শতবর্ষে ঝাড়গ্রাম কুমুদ কুমারী ইনস্টিটিউশন

সাংবাদিক শিবপ্রিয় দাশগুপ্তের কলামে ‘আমাদের ইস্কুল’ – পর্ব ৪১

লতি বছরে ঝাড়গ্রাম কুমুদ কুমারী ইনস্টিটিউশন ১০০ বছরে পদার্পন করেছে। শতবর্ষ উদযাপনের প্রারম্ভিক অনুষ্ঠান বছরভর চলছে, যা শেষ হবে ২০২৪ এর জানুয়ারি মাসে। শতবর্ষের গৌরবময় ইতিহাস সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলেছে ঝাড়গ্রাম কুমুদ কুমারী ইনস্টিটিউশন। শুরুতে এই স্কুলের পরিচিতি ছিল ঝাড়গ্রাম হাই ইংলিশ স্কুল হিসেবে। তখন স্কুলটি ছিল প্রাথমিক। তারপরে ম্যাট্রিকুলেশন স্তরে উন্নীত হয়। এখন ঝাড়গ্রাম কুমুদ কুমারী উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় নামেই স্কুলটি পরিচিত।

ঝাড়গ্রাম রাজপরিবারের সঙ্গে এই স্কুলের সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। জঙ্গলে ঘেরা ঝাড়গ্রাম এলাকায় তখন শিক্ষালয়ের কোনও নামগন্ধ ছিল না। রাজা নরসিংহ মল্লদেবের শাসনকালে এই স্কুল তৈরি হয়েছিল। তাঁর মা কুমুদ কুমারী দেবীর নামেই স্কুলের নাম। তাই ঝাড়গ্রাম রাজবংশের সাফল্যের মুকুটে এই স্কুলটি একটি উল্লেখযোগ্য পালক। ১৯২৪ সালে স্কুলটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি পেয়েছিল। ১৯৫৭ সালে পায় মাধ্যমিক স্কুল হিসেবে স্বীকৃতি। উচ্চমাধ্যমিক স্কুলের স্বীকৃতি পায় তার আরও অনেক পরে, ১৯৭৬ সালে। কুমুদ কুমারী ইনস্টিটিউশনের বর্তমান প্রধান শিক্ষক বিশ্বজিৎ সেনগুপ্ত এই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র। তাই স্কুলের ইতিহাস প্রসঙ্গে তাঁর কথায় অনেক বেশি মাত্রায় ধরা পড়ল আবেগ। ২০২১ সালে তিনি ঝাড়গ্রাম কুমুদ কুমারী ইনস্টিটিউশনে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নিয়ে এসেছেন।

 

বিশ্বজিৎবাবু বলছিলেন, “এই অঞ্চলের যত স্কুল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সব কিছুই নরসিংহ মল্লদেবের সহায়তায় তৈরি হয়েছে। ১৯২৪ সালে এই স্কুলটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি পেলেও তার আগে থেকেই ইংলিশ স্কুল হিসেবে এই স্কুলটি চালু ছিল। ১৯২৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি বলে, ওই বছরকেই আমাদের স্কুলের প্রতিষ্ঠা বর্ষ হিসেবে ধরা হয়েছে। স্কুলটি প্রথমে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ছিল। তারপর ধাপে ধাপে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের স্বীকৃতি পায় যথাক্রমে ১৯৫৭ এবং ১৯৭৬ সালে।”

