
সাংবাদিক শিবপ্রিয় দাশগুপ্তের কলামে ‘আমাদের ইস্কুল’ – পর্ব ১
বঙ্গদেশে মেয়েদের মধ্যে স্কুল বা পাঠশালার শিক্ষা কখনওই সেভাবে প্রচলিত ছিল না। ইয়ংবেঙ্গল গোষ্ঠী তাদের প্রচেষ্টায় মেয়েদের গৃহশিক্ষায় একটু মনোযোগ দেওয়া হল আর এই প্রথম ব্যক্তিগত উদ্যোগে মেয়েদের জন্য স্কুল তৈরি হল — খাস কলকাতায় নয়, কলকাতার আশেপাশে, উত্তরপাড়া, বারাসত ইত্যাদি স্থানে। ততদিনে জেনানা মিশনের উদ্যোগে কলকাতায় একাধিক মেয়েদের স্কুল চলছে। কিন্তু সর্বসাধারণের সেই স্কুলের দরজায় পৌঁছবার উপায় ছিল না, সকলের জন্য সেইসব স্কুল ছিল ব্রাত্য। এ হেন সময়ে আবির্ভাব বেথুন সাহেবের।
১৮০০ সালের মাঝামাঝি একটা সময়। বঙ্গসমাজ তখন সবে যা কিছু অবিশ্বাস, অন্ধ ভাবনা তা ঝেড়ে ফেলে মাথা তুলে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে। পর্দার আড়াল, রান্নাঘরের আগুনের আঁচ থেকে মেয়েরা তখন বার হতে চাইছে সূর্যের প্রজ্জল আলোয়। এরই মধ্যে রীতিমতো জরাজীর্ণ যা কিছু ভাবনা তাকে দূরে সরিয়ে অন্তঃপুরবাসিনীরাই সেই আলোর উৎস হয়ে এগিয়ে আসতে শুরু করেছে। এই পরিবর্তনে অগ্রণী ভূমিকা ছিল ঠাকুরবাড়ির মেয়ে-বউদের। ঠিক এমনই এক মাহেন্দ্রক্ষণে বাংলার নবজাগরণের প্রতীক হিসাবে কলকাতায় জন্ম নিল প্রথম মেয়েদের স্কুল (Kolkata’s first girls school)। যে স্কুল আজও কলকাতার বুকে ঐতিহ্যবাহী ‘বেথুন স্কুল’ (Bethune school) হিসাবেই দাঁড়িয়ে রয়েছে।

জন এলিয়ট ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুন (John Elliot Drinkwater Bethune) ছিলেন একজন পুরদস্তুর সাহেব। কলকাতার নব্য বাঙালিরা তাঁর হাত ধরেই নতুন এক দিগন্তের পথে পা রেখেছিল। বারাসতে একটি স্কুল পরিদর্শনে এসে বেথুন সাহেবের মনে হয়েছিল, এত বড়ো শহর কলকাতা, জাতপাত-বর্ণ-শ্রেণী-ধর্মের ঊর্দ্ধে মেয়েদের জন্য সেখানে একটা স্কুল কেন হবে না? এটা কেমন করে সম্ভব? সেই ভাবনাই বেথুন স্কুলের জন্মের উৎস।
সে সময় বঙ্গসমাজে যে সমস্ত স্বনামধন্য মানুষ ছিলেন তাঁদের অন্যতম মুখ ছিলেন রামগোপাল ঘোষ। বিখ্যাত সমালোচক, বাগ্মী। এই রামগোপাল ঘোষের কাছেই কলকাতায় মেয়েদের স্কুল তৈরির কথাটা প্রথম প্রকাশ করলেন বেথুন সাহেব। এই প্রস্তাব শুনে রামগোপাল ঘোষ মহাশয় তো মহা খুশি। কিন্তু পাশাপাশি তাঁর মনের কোনে একটা দ্বন্দ্ব, একটা চিন্তা উঁকিঝুঁকি দিতে শুরু করল, তিনি ভাবতে লাগলেন, সমাজের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত পারবেন তো অন্তঃপুর থেকে মেযেদের বাইরে জগতে বার করে আনতে? সফল হবে তো তাঁদের এমন ‘কঠিন’ স্বপ্ন ? মনে মনে এই চিন্তা চলতে চলতেই একদিন বন্ধু-বান্ধব নিয়ে বৈঠক বসালেন রাম গোপাল ঘোষ মহাশয়। সেদিনের সেই সভার মূল আলোচ্য ছিল, কলকাতায় বেথুন সাহেবের ইচ্ছের মর্যাদা দিয়ে মেয়েদের জন্য একটি স্কুল তৈরি করা। সেই সভায় সেদিন উপস্থিত ছিলেন সেই সময়কার অন্যতম পরিবর্তপন্থী, আধুনিক ভাবনার