গ্রাম-বাংলায় বিশ্বকাপ যেন পরব, চায়ের দোকানগুলো পাড়ার স্টেডিয়াম

সর্বত্র বিশ্বকাপ উত্তেজনা, মরশুমি ফ্যানদের ঠেক থেকে কিছু কথোপকথন

বিশ্বকাপ যেন পরব, চায়ের দোকানগুলো যেন পাড়ার স্টেডিয়াম। গ্রামের বিপুল সংখ্যক মানুষ হাড়ভাঙা খাটুনির পর ঘুমচোখে টিভির সামনে বসেন। এঁরা না থাকলে বিশ্বকাপ কি সর্বজনীন হত?

ন্টারনেট হাতে হাতে পৌঁছানোর পর খেলা দেখার ক্ষেত্রে বিপ্লব এনেছিল স্মার্টফোন। ওটিটি প্ল্যাটফর্মের দৌলতে বাসে-ট্রেনে এমনকি হাঁটতে হাঁটতেও খেলা দেখা যায়। শোয়ার ঘরে টিভি নেই? সিরিয়ালের উৎপাত? এসব সমস্যায় খেলা দেখার ব্যক্তিগত পরিসর পেয়েছে মানবজীবন। সারাবছর ক্যালেন্ডার মেনে ফুটবল দেখার লোকজনের সংখ্যা বেড়েছে। মহিলারাও এত সিরিয়াসভাবে খেলা ফলো করেন যে “তুমি মেয়ে হয়েও খেলার এত্ত খবর রাখো?’’ জাতীয় বেয়াড়া প্রশ্নগুলো হাস্যকর মনে হবে। রাত জেগে খেলা দেখা, সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনা-পর্যালোচনা-টিপ্পনি ইত্যাদি এখন বারোমাস্যার কাহিনি। এক শ্রেণির মানুষের জীবনধারণের অঙ্গ হয়ে গেছে ফুটবল।

মহা সমারোহে বিশ্বকাপ চলছে। মহল্লা সেজে উঠেছে প্রিয় ক্লাবের পতাকায়। বড়ো বড়ো হোর্ডিংয়ে রোনাল্ডো, নেইমার, মেসিরা স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছেন। পেলে-মারাদোনা-রোনালডিনহোদের ছবি মনে করিয়ে দিচ্ছে সাল ধরে বলে দিতে পারা সুখস্মৃতি। কখনও স্বপ্নভঙ্গের কান্নামাখা নক আউট ম্যাচের কষ্ট ভুলতে না পারাটা চাগাড় দিয়ে ওঠে।

‘মরশুমি ফ্যান’ কথাটা এবার একটু অন্যভাবে উঠে এসেছে। একটা দূরছাই টাইপের মনোভাব খুব ট্রেন্ডিং৷ অবশ্য তাতে ভুল কিছু নেই। মরশুমি ফ্যানরা বিশ্বকাপের একটি ম্যাচের নিরিখেই স্থির করে দিচ্ছেন ভালো-মন্দ প্লেয়ারের খতিয়ান। নিজ দায়িত্বে সার্টিফিকেট বিলোচ্ছেন। আগাগোড়া বিচার না করেই বিজ্ঞ প্রমাণের চেষ্টা সারা বছর ফুটবল নিয়ে মেতে থাকা ব্যক্তিদের পীড়া দিচ্ছে। অথচ ক্লাব ফুটবলে সংশ্লিষ্ট প্লেয়ারটির বর্ণময় সিজনের কথা জানেন না। খবর রাখার ফুরসত পাননি। তবে এটাও ঠিক ফুটবল নিয়ে তাঁদের আবেগের কমতি নেই। কারও ছোটোবেলাটা কেটেছে স্থানীয় ফুটবল টুর্নামেন্ট খেলে। কিংবা ভোরের ট্রেন ধরে কলকাতার ময়দানে খেলা দেখতে আসার মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল ফুটবলের সঙ্গে। রাতের ট্রেনে ইস্ট-মোহন আবেগ নিয়ে বাড়িফেরা। বাইচুং, অমল দত্ত কিংবা গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ নিয়ে বলতে বললে বলে যাবেন গল্পের মতো। সেই সাদাকালো টিভি, গোটা পাড়া জড়ো হওয়া, অ্যান্টেনা ঘুরিয়ে ঝিলঝিল ছবিকে বাগে আনা…।

