সাংবাদিক শিবপ্রিয় দাশগুপ্তের কলামে ‘আমাদের ইস্কুল’ – পর্ব ৪০
উত্তর ২৪ পরগনার বনগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়। এই স্কুলের অনেক কাহিনি। এখন লোকমুখে বনগাঁ স্কুল বলে প্রচলিত হলেও স্কুলের প্রবেশ দ্বারে বনগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়-ই লেখা আছে এবং এটাই স্কুলের খাতায় কলমে থাকা নাম।
বনগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে, এই স্কুলেরই ছাত্র ছিলেন কথাসাহিত্যিক-বাংলা সাহিত্যে 'অপু-দুর্গা'র শ্রষ্ঠা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রথম দিন তাঁর স্কুলে প্রবেশের ঘটনা স্মরণীয় করে রাখার জন্য, ছোটোবেলায় স্কুলের যে গেটটি দিয়ে বিভূতিভূষণ স্কুলে প্রবেশ করেছিলেন, সম্প্রতি সেই গেটটি বিভূতিভূষণের নামে নামাঙ্কিত করা হয়েছে।

স্কুলের প্রধান শিক্ষক কুণাল দে এই প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, "এই স্কুলের সঙ্গে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পর্ক নিবিড় ছিল। তাঁর জীবনের প্রথম স্কুল এই বনগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়। তিনি এই স্কুলে পড়ার জন্য এতটাই আগ্রহী ছিলেন, যে একাই চলে এসেছিলেন ভর্তি হতে। স্কুলে দুটো গেট। একটা বড়ো গেট, একটা ছোটো। ছোটো গেটটি দিয়েই বিভূতিভূষণ প্রথমদিন এই স্কুলে পা রেখেছিলেন। বছর দেড় আগে প্রায় ৩ লক্ষ টাকা স্কুল তহবিল থেকে খরচ করে আমরা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সেরা ব্যক্তির নামে ছোটো গেটটির নাম রেখেছি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রবেশ দ্বার। আমাদের গর্ব এটাই যে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম মহীরুহ, তাঁর শিক্ষা এই স্কুল থেকেই শুরু করেছিলেন। তাঁর নামের সঙ্গে আমাদের স্কুলের নাম চিরকাল জড়িয়ে থাকবে।"
বিভূতিভূষণ যখন এই স্কুলে পড়তে এসেছিলেন তখন আজকের মতো উত্তর ২৪ পরগনা-র বনগাঁর রাস্তাঘাট ভালো ছিল না। শোনা যায়, তিনি বনজঙ্গল পার হয়ে প্রায় ৮ কিলোমিটার রাস্তা পায়ে হেঁটে বনগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ে আসতেন। পড়াশোনায় ছেলেবেলা থেকেই তাঁর আগ্রহের অন্ত ছিল না। অথচ, স্কুলে ভর্তির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ তাঁর কাছে ছিল না। ভর্তির আগে নাকি বহুদিন তিনি স্কুলের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতেন। অবশেষে এক ভদ্রলোক ছোট্ট বিভূতিভূষণের এহেন কাণ্ড দেখে জানতে চাইলেন, সে কি চায়? বিভূতিভূষণের দিক থেকে উত্তর এলো, এই স্কুলে সে পড়তে চায়, স্কুলে ভর্তি হতে গেলে কোথায় যেতে হবে? পাশাপাশি সে এও জানিয়ে দেয় যে তার কাছে স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় টাকা নেই। সে তার মায়ের উপার্জিত শেষ টাকা নিয়ে স্কুলে ভর্তি হতে এসেছে। তখন ওই ভদ্রলোক বাকি টাকা দিয়ে বিভূতিভূষণকে বনগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেন। সেদিনের ওই ভদ্রলোক ছিলেন বনগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক চারুচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। ইছামতী নদীর পাড় ধরে, বনজঙ্গল পার হয়ে, পায়ে হেঁটে, বনগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়তে আসার অদম্য ইচ্ছাকে শেষ পর্যন্ত বাস্তব করেছিলেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।

