ব্রাহ্মসমাজ, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, জগদীশ্চন্দ্র বসু’র স্মৃতিধন্য বর্ধমান মিউনিসিপ্যাল হাইস্কুল

সাংবাদিক শিবপ্রিয় দাশগুপ্তের কলামে ‘আমাদের ইস্কুল’ – পর্ব ৪৩

র্ধমান মিউনিসিপ্যাল হাইস্কুল এই পূর্ব বর্ধমান জেলার অন্যতম সেরা স্কুল। বর্ধমান রাজবাড়ি, ব্রাহ্মসমাজ, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু-র সঙ্গে এই স্কুলের নিবিড় সম্পর্ক ছিল। স্কুলটি ছেলেদের স্কুল। স্কুলের প্রতিষ্ঠা বর্ষ পাওয়া যায় না বলে প্রতিষ্ঠা দিবস পালিত হয় না। আনুমানিক ১৮৫৫ সাল নাগাদ স্কুলটি প্রতিষ্ঠা হয়েছিল একটি প্রাইমারি স্কুল হিসাবে। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ান হত। তখন স্কুলটির নাম ছিল ব্রাহ্ম বালক বিদ্যালয়। বর্ধমানের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ভগবান চন্দ্র বসু ছিলে এই স্কুলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুর থেকে ট্রান্সফার হয়ে ভগবান চন্দ্র বসু বর্ধমানে এসেছিলেন। ফরিদপুরে যখন তিনি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন, তখন তাঁর মনে হয়েছিল, নিজের ছেলে জগদীশ চন্দ্র বসুকে একটা বাংলা মাধ্যম স্কুলে পড়া দরকার। ভগবান চন্দ্র বসু চাইতেন না তাঁর ছেলে ইংরেজি মাধ্যমে পড়ুক। তাই তিনি ফরিদপুরেও একটি বাংলা বাধ্যম স্কুল করেছিলেন, যেখানে তাঁর ছেলে জগদীশ চন্দ্র বসু পড়তেন। তারপর ভগবান চন্দ্র বসু বর্ধমানে বদলি হয়ে চলে এলেন। তখন বর্ধমানে ব্রাহ্ম সমাজের আন্দোলন চলছিল। বর্ধমানের রাজ পরিবারও ব্রাহ্ম সমাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তখন বর্ধমানের মহারাজার আর্থিক সহায়তায় ও মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সহযোগিতায় স্কুলটি স্থাপিত হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল সাধারণ পরিবারের পাশাপাশি ব্রাহ্ম সমাজের অন্তর্ভুক্ত ছেলেরাই এই স্কুলে পড়বে। জগদীশ চন্দ্র বসুও ব্রাহ্ম বালক স্কুলে কিছুদিন পড়েছিলেন।

ব্রাহ্ম বালক বিদ্যালয় ক্রমশ বর্ধমান হায়ার ইংলিশ স্কুলের রূপ নেয়। স্কুলের আর্থিক দায়দায়িত্ব ব্রাহ্ম সমাজ, বর্ধমানের রাজা বহন করতেন। মাঝে একটা ঘটনা ঘটে যায়। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বজরা নিয়ে বর্ধমানে এসে পৌঁছে ছিলেন। বর্ধমানের রাজাকে দেবেন্দ্রনাথ খবর দিয়েছিলেন, আমি এসেছি। এই খবর পাওয়ার ২ ঢেকে  দিন পরে বর্ধমানের রাজা উত্তর দিয়েছিলেন। তখন গঙ্গা হয়ে দামোদর নদে প্রবেশ করা যেত। দেবেন্দ্রনাথ আসার দু'চারদিন পরে বর্ধমানের রাজা সাড়াশব্দ দেওয়ায় দেবেন্দ্রনাথের মতো বড় জমিদারের সম্মানে লেগেছিল। তিনি বর্ধমানের রাজার এই আচরণ সহ্য করতে পারেননি। বর্ধমানের রাজার সঙ্গে দেবেন্দ্রনাথের তর্ক-বিতর্ক হয়। তার ফলে বর্ধমানের রাজা স্কুলে আর্থিক সহযোগিতা করা বঙ্গ করে দেন। তখন বর্ধমান মিউনিসিপ্যালিটি স্কুলের খরচ বহনের দায়িত্ব। তারপর ১৮৮৩  সালে স্কুলটি বর্ধমান হায়ার ইংলিশ স্কুল থেকে বর্ধমান মিউনিসিপ্যাল স্কুল হল, তখন স্কুলটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন। তারপরে ১৯২২-’২৩ সালে স্কুলটি বর্ধমান মিউনিসিপ্যাল হাই স্কুলের তকমা পেল। এই স্কুলের রেজাল্ট ক্যালকাটা গেজেটে প্রকাশ পেত। স্কুলের মিউজিয়ামে এই রেজাল্টগুলি রাখা আছে।

