কুল শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। স্কুলে মাস্টারি করার পাশাপাশি শিক্ষকদের সংগঠনের জন্যও দীপকবাবুকে কাজ করতে হতো। তাই স্কুলের কাজ ছাড়া সংগঠনের কাজ করার জন্য দীপকবাবুকে তখন প্রায়দিনই নির্ধারিত সময়ের বেশ কিছুক্ষণ আগে স্কুলে আসতে হতো।

স্কুল প্রাঙ্গন

সময়টা ১৯৮৫-র শেষের দিক হবে। হঠাৎ একদিন তিনজন ছেলে স্কুলে এসে দীপকবাবুকে বললেন, আমাদের স্কুলে প্রাক্তনীদের কোনও সংগঠন নেই কেন? সব স্কুলে তো আছে। দীপকবাবু ওই তিনজনকে বলেছিলেন, আমি তো স্কুলের শিক্ষক। প্রাক্তনীদের সংগঠন তো ছাত্ররা করে। এই তিনজনের মধ্যে একজন হলেন বাংলা সংগীতের অন্যান্য শিল্পী শ্যামল মিত্র’র ছেলে শিল্পী সৈকত মিত্র। এর পর ১৯৮৬ সালে সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রাক্তনী সংগঠন করার কথা ঘোষণা হল, এই কাজটা দীপকবাবুর সহযোগিতায় প্রাক্তন ছাত্ররাই করলেন। ওই বিজ্ঞাপনেই উল্লেখ করা হয়েছিল ১৯৮৭ সালে বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুলের ৬০ বছর পূর্তির অনুষ্ঠান হবে। সেই বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুলের প্রাক্তনীদের সংগঠনের যাত্রা শুরু। ১৯৮৭ সালে সারা বছর ধরে চলেছিল স্কুলের ৬০ বছর পূর্তির অনুষ্ঠান। স্কুলের ছাত্র, স্কুলের বর্তমান বনাম প্রাক্তন ছাত্র, অন্য স্কুলের ছাত্রদের মধ্যে ক্রিকেট ম্যাচও হয়েছে সম্প্রতি।

এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে, সেই ১৯৮৭ সালে, ৬০ বছর পূর্তিতে প্রাক্তনীরা উদ্যোগ নিয়ে বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল এবং কলকাতার অন্য আরও ভালো স্কুলের ছাত্রদের নিয়ে বসে আঁকো প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। বহু খ্যাতনাম শিল্পী ছাত্রদের আঁকা ছবি থেকে ৫০টি ছবি চূড়ান্ত প্রতিযোগিতার জন্য নির্বাচন করে দেন। শেষ পর্যন্ত সেই ৫০টি ছবি থেকে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় সেরা ছবি বেছে দিলেন যে বিচারক, তিনি সত্যজিৎ রায়। ভাবতেও কেমন অবাক লাগে এসব কথা। গল্পের মতো শুনতে লাগে। এই স্কুলের প্রতিটি ধাপে এমনই সব ইতিহাস লুকিয়ে রয়েছে।

স্কুলের সরস্বতী পুজোয় ‘সত্যজিৎ রায়’ থিম

এই ইতিহাস সঙ্গে নিয়েই এখনও সম্মুখে এগিয়ে চলেছে বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল। কোনও কিছুই তার চলার পথে বাঁধা হয়ে উঠতে পারেনি। এখনও বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুলের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক মিলিয়ে যতজন পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দেয় তারা সবাই পাশ করে শুধু নয়, যোগ্যতা ও মেধার প্রমাণ রাখে। পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বরের শতাংশের হিসেব এই স্কুলের শিক্ষক বা পড়ুয়াদের আজও করতে হয় না। এটাই বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুলের উৎকর্ষ প্রমাণ করে।

বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুলের পড়ুয়াদের সার্বিক শিক্ষার দিকেই প্রথম থেকেই নজর দিতেন স্কুলের শিক্ষকরা। সেই ঐতিহ্য আজও বহন করে চলেছে এই স্কুল। তাই ক্রিকেট খেলা, নাটক, বিতর্ক, গান সব বিষয়েই ছাত্রদের প্রতি স্কুলের নজর রয়েছে। স্কুলের বর্তমান প্রধান শিক্ষক রঞ্জিত গরাং কথা প্রসঙ্গে সেটাই জানালেন। রঞ্জিতবাবু বললেন, “আমরা পড়াশুনার পাশাপাশি ছাত্রদের মানসিক বিকাশের দিকে নজর দিই। আমরা মনে করি শুধু লেখাপড়ায় ভালো হলেই হয় না। একজন মানুষকে ভালো ছাত্র হওয়ার পাশাপাশি ভালো মানুষ হতে হয়। সেই মানুষটিকে নিজের ভাবনার পাশাপাশি সমাজের কথা, সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের কথা ভাবতে হয়। আমরা আমাদের স্কুলে শিক্ষার মধ্যে এই বিষয়গুলিও রেখে চলি। যে ছেলের যে দিকে ঝোঁক আমরা সেই দিকে তাঁর বিকাশের জন্য সাহায্য করি।”

বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে স্কুলের ছাত্র্দের অংশগ্রহন

সেই শুরুর সময় থেকেই বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট সমাজকে এই ‘ভালো মানুষ’ উপহার দিয়ে চলেছে। সত্যজিৎ রায়, শম্ভু মিত্র, নবারুণ ভট্টাচার্য যেমন আছেন প্রাক্তনীদের তালিকায়, তেমনই আছেন গৌতম মোহন চক্রবর্তী, অশোক মোহন চক্রবর্তী,  সৈকত মিত্র, শিবপ্রসাদ মুখার্জি, রজতাভ দত্ত, রূপঙ্কর বাগচীর মতো এই সময়ের কিছু খ্যাতিমান মানুষ। চলতি বছরেও স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে রেড রোডের বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে কুচকাওয়াজে অংশ নিয়েছে এই স্কুলের প্রায় ১০০ জন ছাত্র।

কথা হচ্ছিল বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাইস্কুলের বর্তমান প্রাক্তনী সংগঠনের সম্পাদক যুধাজিৎ মুখার্জীর সঙ্গে। তিনি নিজে রঞ্জি খেলেছেন বাংলার হয়ে। বর্তমানে বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুলের ক্রিকেট ক্যাম্প তিনিই চালাচ্ছেন।

আর কয়েক বছর পরই বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল ১০০ বছরে পা রাখবে। যুধাজিৎবাবু বলছিলেন ২০২৬ থেকেই তাঁরা স্কুলের ১০০ বছরে পদার্পনের প্রারম্ভিক অনুষ্ঠান শুরু করবেন। ১০০ বছরের অনুষ্ঠানে স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র রাহুলদেব বর্মনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কিছু অনুষ্ঠান করার পৰিকল্পনাও তাঁরা নিয়েছেন বলে যুধাজিৎবাবু জানালেন। যুধাজিৎবাবু আরও জানালেন, “শতবর্ষে কেমন অনুষ্ঠান হবে তার টেম্পো সেট করার জন্য আগে একটা অনুষ্ঠান আমরা করতে চলেছি। অনুষ্ঠানে প্রাক্তন শিক্ষকদের সংবর্ধনা দেব। ফুটবল, ক্রিকেট খেলা হবে। যাদবপুর বিদ্যাপীঠ, নব নালন্দার প্রাক্তনীরা এই খেলায় অংশ নেবেন। স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষকদের মধ্যে যাঁরা প্রয়াত হয়েছেন তেমন কয়েকজনের নাম ট্রফি দেওয়া হবে। আমি খেলাধুলার সঙ্গে আছি। বেঙ্গল খেলেছি। এক মাস ধরে এবার খেলা হবে। এক্স ইন্ডিয়ান টিমের ফুটবলারদের সঙ্গে বালিগঞ্জের খেলা হবে। আর এন মুখার্জি, এই স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক, তিনি আমার বাবা, স্কুলের খেলার মাঠের উন্নয়নে সিএবি-র সহায়তা পাওয়ার বিষয়টা আমার বাবার জন্যই হয়েছিল। তাই বাবার নামে ট্রফি থাকছে। আমার বাবা আর এন মুখার্জি আম্পায়ার ছিলেন। স্কুলের মাঠে সিএবিকে আনার জন্য ও স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক হিসেবে তাঁকেও স্মরণ করছি ১০০ বছরের অনুষ্ঠানে। এ ছাড়া স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক বনবিহারীবাবু স্কুলে ফুটবল, রাখবি খেলার জন্য যে প্রয়াস নিয়েছিলেন সেটা স্মরণীয়, তাই তাঁকেও মনে রেখে ১০০ বছরের অনুষ্ঠান ভাবা হয়েছে। তবে মূল ফোকাস আরডি বর্মন।” 