স্কুলে বর্তমানে একটি সর্বশিক্ষা বিল্ডিং আছে, তাতে ৮টি শ্রেণিকক্ষ, সেখানে পঞ্চম ও ষষ্ট শ্রেণীর ছাত্ররা বসে। একটা ওল্ড বিল্ডিং আছে সেখানে আছে ৬টি শ্রেণিকক্ষ। একটা বড় স্টাফ রুম আছে। তার সঙ্গে সংলগ্ন একাদশ শ্রেণীর একটা শ্রেণিকক্ষ আছে। উপরে লাইব্রেরি, স্টাডি রুম, প্রধান শিক্ষকের ঘর, অশিক্ষক কর্মচারীদের বসার ঘর আছে। আলাদা করে উচ্চমাধ্যমিক ক্লাসের জন্য আলাদা ঘর আছে। সেখানে সমস্ত ল্যাবরেটরি আছে। কম্পিউটার ল্যাবরেটরি আছে সেখানে। নিচে আরও ৫টি আলাদা বড়ো ঘর আছে। রয়েছে একটা জিম। স্কুলে পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ছাত্রদের পড়ানো হয়। শুধু একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির বাণিজ্য বিভাগে ছেলে-মেয়ে উভয় পড়ুয়ারাই পড়ে ২০২১ সাল থেকে। কারণ ঝাড়গ্রাম জেলায় মেয়েদের বাণিজ্য শাখায় পড়ার কোনও সুযোগ নেই। স্কুলের ৬ একর জমি। বিশাল বড়ো মাঠ। স্কুল ছাড়াও অন্যরা মাঠ ব্যবহার করে।

প্রধান শিক্ষক জানান, “আমার ছাত্ররা প্রতি বছর মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে ১ থেকে ১০-এর মধ্যে স্থান পায়। এবারও মাধ্যমিকে ১০ স্থান পেয়েছে। ২ হাজারের বেশি পড়ুয়া। ৩৬ জন শিক্ষক, ৬টি পদ ফাঁকা আছে।”

স্কুলে ১০০ বছরের উদযাপন অনুষ্ঠান শুরু হয় ২৩ জানুয়ারি। বর্ণাঢ্য মিছিল হয়, যেখানে বহু ছাত্র অংশ নিয়েছিল। ফুটবল প্রতিযোগিতা, স্পোর্টস, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পড়ুয়াদের নাটক, বিজ্ঞান, ভূগোলের প্রদর্শনী –ইত্যাদি অনুষ্ঠান চলে ২৩ জানুয়ারি থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত। জেলাওয়ারি বিতর্ক ও ক্যুইজ প্রতিযোগিতা এখন চলছে। আগামী ২০২৪-এর ২১ থেকে ২৪ জানুয়ারি ১০০ বছর পূর্তির সমাপ্তি অনুষ্ঠান হবে বলে জানান প্রধান শিক্ষক বিশ্বজিৎ সেনগুপ্ত। তাঁর কথায়, “শুধু পড়াশোনাই নয়, আমাদের ছেলেরা খেলাধূলাতেও সমান দক্ষ। তারা ‘সুব্রত কাপ’-এর সেমি ফাইনালে পৌঁছেছিল, যদিও মেয়র্স কাপে ফাইনালে উঠে পরাজিত হয়ে যায়। এছাড়াও ‘দাদাগিরি’তে অংশগ্রহণ করেছে স্কুলের ছাত্ররা। শতবর্ষ পূর্তিতে ছাত্ররা নাটক করেছে, স্কুল স্তরের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করছে। সব দিকেই ছাত্ররা স্কুলের গৌরব বৃদ্ধির কাজ করে চলেছে। আমি এই স্কুলেরই ছাত্র, পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছি। আমার বাবা বেণুমাধব সেনগুপ্ত এই স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। আমার স্বপ্ন ছিল এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক হওয়ার। সেই স্বপ্নপূরণ হয়েছে। তবে, প্রাক্তন প্রধান শিক্ষকের চেয়ার সম্মানের সঙ্গে সরিয়ে আমি আলাদা একটি চেয়ার আমার জন্য ব্যবহার করি। আমার সাহস নেই যে প্রধান শিক্ষকের কাছে আমি পড়েছি, তাঁর চেয়ারে বসার। এমনকী প্রধান শিক্ষকের পদে চাকরি পাওয়ার পর প্রাক্তন প্রধান শিক্ষকদের কাছে মার্জনা চেয়ে এই পদ গ্রহণ করেছি। আমি বলে বোঝাতে পারবো না কতটা আবেগ নিয়ে আমি এই স্কুলে কাজ করছি। আমি স্কুলে পড়ার সময় যে সব সুবিধাগুলি পাইনি, সেটা ছাত্রদের দেওয়ার ব্যবস্থা করছি। ছাত্ররা খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে স্কুল শুরুর সময় প্রার্থনা করত। আমি ওদের জন্য একটি আচ্ছাদিত জায়গা করে দিয়েছি, এখন সেখানেই ছেলেরা প্রার্থনা করে। কারণ, দু’টি ছেলে গরমে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল প্রার্থনা করার সময়। ছাত্ররা আমার কাছে ওদের দাবিগুলি জানায়। মনীষীদের মূর্তি, নরসিংহ মল্লদেবের ব্রোঞ্জের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছি স্কুলে। ফুটবল কোচিং ক্যাম্প চালু করেছি। ঢালাই রাস্তা করেছি, হোস্টেল চালু করেছি, সেখানে এসসি/এসটি ছাত্ররা থাকে। হোস্টেলে ৫০ জন এসসি/এসটি ছাত্র থাকে, এছাড়া আরও ২০ জন থাকে যারা ফুটবল কোচিং ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নেয়। এছাড়া যদি কোনও জেনারেল ক্যাটেগরির পড়ুয়া, যাদের আর্থিক সমস্যা আছে, তারাও হোস্টেলে থাকতে পারে দরকারে।”  