১৮৬৪ সালে মিডল ইংলিশ স্কুল হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল আজকের বনগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়। ১৮৮৬ তে হায়ার ইংলিশ স্কুলের স্বীকৃতি। সার্ধ শতবর্ষ অতিক্রম করে এই স্কুল নিজেই আজ এক মহীরুহে পরিণত হয়েছে। বয়সে প্রবীণ হলেও স্কুল যেন যৌবনের উচ্ছ্বাসে পরিপূর্ণ। প্রাচীন ও নব্যের সংমিশ্রনে নতুন সাজে এখন সেজে উঠেছে বনগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়। বিদ্যালয়ে ঢোকার আগেই আপনার নজর কাড়বে সহজপাঠের চিরচেনা ছবি দিয়ে সাজানো বিদ্যালয়ের পাঁচিল। আর বিদ্যালয়ের ভিতরে আপনাকে স্বাগত জানাবেন বাংলা সাহিত্যের প্রাণপুরুষ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
বনগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তনী তথা ওই স্কুলেরই প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক দিলীপ ঘোষ বলছিলেন, "১৯০৮ সালে বিভূতিভূষণ এই স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। তখন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন চারুচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। শ্রীপল্লি বারাকপুর থেকে চাকদহ রোড ধরে প্রতিদিন হেঁটেই স্কুলে আসতেন বিভূতিভূষণ। পরে প্রধান শিক্ষক বিভূতিভূষণকে স্কুলের হস্টেলে রাখার ব্যবস্থা করে দেন। খেলাঘর মাঠে সেই হস্টেল ছিল। প্রধান শিক্ষক চারুচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ছেলেও বিভূতিভূষণের সঙ্গে একই ক্লাসে পড়তেন। ছাত্র হিসেবে খুবই ভালো ছিলেন বিভূতিভূষণ। তিনি যখন এই স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন, তখন শিক্ষাবর্ষের বেশ কিছুটা সময় পেরিয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ তিনি একেবারে জানুয়ারিতেই ভর্তি হতে পারেননি। অথচ পরীক্ষা দিয়ে পরের ক্লাসে ওঠার সময় প্রথম হয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, ১৯১৪ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষাতেও প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন বিভূতিভূষণ।"

প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিকের স্মৃতিকে ধরে রাখতে বনগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের ২৫টিরও বেশি শ্রেণিকক্ষের নামাঙ্কন বিভূতিভূষণের রচিত নানা বইয়ের নাম অনুসারে করা হয়েছে। স্কুলে রয়েছে, পথের পাঁচালি, মৌরিফুল, অভিযাত্রিক, ইছামতী নামের শ্রেণিকক্ষ। নবম শ্রেণির ছাত্রদের হাতে আঁকা বিভূতিভূষণের ১৬টি বইয়ের প্রচ্ছদ দিয়ে সাজানো শ্রেণিকক্ষের প্রবেশপথ স্বাগত জানাচ্ছে অতিথিদের। স্কুল ক্যাম্পাসেই রয়েছে বিভূতিভূষণের বিখ্যাত উপন্যাসের নাম অনুসারে সাংস্কৃতিক মঞ্চ অনুবর্তন।
বনগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের বর্তমান ছাত্র সংখ্যা ২৬০০। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিকে ১ থেকে ১০-এর মধ্যে প্রতি বছর কেউ না কেউ থাকে। প্রতি বছর ৭০ জনের মতো ষ্টার পায়। ৫৬ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা বর্তমানে কর্মরত। ১৮৬৪ সাল থেকে উত্তর ২৪ পরগনায় বনগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয় এখনও পর্যন্ত তাঁর নিজস্ব গৌরব নিয়ে এগিয়ে চলছে।
১৫৯ বছরের প্রাচীন এই স্কুল অনেক ইতিহাসকে সঙ্গী করে এগিয়ে চলেছে। সেই ইতিহাসের উজ্জ্বল রত্ন হলেন কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর মুখ উজ্জ্বল করে আজও সংবেদনশীল মানুষ তৈরির কাজ করে চলেছে বনগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়।
তথ্যসূত্র : কুণাল দে, প্রধান শিক্ষক, বনগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয় , দিলীপ ঘোষ, বনগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তনী ও প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক
ছবি: সংগৃহীত
*কলকাতা, শহরতলি বা জেলার কোনও না কোনও স্কুলের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে গর্বের ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বুনিয়াদি গল্প। এবার সেদিকেই ফিরে তাকিয়ে চলছে নতুন ধারাবাহিক ‘আমাদের ইস্কুল’। সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন। চোখ রাখুন প্রতি বুধবার সন্ধে ৬টায়, শুধুমাত্র বঙ্গদর্শনে।