অন্যতম ব্যক্তিত্ব দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়। সেই সভাতে মদনমোহন তর্কালঙ্কারও উপস্থিত ছিলেন। কলকাতায় মেয়েদের স্কুল তৈরির প্রস্তাব শুনেই এক কথায় সবাই উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। সবার আগে যিনি এগিয়ে এলেন, তিনি দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়। কলকাতায় মেয়েদের স্কুল তৈরির জন্য এক কথায় নিজের বাড়ি, লাইব্রেরি সব ছেড়ে দিতে রাজি হয়ে গেলেন তিনি। বৈঠকে শেষ পর্যন্ত ঠিক হল কলকাতায় মেয়েদের স্কুল হবে।

সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়েরা আবার স্কুলে যাবে? এটা তখন কেউ ভাবতেই পারতেন না। মেয়েরা স্কুলে যাবে শুনলেই ‘গেল গেল’ রব উঠত। আর এই ‘গেল গেল’ রবের মধ্যেই তৈরি হল কলকাতার প্রথম মেয়েদের স্কুল—‘বেথুন স্কুল’। সময়ের বিচারে এই বেথুন স্কুল হয়তো কলকাতার প্রথম মেয়েদের স্কুল ছিল না। তবে বেথুন স্কুলের মুক্ত ভাবনা, বাংলা শিক্ষার ব্যবস্থাপনা, স্কুলের জনপ্রিয়তা, প্রচার, রক্ষণশীল ও সম্ভ্রান্ত সমাজে এই স্কুলের গ্রহণযোগ্যতা- সবে মিলে বেথুন স্কুলই সেই অর্থে কলকাতার প্রথম মেয়েদের স্কুল হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করল।
বেথুন স্কুল সৃষ্টির ইতিহাস তৎকালীন বঙ্গসমাজের প্রতিচ্ছবিটিকে যেন চোখের সামনে তুলে ধরে। কলকাতায় মেয়েদের স্কুল হবে শুনে প্রথমেই দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায় বললেন, সুকিয়া স্ট্রীটে আমার বৈঠকখানা আছে। এক পয়সা ভাড়া লাগবে না, এই বাড়িতেই শুরু হোক স্কুলের ক্লাস। সত্যিই সত্যিই দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের বৈঠকখানায় শুরু হয়ে গেল স্কুল। তবে প্রথমে এই স্কুলের নাম ছিল ‘হিন্দু ফিমেল স্কুল’। ১৮৪৯-এর ৭ মে। ২১জন ছাত্রী নিয়ে নতুন যুগের সূচনা দেখল কলকাতা। এ রকম মনে হতেই পারে, সেই যুগে, যেখানে জোড়াসাঁকোর আলোকজ্যোতি সমগ্র কলকাতাকে উদ্ভাসিত করছে, সেখানে প্রথম ছাত্রী হিসেবে নিশ্চয়ই যোগ দিয়েছেন ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা। কিন্তু না। এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেনি উদারপন্থী ঠাকুরবাড়ি। সংস্কৃতিমনস্ক এবং স্ত্রী শিক্ষায় আগ্রহী হলেও এ ক্ষেত্রে ঠাকুরবাড়ি ছিল সনাতনধর্মী। মেয়েরা ঘরে বসেই পড়তেন। প্রথমে বৈষ্ণবী, পরে মেমরা গৃহশিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হতেন। তাই কলকাতার যে আলোকজ্যোতি ঠাকুরবাড়ি থেকে এতকাল বিচ্ছুরিত হচ্ছিল তার অনেকটাই কেড়ে নিয়ে গেল মনদমোহন তর্কলঙ্কারের দুই মেয়ে, কুন্দমালা আর ভুবনমালা। এই স্কুলে মেয়েদের পড়তে যাওয়া নিয়ে মদনমোহন তর্কালঙ্কার লিখে ফেললেন, “পাখী সব করে রব, রাতি পোহাইল। কাননে কুসুমকলি, সকলি ফুটিল।”