এই প্রসঙ্গে কথা হচ্ছিল স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র জয়দেব দাশগুপ্তর সঙ্গে। তিনি বললেন, “আমি ১৯৭১-এর উচ্চ মাধ্যমিক ব্যাচ। আমাদের ব্যাচে সিদ্ধার্থ রায় হায়ার সেকেন্ডারিতে চতুর্থ হয়। আমাদের সময় লেখাপড়ার পাশাপাশি ইডেন গার্ডেন্স-এ সামার ক্রিকেট হতো। স্কুল লিগ হতো। সেটা এখনও আছে। স্কুলের পরিবেশ আজও আমাদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক এমন ছিল আমরা শিক্ষকদের সঙ্গে খেলতাম। শিক্ষকরা আমাদের ভালো মানুষ হওয়ার জন্য উৎসাহ দিতেন। আমাদের স্কুল এখনও একই রকম আছে। মানুষের পাশে দাঁড়াতে আমরা কোনওদিন পিছিয়ে ছিলাম না এখনও নেই।”     

বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাইস্কুলের কৃতি ছাত্ররা রাজ্যে, দেশে ও সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছেন। তাই কোনও ছাত্রের কোনও প্রয়োজনে প্রাক্তনীরা একসঙ্গে উদ্যোগী হয়ে প্রয়োজন মেটান। এই স্কুলে পড়েছেন কলকাতা পুলিশের প্রাক্তন নগরপাল গৌতম মোহন চক্রবর্তী। রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যসচিব অশোক মোহন চক্রবর্তী। লর্ড লিটন ১৯২৭ সালের ৩ জানুয়ারি বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাইস্কুলের স্কুলের দ্বারোদঘাটন করেছিলেন। সেই যাত্রাশুরুর দিন থেকে আজ পর্যন্ত এই স্কুলের ছাত্ররা যে পরস্পরের প্রতি সমর্মিতা বজায় রেখে চলেছেন সেটা এই স্কুলের একটা অন্যান্য নজির।

লর্ড লিটন। ১৯২৭ সালের ৩ জানুয়ারি বালিগঞ্জ স্কুলের দ্বারোদঘাটন করেছিলেন

আগষ্ট ২০২০, পুরোপুরি লকডাউন, দিশেহারা, ভয়ভীত অবস্থা সবারই। মাঝেমাঝেই নিস্তব্ধতার বুক চিরে সাইরেন বাজিয়ে ছুটে চলেছে অ্যাম্বুল্যন্স। করোনার করাল থাবা যখন মানুষের সর্বস্ব কেড়ে নিচ্ছে সেই সময়ে এই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্ররা বহু আর্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন দুবেলার রেশন দিয়ে, অভাবী ছাত্রদের হাতে তুলে দিয়েছেন বই-খাতা। বিপন্নদের পাশে কীভাবে দাঁড়িয়েছেন প্রাক্তনীরা বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল-এর ফেসবুক পেজ ঘাঁটলে সেটা খানিকটা হলেও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। সব মিলিয়ে একথা বলতেই হয়, বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল শুধু ছাত্র গড়ার নয়, মানুষ গড়ার কারিগর।

তথ্য সূত্র:-

রঞ্জিত গরাং , প্রধান শিক্ষক, বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল

দীপক দাস, প্রাক্তন শিক্ষক, বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল

যুধাজিৎ মুখার্জি , প্রাক্তন ছাত্র ও সম্পাদক, বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল প্রাক্তনী সংসদ

বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল ফেসবুক পেজ

ছবি: – যুধাজিৎ মুখার্জি

*কলকাতা, শহরতলি বা জেলার কোনও না কোনও স্কুলের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে গর্বের ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বুনিয়াদি গল্প। এবার সেদিকেই ফিরে তাকিয়ে শুরু হল নতুন ধারাবাহিক ‘আমাদের ইস্কুল’। চোখ রাখুন প্রতি বুধবার সন্ধে ৬টায়, শুধুমাত্র বঙ্গদর্শনে।

Developed by DXDasia