রোজ খেলা দেখা মানুষগুলো জার্সি নম্বর দেখে মোটামুটিভাবে জেনে যান প্লেয়ারদের নাম৷ এখানেই নবী-মেহতাব-প্রদীপদের গ্রহণযোগ্যতা৷ তাঁরা অনেক সরলভাবে তথ্য তুলে দেন৷ একটু এলিট কানে তা হাস্যকর লাগে ঠিকই, কিন্তু বিপুল সংখ্যক মানুষ উপকৃত হন৷

একটু অন্যভাবে দেখলে বোঝা যাবে মরশুমি ফ্যানরাই বিশ্বকাপকে অনন্য করে তোলেন। উৎসব হয়ে ওঠে তাঁদের জুড়ে যাওয়ায়। বাংলায় গ্রামের পর গ্রাম বিশ্বকাপের উত্তাপে শীত শীত ব্যাপার উপভোগ করছেন। প্রিমিয়ার লিগ, লা লিগা, উয়েফা চ্যাম্পিয়ান্স লিগ থেকে বহদূরে বাঁচেন। বুন্দেশলিগা বা সিরি-আর নামই শোনেননি। কিন্তু বিশ্বকাপ এলে অজানা ক্ষমতা দিয়ে বিশ্ব ফুটবলের পরবে সামিল হয়ে যান। চায়ের দোকানগুলোয় যেন পাড়ার স্টেডিয়াম৷ চায়ের গ্লাস হাতে, ঘনীভূত বিড়ির ধোঁয়ার দঙ্গল আর গোলের পরিস্থিতি এলে উত্তেজনায় চেঁচিয়ে ওঠা। এটা বেসিক ব্যাপার।

ধরা যাক মানসকাকু, অর্থাৎ মানস করের চায়ের দোকান৷ প্রায় ৩০-৪০ জন ভিড় জমিয়েছেন৷ অধিকাংশই সেভাবে প্লেয়ারের নাম জানেন না৷ যিনি অল্পবিস্তর জানেন তিনি বুঝিয়ে দিচ্ছেন – এটা অমুক, ওটা তমুক। কোচ এই ছকে খেলাচ্ছেন, এদের টিমের এই প্লেয়ারকে নজরে রাখতে হবে৷ ব্যাস, লোকজন বুঝে গেল অমুক টিম মরোক্কো, তাদের অমুক নম্বর প্লেয়ার মারাত্মক। বাকি কাজটা বাংলা ধারাবিবরণী করে দেয়৷ রোজ খেলা দেখা মানুষগুলো জার্সি নম্বর দেখে মোটামুটিভাবে জেনে যান প্লেয়ারদের নাম৷ এখানেই নবী-মেহতাব-প্রদীপদের গ্রহণযোগ্যতা৷ তাঁরা অনেক সরলভাবে তথ্য তুলে দেন৷ একটু এলিট কানে তা হাস্যকর লাগে ঠিকই, কিন্তু বিপুল সংখ্যক মানুষ উপকৃত হন৷ খেলার গতিপ্রকৃতির সঙ্গে মিশে যান। ইদানীং বাংলা ধারাভাষ্যে তিনটে লাইন বললে তার মধ্যে একটি সম্পূর্ণ বাক্য ইংরেজিতে বলার প্রবণতা বেড়েছে। এই ইংরেজির বাড়বাড়ন্তের বাইরে ওই তথাকথিত ‘খেলো’ বাংলা ধারাবিবরণীই গ্রাম্য মানুষের প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার হাতেগরম উপায়। ‘কে দারিদ্র নিয়ে বড়ো ফুটবলার হয়েছেন’ — জাতীয় জীবনসংগ্রামের ইনফো-ও জুটে যায়। সেই গল্প মুখে মুখে ছড়ায়।