এই লেখাতে বিষয়টা যত সহজে লিখে যেতে পারছি, সেই সময়কার বঙ্গসমাজে এই বিষয়টা প্রতিষ্ঠিত করা ততটাও সহজ কাজ ছিল না। সমাজের একটা বড়ো অংশ অন্তঃপুরবাসিনীদের বাইরে আসা দেখে প্রতিবাদ করল। এর ফলে অনেকে উৎসাহ দেখিয়েও শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে গেল। তবুও দ্রুততার সঙ্গে কলকাতা শহরের রাজপথে বেড়ে চলল বিদেশি এক সাহেবের স্বপ্নের স্কুল।

বেথুন স্কুল নিয়ে সংবাদপত্রে সেই সময় বিতর্কের ঝড় উঠেছিল। ‘সমাচার চন্দ্রিকা’ লিখল, ‘সরলমতি বালিকাদের স্কুলে পাঠানো উচিত নয়, তাতে ব্যভিচার সংগঠনের শঙ্কা আছে।’ শুধু তাই নয়, লেখা হল- কামাতুর পুরুষরা নাকি বালিকা বলে তাদের ছেড়ে দেবে না, কারণ খাদ্য-খাদক সম্বন্ধ। শোনা যায়, সেই সময় সমাজে একটা কথা খুব প্রচলিত ছিল, কেউ কেউ তখন বলতেন, “বাপ রে বাপ। মেয়েছেলেকে লেখাপড়া শেখালে আর কী রক্ষে আছে? এক ‘আন’ শিখাইয়াই রক্ষে নেই। চাল আন, ডাল আন, কাপড় আন করিয়াই অস্থির করে, অন্য অক্ষরগুলো শেখালে কী আর রক্ষে থাকবে?”
২১ জন ছাত্রী নিয়ে শুরু করলেও সমাজের বিরূপতা থেকে একটা সময় কমতে লাগল বেথুন স্কুলের ছাত্রী সংখ্যা। কমতে কমতে ২১ থেকে ছাত্রী সংখ্যা এসে দাঁড়াল সাত-এ। এদিকে সংবাদপত্রে দেদার সমালোচনা চলতে লাগল। এই পরিস্থিতিতে ঠাকুর বাড়ির কন্যাদের ডাক পড়ল। একটা দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতেই ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের ডাকা হল, যাতে সমাজের সমস্ত শ্রেণিকে এক ছাদের নীচে আনার ক্ষেত্রে একটা উদহারণ সৃষ্টি করা যায়। ধবধবে গায়ের রং নিয়ে বেণী দুলিয়ে বেথুন স্কুলে পড়তে এলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড়ো মেয়ে সৌদামিনী দেবী। কেউ কেউ বলেন, প্রথম থেকে ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা বেথুন স্কুলে পড়তে এলে একটা উদহারণ শুরু থেকেই হতে পারতো।
এসব যখন চলছে তার আগেই সুকিয়াস্ট্রীটের পাট উঠিয়ে ফেলেছে বেথুন স্কুল। মেয়েদের স্কুল তৈরির বিষয়ে বরাবরই বেথুন সাহেবের প্রধান সহকারী ছিলেন ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তাই প্রতিষ্ঠানের প্রধান সম্পাদকের পদে এলেন ঈশ্বরচন্দ্র। মির্জাপুরে নিজের জমি স্কুলের জন্য ছেড়েছিলেন দক্ষিণারঞ্জন মুখ্যোপাধ্যায়। কিন্তু সবাই বেশ ভালই বুঝল অত দূরে মেয়েদের স্কুল হলে আর একটি ছাত্রীও অবশিষ্ট থাকবে না। শেষে জমি নেওয়া হল হেদুয়ার পশ্চিম পাড়ে।

১৮৫০-এর ৬ নভেম্বর। ভিত্তি প্রস্তর স্থাপিত হল বেথুন স্কুলের। তৎকালীন গভর্নর স্যার হার্বার্ট লিটলারের স্ত্রী বেথুন সাহেবের অনুরোধে একটি অশোক গাছ পুঁতলেন। এই অশোক গাছটি ছিল নারী জাতির অগ্রগতির প্রতীক হিসাবে। ১৮৫১ সালের জুলাই মাসে দেবেন্দ্রনাথ তাঁর মেয়ে সৌদামিনকে স্কুলে ভর্তি করে ছিলেন। সমাজে দৃষ্টান্ত স্থাপন করার জন্যই তিনি এই কাজ করেছিলেন। কেননা তিনি জানতেন তাঁর দেখাদেখি অনেকেই তাঁদের বাড়ির মেয়েদের এই স্কুলে পড়তে পাঠাবেন। তাঁর অনুমান ভুল হয়নি। ধীরে ধীরে অশোক গাছের মতোই শাখা প্রশাখা ছড়াল বেথুন স্কুল।