স্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক ডক্টর শম্ভুনাথ চক্রবর্তী জানালেন, “স্কুলের সংরক্ষিত কাগজ থেকে আমরা জানতে পারছি, ১৯১৫ সালে বর্ধমান হায়ার ইংলিশ স্কুল থেকে অবিভক্ত বাংলার এন্ট্রান্স পরীক্ষায় প্রথম হল। তার পরে ১৯৩৪ সালে বর্ধমানের মহারাজার সাহায্যার্থে স্কুলের মূল ভবন তৈরি হয়েছিল। এখনও স্কুল নিজের গৌরব সঙ্গে নিয়েই চলছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় স্কুল-এর ক্লাস বিভিন্ন জায়গায় হত, এখন যেখানে স্কুলের অবস্থান, সেখানে স্কুল হত না। কারণ তখন সৈন্যরা স্কুলের ঘরে থাকত। ক্লাস হত অন্য জায়গায়। সেই সময় স্কুলে পড়তেন সাধন মুখার্জী, বর্তমানে তিনি গ্লাসগোতে থাকেন, চিকিৎসক, এই অবস্থাটা নিজের চোখে তিনি দেখেছেন। সময়টা ১৯৪৫ সাল, তিনি ১৯৪৮ সালে পাশ করেন। ১৯৪৮ সালের পর সেনারা স্কুল ছেড়ে দেয়। ১৯৩৪ সালে তৈরি হওয়া স্কুলটির সেই পুরোনো ভবনটি অনেক সংস্কার হয়েছে। স্কুল ভবনের জমির দখল নিয়ে বর্ধমান মিউনিসিপ্যালিটির সঙ্গে স্কুল কর্তৃপক্ষের বিবাদ হয়েছিল, সেই বিবাদ আদালত পর্যন্ত গড়ায়। তারপর উভয়পক্ষের মধ্যে মৌখিক চুক্তি হয়, আদালতের বাইরে, বর্তমানে স্কুলের জমি বর্ধমান মিউনিসিপ্যালিটির দখল থেকে স্কুলের দখলে এসেছে। জমির সমস্ত কাগজপত্র দলিল এখন স্কুলের নামে।”

স্কুলের রেজাল্ট বরাবরই ভালো হয়। স্কুলে বাস্কেট বল খেলার মাঠ আছে। অল ইন্ডিয়া বাস্কেট টুর্নামেন্ট-এর অনেক খেলা এই মাঠে হয়। অধ্যাপক ডক্টর অসীম রায়, স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, তিনি ৫ লক্ষ টাকা দিয়েছিলেন, তা দিয়ে স্কুলে একটি শিশু উদ্যান হয়েছে। ভোকেশনাল ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা আছে, প্লাম্বিং, মোটর মেকানিক -এর প্রশিক্ষণ হয়। ডক্টর সাধন মুখার্জী একটি কমিউনিটি হল তৈরি করে দিয়েছেন। রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ অবনী রায় ৭ লক্ষ টাকা দিয়েছিলেন, তাতে একটি ভবন তৈরি হয়, তাতে কম্পিউটার ল্যাবরেটরি হয়েছে। তার ওপরে সরকারি অনুদানে আরও দুটি ঘর হয়েছে। বর্ধমান মিউনিসিপ্যালিটির অর্থে নতুন গেট করা হয়েছে। ৪৫ থেকে ৫০টি ক্লাস রুম আছে স্কুলে। মাল্টিজিম রয়েছে। স্মার্ট ক্লাস রুম তৈরি হয়েছে। লকডাউন-এর সময় দুই বছরে ১৬০০ ও ১৫০০ ক্লাস নেওয়া হয় এই স্মার্ট ক্লাসের মাধ্যমে। স্কুলের প্রাক্তনীদের সংগঠন “চিরন্তনী” স্কুলের বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করে। ২০১৮ সালে সেরা স্কুলের পুরস্কার পায় বর্ধমান মিউনিসিপ্যাল হাই স্কুল। রাজ্য সরকার এই পুরস্কার দেয়। জেবিএনএসটিএস-এর পরীক্ষায় ২০১৮ সালে স্কুলের ১০ জন ছাত্র ও নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন স্কুলের ১০ জন ছাত্র কৃতিত্ব লাভ করে পশ্চিমবঙ্গে। প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্ধমান মিউনিসিপ্যাল হাই স্কুল ও নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনকে যুগ্মভাবে প্রথম পুরস্কার ও সংবর্ধনা দেওয়া হয়। আর্থিক পুরস্কারও দেওয়া হয়। ২০২৩ সালে রাজ্য সরকার ভালো ফলের জন্যে রাজ্যের মধ্যে তৃতীয় সেরা স্কুলের পুরস্কার দিয়েছে বর্ধমান মিউনিকপাল হাই স্কুলকে। জেলাতেও সেরা স্কুলের পুরস্কার পেয়েছে এই স্কুল।   