আর্জেন্টিনার অপ্রত্যাশিত হার। ‘একা মেসি কী করবে?’ যুক্তিতে ডিফেন্স আগলাচ্ছেন কোনও কলেজপড়ুয়া। কাগজ পড়ে তিনি বিভিন্ন টিম সম্পর্কে জেনেছেন। তাই নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে হুড়োহুড়ি। নেইমারের গড়াগড়ি নিয়ে রসিকতা।

খেলার মাঝে ভেসে আসে গালি সহযোগে টিপ্পনি — ‘আরে জাপান শুরুতে দিয়া দিছে, আর স্পেনের কুনো চ্যাংলামি চলবেনি…।’ বলে উঠলেন রাজ্জাক। পেশায় দিনমজুর। এখানে খেলা দেখে বাড়ি ফিরবেন। বাড়িতে টিভি রয়েছে, তবে তাতে সিরিয়াল চলে। বৌ-মেয়ের সঙ্গে ঝামেলায় না গিয়ে এখানে সবার সঙ্গে বসে খেলা দেখার অন্য আমেজ। ম্যাচ চলাকালীন তীব্র উত্তেজনা। রেফারির প্রতি ক্ষোভ। বল নাকি বেরিয়ে গিয়েছিল। জাপানের প্লেয়ার সেই বল ক্রস বাড়িয়েছেন। গোলও হয়েছে। কেউ বোদ্ধার মতো বলে উঠলেন — ‘রেফারি ঘুষ খাইছে।’

পাল্টা মতামতও এল — ‘তুই বেশি জানিস আর কী! অরা অত বড়ো জাইগাই রেফারি হইছে। অরা জানবেনি। ভুল দিলে চাকরি থাকবে? টিভিতে দেখে সিদ্ধান্ত লিছে।’

অর্থাৎ ভার্চুয়াল দুনিয়ায় যা যা হয় তার একটা জলজ্যান্ত আড্ডা মানস করের চায়ের দোকান।

…এর মধ্যেই টেবিলে গ্লাস রাখার শব্দ। পাঁচটা চা এসে গেছে। অর্ডারমাফিক স্পেশাল জর্দা পান। সেই পান মুখে দিয়ে নিতাই হালদার বলে উঠলেন — ‘এবার জার্মানির ঘরেই কাপ যাবে। ভুলে গেছ নাকি ব্রাজিলকে সাতটা দিয়েছিল?’

তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন ব্রাজিল ফ্যানরা। — ‘পুরানো গল্প রাখ। এক গল্প কতবার দিবে? এবার ব্রাজিলের কড়া টিম আছে। মাঠেই দেখা যাবে।’ এই ব্রাজিল ফ্যানদের অধিকাংশই প্রথম একাদশ দূরে থাক, নেইমার ছাড়া পাঁচটা প্লেয়ারের নাম বলতে পারবেন না। কিন্তু রেষারেষির জায়গায় কেউ কাউকে ছাড়ছেন না। ওই হলুদ-সবুজ জার্সির টানেই ভেসে যাচ্ছেন উন্মাদনায়। ওটাই পুঁজি। খেলা দেখতে দেখতে এবারের প্লেয়ারদের চিনবেন।

…ব্রাজিলের গোল হয়েছে। সোনালি শিবির ক্লাবের কাছে বাজি ফাটল। সবাই লাফাচ্ছে। আর্জেন্টিনার ফ্যানদের দিকে অঙ্গভঙ্গি করছে। গোল বাতিল! এবার পাল্টা শুরু করল আর্জেন্টিনার ফ্যানরা — ‘মাছটা আগে ধর। তারপর হাসবি। খেয়ে চলে গেল তো? বাজিও নষ্ট হল।’ ব্রাজিল সমর্থকদের মুখ কাঁচুমাচু।