২১ জন ছাত্রী নিয়ে শুরু হওয়া বেথুন স্কুলের বর্তমান ছাত্রী সংখ্যা ১০৪৭ জন। এই কাহিনি যিনি বলছিলেন তিনি এই স্কুলের ছাত্রী, পরবর্তী সময়ে শিক্ষিকা এবং শেষ পর্যন্ত বেথুন স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা হয়ে চলতি বছরের অক্টোবর মাসে অবসর নিয়েছেন। তাঁর নাম শাশ্বতী অধিকারী। কথায় কথায় কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। বলছিলেন, “বেথুন বাড়ি আমাদের প্রাণে শান্তি প্রদানের জায়গা। কোনও কোনও সময় আমরা কেউ অসুস্থ হলে বাড়ি থেকে যখন বলতো, আজ স্কুলে না গেলেই নয় ? আমি তখন বলতাম, বেথুন বাড়িতে গেলেই সব সেরে যাবে।”

শাশ্বতী বলছিলেন, “এই স্কুল শুরুর সময় তৎকালীন বঙ্গসমাজের অনেকেই ভেবেছিলেন, বেথুন সাহেবের স্কুল, একহাতে ইংরেজি কায়দায় পড়ালেখা হবে। সেটা হয়নি। শুরু থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাকে মর্যাদা দিয়েই এই স্কুলে পড়াশোনা চলছে। বেথুন স্কুল মানে শুধু একটা লেখা পড়া শেখার প্রতিষ্ঠান নয়। একজন মানুষের পূর্ণবিকাশের জন্য ছবি আঁকা, গান শেখা, নাটক করা, শরীরচর্চা, সংস্কৃতিচর্চা সহ সমস্ত শিক্ষাই দেওয়া হয় এখানে। কী ভাবে , কত আড়ম্বরে স্কুলে এখনও সরস্বতী পুজো হয়, সেটা যে না দেখেছেন তিনি বুঝবেন না। আমি ৩০ বছর এই স্কুলে চাকরি করলাম। তার আগে পড়েছি। এটাই আমার বাড়ি-ঘর।”
সে কালে যেমন দেবেন ঠাকুরের কন্যা সৌদামিনী বেথুন স্কুলে পড়েছিলেন, পরবর্তীকালেও সুচিত্রা মিত্র, শোভা সেন, ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায়, উষসী চক্রবর্তী সহ এমন বহু মহিলা ব্যক্তিত্ব বেথুন স্কুলে পড়েছেন যাঁরা নিজেরা সমাজে নিজেদের কাজের চিহ্ন রেখেছেন।
এখনও স্কুলের প্রাক্তনীরা স্কুলে এলে প্রাণভরে বেথুন স্কুলের প্রতিটি ধুলিকণাকে উপভোগ করে। বিশালাকার বট গাছের ঝুড়িতে হাত দিয়ে নিদের বাল্য স্মৃতি খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করে। ভালোবাসার এই স্কুল থেকে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে অবসর নিয়েছেন শাশ্বতী। তাঁর কথায়, “জীবনের বাকি দিনগুলো এই স্কুলে কাটাতে পারলেই সন্তুষ্ট হতাম। তবে আমরা নিয়মে বাঁধা পড়ে আছি, তাই একদিন স্কুল জীবন যেমন শেষ হয় তেমন চাকরির মেয়াদও শেষ হয়। কিন্তু স্মৃতি মনের গভীরে বেঁচে থাকেই।”
(এই লেখার জন্য তথ্য ও ছবি দিয়ে সহযোগিতা করেছেন শাশ্বতী অধিকারী, প্রাক্তন প্রধান শিক্ষিকা, বেথুন স্কুল)
*কলকাতা, শহরতলি বা জেলার কোনও না কোনও স্কুলের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে গর্বের ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বুনিয়াদি গল্প। এবার সেদিকেই ফিরে তাকিয়ে শুরু হল নতুন ধারাবাহিক ‘আমাদের ইস্কুল’। চোখ রাখুন প্রতি বুধবার সন্ধে ৬টায়, শুধুমাত্র বঙ্গদর্শনে।