 

শম্ভুনাথবাবু জানালেন, “আইআইটি, মেডিক্যাল-এ স্কুলের আমাদের স্কুলের বহু ছাত্র পড়ার সুযোগ পায়। ইঞ্জিনারিং পড়ে বহু ছাত্র। বহু ছাত্র বিজ্ঞান ছেড়ে অন্য বিষয়ে পড়তে যায় আমাদের স্কুলের উচ্চমাধ্যমিক পাশ করা ছেলেরা। স্কুলে ছাত্রদের নৈতিক, শিক্ষাগত দিকের উন্মেষ ঘটানোর জন্য কর্মশালা হয়।”

তবে স্কুলে ২০১১ সালে ১১-১২ ক্লাসে ইংলিশ মিডিয়াম চালু করা হলেও শিক্ষক দেওয়া হয়নি। ২০১৯-সালে ৫ থেকে ১০ পর্যন্ত ইংলিশ মিডিয়াম চালানোর অনুমোদন দেওয়া হয় অথচ শিক্ষক নেই, তাই ছাত্ররা ক্ষতির মুখে পড়ছে। স্কুলের প্রাথমিক বিভাগ একই প্রশাসনের অধীনে আনার প্রক্রিয়া চলছে। এই মুহূর্তে প্রাথমিক বিভাগে পড়ুয়া সংখ্যা ৩৫০ থেকে ৪০০ জন, ইংরেজি মাধ্যম আছে প্রাথমিকে। প্রাথমিকে ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষক-শিক্ষিকা সংখ্যা ৫ জন, বাংলা মাধ্যমে ১০ জন। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা ২ হাজারের মতো। মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিকে অনুমোদিত শিক্ষক সংখ্যা ৫১, শিক্ষক আছেন ৪৪ জন, শূন্য পদ আছে ৭টি। স্কুলের মিউজিয়াম ও লাইব্রেরি রয়েছে দেখার মতো। মিউজিয়ামে বহু মূল্যবান সামগ্রী রয়েছে। স্কুলে খুব ভালো খেলার মাঠ আছে। মাঠের পরিচর্যা করা হয়। ছেলেরা রাজ্যস্তরে বাস্কেট বল খেলে। ক্রিকেট খেলে কৃতিত্বের সঙ্গে। উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান, বাণিজ্য, কলা বিভাগে পড়ান হয়। তবে আবেদন করেও স্কুলে সোলার পাওয়ার ব্যবস্থা চালু হয়নি। স্কুলের বর্তমান টিচার-ইন-চার্জ অরুনাভ চক্রবর্তী। প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক ডক্টর শম্ভুনাথ চক্রবর্তী স্কুল সম্পর্কে সব তথ্য জানালেন। তিনি ২০০৮ থেকে ২০২২-এর জানুয়ারী পর্যন্ত স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তাঁর কথায়, "স্কুল আরও সরকারি সহায়তা পেলে আগামী দিনে আরও সামনের দিকে এগিয়ে যাবে বলেই আমার বিশ্বাস।"    

তথ্যসূত্র : ডক্টর শম্ভুনাথ চক্রবর্তী, প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক, বর্ধমান মিউনিসিপ্যাল হাই স্কুল
ছবি: সংগৃহীত  
*কলকাতা, শহরতলি বা জেলার কোনও না কোনও স্কুলের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে গর্বের ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বুনিয়াদি গল্প। এবার সেদিকেই ফিরে তাকিয়ে চলছে নতুন ধারাবাহিক ‘আমাদের ইস্কুল’। সমস্ত পর্ব পড়তে
এখানে ক্লিক করুন। চোখ রাখুন প্রতি বুধবার সন্ধে ৬টায়, শুধুমাত্র বঙ্গদর্শনে।

Developed by DXDasia