আর্জেন্টিনার অপ্রত্যাশিত হার। ‘একা মেসি কী করবে?’ যুক্তিতে ডিফেন্স আগলাচ্ছেন কোনও কলেজপড়ুয়া। কাগজ পড়ে তিনি বিভিন্ন টিম সম্পর্কে জেনেছেন। তাই নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে হুড়োহুড়ি। নেইমারের গড়াগড়ি নিয়ে রসিকতা। রসিকতার পাল্টা রসিকতাও আছে। ভেসে আসা নানান মুখরোচক কথা। ভিড়ের মধ্যে পড়লে তা তুমুল হাস্যরসের জোগান দেয়। হয়তো খেলা খুব ধীর লয়ে হচ্ছে। জ্যাঠাগোছের লোক বলে উঠলেন — ‘এদের গোল করার ইচ্ছে নেই। খেলতে এসছে না অফসাইড করতে।’ অফ ফর্মে থাকা প্লেয়ারের উদ্দেশে নানান কথা আসে। — ‘সুয়ারেজের ইয়ে ভারী হয়ে গেছে। তাই খেলতে পারছেনি।’ সেই সূত্র ধরে এল কামড়ের প্রসঙ্গ — ‘গোল না করুক, তবে যেন কামড়ে না দেয়।’ এসব…

‘এশিয়ার টিম রে’ আবেগে ভেসে যাওয়া মানুষের কথাও বলা দরকার। কোরিয়ার সাফল্যে একাত্ম হয়ে উঠছেন কেউ কেউ। — ‘আমরা তো যেতে পারবোনি। এশিয়া থেকে দুটা টিম গেল।’ সংযোজন করলেন হাতুড়ে খোকন ডাক্তার — ‘রাজনীতি করে করে সব শেষ করে দিল তো। আর খেলা হয়? ক্লাবে ক্লাবে এখন রাজনীতি।’

দোকানদার চেঁচিয়ে উঠলেন — ‘খেলা দেখছ দেখ, রাজনীতির গল্প বাইরে।’

এখানে খেলা দেখা নানান তথ্য পেশের অলিখিত প্রতিযোগিতা। এবারের বিশ্বকাপে যে বলে খেলা হচ্ছে তা নাকি চার্জ দিতে হয়, ভেতরে নাকি চিপও দেওয়া আছে। সে খবর কেউ জানাতেই বাকিরা বলে উঠলেন — ‘সবাই জানে। তুই বোধহয় আজ জানলি।’ তা নিয়ে বিস্তর হাসাহাসি। কাতারে স্টেডিয়াম তৈরিতে বহু শ্রমিকের মৃত্যুর প্রসঙ্গে কিছুটা শান্ত হল ফুটবলের আড্ডা। মনকেমনের আবহ — ‘গরিবের জীবনের কী মূল্য আছে? মরে গেলেও কী! এই যে বিশালক্ষ্মীপুর-ফটিকপুরের কত ছেলে আরবে গেছে। ফিরবে কিনা ঠিক নাই।’

…ব্রাজিলের গোল হয়েছে। সোনালি শিবির ক্লাবের কাছে বাজি ফাটল। সবাই লাফাচ্ছে। আর্জেন্টিনার ফ্যানদের দিকে অঙ্গভঙ্গি করছে। গোল বাতিল! এবার পাল্টা শুরু করল আর্জেন্টিনার ফ্যানরা — ‘মাছটা আগে ধর। তারপর হাসবি। খেয়ে চলে গেল তো? বাজিও নষ্ট হল।’ ব্রাজিল সমর্থকদের মুখ কাঁচুমাচু। যতক্ষণ না আবার গোল হচ্ছে, শান্তি নেই। কোনও টিম ভালো পারফর্ম করতে করতে হঠাৎ হেরে গেলে ভেসে আসে অমোঘ বাণী — ‘বেশি লাফাতে না বলছিলাম। ফলল তো?’ প্রবাদপ্রবচনের আলাদা মার্কেট আছে। তা যদি যথাযথ নাও হয় তাসের মতো করে কেউ একটা দান ফেলবেই — ‘ঘুটে পুড়ে, গোবর হাসে।’ অর্থাৎ আমরা আজ হেরেছি, তোরাও হারবি। এই একমাস ‘অপয়া ফ্যান’ প্রজাতিদের সাধারণত দূরে দূরে রাখা হয়। ‘কুড়ুম’-রা কাছে ঘেঁষলে ‘শ্যালক’ সম্বোধনে তাড়িয়ে দেওয়ার তাগিদ থাকে। কারণ তাদের উপস্থিতি, কিংবা একটা মন্তব্যই ম্যাচ হারিয়ে দিতে পারে। অতীতে নাকি অক্ষরে অক্ষরে ফলেছে। ‘অপয়া প্রজাতি’-রা তাদের অসামান্য প্রতিভা এবং তুকতাকে জব্দ করা বিদ্যাটা ভীষণ উপভোগ করে। দুম করে এসে বলে দিল — আজ জার্মানি হারবে। ব্যাস! হাতাহাতি শুরু।