এই দেশকে অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব এবং নেতা দিয়েছে এই স্কুল। তাঁদের মধ্যে অন্যতম সাংবাদিক-ভাষাবিদ নন্দগোপাল সেনগুপ্ত, সাংবাদিক তুষার মাইতি, গায়ক অংশুমান রায়, গোরা সর্বাধিকারী, ফুটবলার প্রদীপ চৌধুরী, পরিকল্পনা কমিশনের প্রাক্তন সচিব তথা প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ আইএএস নীতিশ সেনগুপ্ত, জাতিসংঘের ট্রান্সন্যাশনাল কর্পোরেশনের কমিশনের চেয়ারম্যান মুক্তিসাধন বসু, ডব্লিউবিবিএসই-এর প্রাক্তন সভাপতি দিব্যেন্দু হোতা, বিশিষ্ট শল্যচিকিৎসক – ড. সীতানাথ দে, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ – ড. দিব্যেন্দু সর্বাধিকারী প্রমুখ। এই স্কুলের প্রাক্তন দুই প্রধান শিক্ষক (রাধাশ্যাম বসু, সত্যেন্দ্র নাথ মল্লদেব) ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্বারা পুরস্কৃত হয়েছিলেন।

প্রধান শিক্ষক বিশ্বজিৎ সেনগুপ্তর ইচ্ছে, যতদিন তিনি এই স্কুলে প্রধান শিক্ষকের কাজ করবেন সেই সময়ের মধ্যে ঝাড়গ্রাম জেলার সেরা স্কুলের জায়গায় স্কুলটিকে পৌঁছে দেবেন। তবে স্কুলে আরও শ্রেণিকক্ষ প্রয়োজন। পড়ুয়ার চাপ ক্রমেই বাড়ছে। সরকারি অনুদান পেলে স্কুলে আরও ঘর তৈরি করতে পারলে সুবিধা হয় বলে জানালেন প্রধান শিক্ষক। সেই চেষ্টাও তিনি অবিরত করে চলেছেন।

তথ্য সূত্র: বিশ্বজিৎ সেনগুপ্ত, প্রধান শিক্ষক, ঝাড়গ্রাম কুমুদ কুমারী ইনস্টিটিউশন
ছবি: সংগৃহীত
*কলকাতা, শহরতলি বা জেলার কোনও না কোনও স্কুলের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে গর্বের ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বুনিয়াদি গল্প। এবার সেদিকেই ফিরে তাকিয়ে চলছে নতুন ধারাবাহিক ‘আমাদের ইস্কুল’। সমস্ত পর্ব পড়তে
এখানে ক্লিক করুন। চোখ রাখুন প্রতি বুধবার সন্ধে ৬টায়, শুধুমাত্র বঙ্গদর্শনে।

Developed by DXDasia