প্রায় ১২,০০০ চেয়ার হয়ে উঠবে প্রতিষ্ঠা, ক্ষমতা আর সম্মানের প্রতীক
পুজোর বাদ্যি বেজে উঠেছে সারা বাংলা জুড়ে। আগে পুজোর ইঙ্গিত পাওয়া যেত পুজোর গান, পুজোসংখ্যা, পুজোর শপিং, আর পুজোর বিজ্ঞাপন-এ। সঙ্গে মণ্ডপ বাঁধা, প্রতিমা তৈরির শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। সেসব তো আছেই, বহুবছর তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে থিম। মণ্ডপসজ্জা, আলোকসজ্জা, প্রতিমা নির্মাণ সবেতেই। শিল্পের নান্দনিকতা, ছকভাঙা ভাবনার সঙ্গেই সেখানে থাকে সামাজিক বার্তা। তেমনই এক পুজো বোসপুকুর শীতলা মন্দির সার্বজনীন দুর্গোৎসব। ২০০১ সালে মাটির ভাঁড় দিয়ে মণ্ডপসজ্জা করে সাড়া ফেলেছিল কলকাতার অন্যতম জনপ্রিয় এই পুজো। এবারে বোসপুকুর শীতলা মন্দিরের পুজোর থিম- আয়োজন।

আরও পড়ুন: পুজোর আগে বঙ্গদর্শন.কম-এর কুমোরটুলি Walk
এবছর ৭৪তম বছর স্পর্শ করতে চলেছে এই পুজো। এবারের মণ্ডপসজ্জায় ব্যবহার করা হয়েছে চেয়ার। তবে প্লাস্টিকের নয়, আগে কোনও অনুষ্ঠান বাড়িতে যেসব লোহার চেয়ার ব্যবহৃত হতো, সেইসব চেয়ার দিয়ে সেজে উঠছে মণ্ডপ। মণ্ডপসজ্জায় রয়েছেন শিল্পী অনির্বাণ দাস। বঙ্গদর্শন.কম-কে তিনি বলেন, “চেয়ারের কিন্তু অনেকগুলি তাৎপর্য রয়েছে। আমরা যদি দেখি, অনেক চেয়ার একসঙ্গে কোনও জায়গায় জড়ো করা হয়েছে, তাহলে বুঝতে পারি সেখানে অনুষ্ঠান চলছে। আবার চেয়ার প্রতিষ্ঠান, ক্ষমতা, সম্মানের প্রতীক।” চেয়ার মানে দর্শকও। দর্শক ছাড়া কোনও শিল্পীর অনুষ্ঠান পূর্ণতা পায় না। আবার চেয়ারের অর্থ যেখানে প্রতিপত্তি, সেখানেও অনেক সহযোগী মানুষ থাকেন সেই চেয়ারকে ধরে রাখতে বা আরও উঁচুতে তুলে ধরতে। সেইসমস্ত সামাজিক দিক নিজের শিল্পের মাধ্যমে তুলে ধরছেন অনির্বাণ। তিনি লোহার চেয়ার ব্যবহার করার কারণ হিসাবে বলেন, “লোহা সবসময়ই কোনও না কোনও কাজে লাগে। আর এই চেয়ারগুলি এখন আর ব্যবহার করা হয় না। ফলে পুজোর পর এই লোহা অন্য কাজেও লাগানো যেতে পারে।” অর্থাৎ শুধু উৎসবের আয়োজনই নয়, সেই আয়োজনে শিল্পী ভুলে জাননি পরিবেশ সচেতনতার পাঠ।

একসঙ্গে অনেকে মিলে সার্থক হয় একটি অনুষ্ঠান। সেই আয়োজনে প্রত্যেকের জন্য বরাদ্দ থাকে আসন (এক্ষেত্রে চেয়ার)। এই পুরো ব্যাপারটি ফুটিয়ে তুলতে শিল্পী ব্যবহার করছেন আরও একটি প্রতীক। অনেকগুলি প্রতীকী আবক্ষ মূর্তি। যাদেরকে বসানো থাকবে সারা মণ্ডপজুড়ে, চেয়ারের উপর। আর মণ্ডপের ঠিক মাঝখানে থাকবে দুর্গাপ্রতিমা, একটি সুদৃশ্য সিংহাসনের উপর। সিংহাসনটিতে থাকবে মুঘল আমলের কারুকার্যের ছোঁয়া। সিংহাসনটির ডিজাইনও শিল্পী নিজেই করেছেন।
দর্শকদের জন্য থাকছে অন্য চমকও। হাতে বানানো আলোয় সাজানো হচ্ছে মণ্ডপ। আলোগুলিও নড়াচড়া করবে। কখনও দশটা আলো জ্বলবে, তো কখনও পঞ্চাশটা। অনির্বাণ আরও জানান, “মণ্ডপের একটি অংশ লিফটের মতন ওঠানামা করবে। মণ্ডপের ঠিক মাঝের অংশে প্রতিমার উপরে একটি বড়ো সিংহাসন ঘুরবে। আর প্রতিমার দু’দিক থেকে দুটি অংশ স্লাইডিং দরজার মতন নড়াচড়া করবে ট্রলির উপর দিয়ে।” দেখা গেল ট্রলি পাতার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। জানা গেল, শিল্পী, সহকারী, আলোকসজ্জা শিল্পী মিলিয়ে ৭০ জন কাজ করছেন এখানে।

৮০ ফুট লম্বা, ৭০ ফুট চওড়া আর ৬০ ফুট উচ্চতার এই মণ্ডপে রানির বেশে বসবে দুর্গাপ্রতিমা, আর তার চারিদিকে চেয়ার অর্থাৎ আসন, যা একসঙ্গে মিলে গেলে উৎসবের আলো জ্বলে ওঠে ঘরে ঘরে। প্রতিমা তৈরিতে অনির্বাণের সঙ্গে সহযোগিতায় রয়েছেন অভিষেক ভট্টাচার্য।

আয়োজন মানে অতিথি বা দর্শক, দর্শক বা অতিথি মানে একটি সার্থক আয়োজন। উৎসবের মরশুমে তেমন একটি সার্থক আয়োজনের উদ্দেশ্যে, দর্শনার্থীদের জন্য আসন পাতছে বোসপুকুর শীতলা মন্দির দুর্গোৎসবের মণ্ডপ। এখন চলছে সেই মঞ্চ সাজিয়ে তোলার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। পঞ্চমীর দিন দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হবে মণ্ডপটি।