এই একমাস মাঠের খেলায় সবাই নিজেকে নিজের মতো প্লেয়ার ভেবে নেয়। মাঠের কাণ্ডকারখানাতেও বিশ্বকাপের প্রসঙ্গ। রং পেন্সিল দিয়ে দিন্ডাদের দেওয়ালে ব্রাজিলের পতাকা গোছের আঁকার চেষ্টা করেছে তাদের ছোটো ছেলেটা। আঁকিবুঁকিতে পাশাপাশি কয়েকটা যুবকের প্রতিকৃতি।

স্মৃতির ডালি খুলে বসা কাকু-জেঠুদের আলাদা কদর। আবেগ মেশানো স্মৃতিচারণা। ‘খেলা তো আমাদের সময় হত। এ কী রোনাল্ডো? তোরা ন্যাড়া রোনাল্ডোকে দেখিসনি। অলিভার কানকে একাই কাদিয়ে দিইছিল।’

—দেখিনি বললে হবে কাকা? সব দেখেছি। কাফু ছিল। কার্লোস ছিল। রিভাল্ডো… 

দুই প্রজন্মের ঠোকাঠুকিতে ফিরে আসে ব্রাজিলের সোনালি দিন। লোকে বিদেশের ক্লাব ফুটবল জানে না। লিভারপুল, ম্যান সিটি জানে না। কিন্তু কে কত সালে বিশ্বকাপ জিতেছিল তা গুগল না করেই বলে দিতে পারবেন। …সোনার বুট এবং সোনার বল ব্যাপারটা দারুণ আলোচনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এখনও পর্যন্ত কার কটা গোল তা নিয়ে তুল্যমূল্য আলোচনা। এমবাপে, মেসি নিয়ে তুমুল ভবিষ্যৎবাণী। সোনার বুটে কি সত্যিই সোনা থাকে? তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত।

জিয়াদ আলি। মহরমে দুর্গা মন্দিরের মাঠে লাঠিখেলার অন্যতম আকর্ষণীয় মুখ। হুজুগের বশে কালেভদ্রে চলে আসেন খেলা দেখতে। ওই যেমনটা সোশ্যাল মিডিয়ায় হয়, ট্রেন্ডিং টপিকে কিছু একটা বলতেই হবে। না বললে সমাজ মেনে নেবে না। কী বলা যায়? কী বলা যায়? — ‘আচ্ছা জিদান এবার কেমন খ্যালেঠে?’

সমবেত হাসির রোল চায়ের দোকানের ধাক্কা খেয়ে এসে লাগল জিয়াদের কানে। বুঝলেন কিছু গুবলেট করে ফেলেছেন। কে যেন পাল্টা দিল — ‘তুই পনেরো বছর পিছিয়ে আছিস। ভাগ!’

বিশ্বকাপের নক আউটে আসতে আসতে লোকজন গাভিকে চিনে গেছে। গাভি যে গরু, তা নিয়ে একপ্রস্ত হাসিঠাট্টা হয়েছে। বাঙালির কাছে উদ্ভট নাম হলে তা নিয়ে মজার ধারা অনেক আগে থেকেই চলে আসছে। ডি মারিয়া যে ‘মারিয়া দিলেন’ সেটাও আলোচনার বিষয়। এখানে ইঙ্গিত কোন দিকে তা সচেতন পাঠক মাত্রই বুঝবেন। গোলকিপার এখানে ‘গোলি’, ডিফেন্ডার ‘ব্যাকি’, পেনাল্টি ‘প্লানটিক’, কর্ণার ‘কর্নাট’, খুব সাজানো গোছানো খেলা আসলে ‘ছকের খেলা।’ এছাড়া নানাবিধ গ্রাম্য শব্দবন্ধ খেলা দেখার নিজস্ব পরিভাষা তৈরি করে।

মানস-পল্লব-প্রদীপদের বদান্যতায় আবুবকরের নাম জেনে গেছে জনগণ। সেই ভিনসেন্ট আবুবকরের প্রভাব গিয়ে পড়ল এলাকার আবুবকরের উপর। — ‘আরে আবুদা, তুমি তো গোল দিয়ে ব্রাজিলকে হারিয়ে দিলে। এত ভালো খেলো, মাঠে আসো না কেন?’ আবুবক্কর নির্বিকার। ক্যামেরুনের আবুবকরের খবর বাংলার অজ গাঁয়ের আবুবক্কর জানেন না। রুটি-রুজি-সংসারই তার খেলার জায়গা। ফুটবল নিয়ে ভাবার ইচ্ছে-আগ্রহ-পরিস্থিতি কিছুই নেই। বোকার মতো একবার হাসলেন।

এই একমাস মাঠের খেলায় সবাই নিজেকে নিজের মতো প্লেয়ার ভেবে নেয়। মাঠের কাণ্ডকারখানাতেও বিশ্বকাপের প্রসঙ্গ। রং পেন্সিল দিয়ে দিন্ডাদের দেওয়ালে ব্রাজিলের পতাকা গোছের আঁকার চেষ্টা করেছে তাদের ছোটো ছেলেটা। আঁকিবুঁকিতে পাশাপাশি কয়েকটা যুবকের প্রতিকৃতি। ক্লাসে বসে খাতার শেষপাতায় বা বেঞ্চে যেভাবে আঁকা হয়। সেই আবছা মুখগুলোয় জীবন্ত হয়ে আছেন নেইমার, রিচার্লিসন, ক্যাসিমেরোরা। তা উদ্ধার করতে গেলে উপযুক্ত ফুটবলপ্রিয় হৃদয় লাগবে।

বিশ্বকাপ শেষ হবে। ট্রফি নিয়ে নিজ দেশে ফিরবেন প্রিয় টিমের প্লেয়াররা। পাড়ায় পাড়ায় খুশির আমেজ। খাওয়াদাওয়া, মিষ্টি বিতরণ। সেদিন একসঙ্গে পাত পেড়ে খাবেন। ব্রাজিল-জার্মানি-আর্জেন্টিনার ভেদাভেদ নেই। একসময় ফুটবল উৎসবের রেস কাটবে। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষরা বিশ্ব ফুটবল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেন। খুব জোর হলে আইএসএল কিংবা ইস্ট-এটিকেএম্বি ডার্বিতে কেউ কেউ টিভির সামনে বসবেন। চায়ের দোকানে আলোচনা করবেন। তবে তা বিশ্বকাপের মতো বৃহৎ এবং সর্বাত্মক নয়। আবার বিশ্বকাপ এলে চার বছর পর ঘুম থেকে জেগে উঠবেন। অনেকটা সেই আন্ডারটেকারের কফিন জেগে ওঠার মতো। নতুন প্লেয়ারদের চিনবেন ধারাবিবরণী শুনে, খবরের কাগজের পাতা খুঁটে। মরশুমি ফ্যান? হ্যাঁ, মরশুমি ফ্যানই তো। রোনাল্ডো কোন ক্লাবে কত মিলিয়নে যাবেন, পিএসজির কী হবে, তাঁরা জানবেন না। জানবেন না হ্যারি কেন কোন ক্লাবে খেলেন। তবু এক বিপুল সংখ্যক মানুষ, কাঁচা আবেগ, সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পর ঘুমচোখে টিভির সামনে বসা। এভাবেই মেতে থাকেন দুই বাংলার মানুষ। এঁরা না থাকলে বিশ্বকাপ সর্বজনীন হত না। এঁদের নিয়ে ঠাট্টা হতে পারে, তবে উপেক্ষা করার ক্ষমতা স্বয়ং ফুটবল দেবতার নেই।

Post Tags
Developed by DXDasia