‘হোম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ বা অন্তর্বিশ্ব : অমর্ত্য সেনের ঘরবাড়ির দুনিয়া

অমর্ত্য সেনের ‘হোম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’-এর পাঠ প্রতিক্রিয়া

“একটা নতুন জায়গায় যাচ্ছি— ব্রিটেনে, কেমব্রিজে— সেই উত্তেজনার সঙ্গে মিশে গিয়েছিল দেশ ছেড়ে যাওয়ার বিষাদ, যে দেশের সঙ্গে আমার নাড়ির টান।” — কথাগুলো লিখছেন অমর্ত্য সেন, তাঁর স্মৃতিকথাধর্মী গ্রন্থ হোম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড-এ। অমর্ত্যই সেই পথিক যিনি এই মহাবিশ্বের পথ ধরে হেঁটেছেন খানিক রাজার মেজাজে। লক্ষ লক্ষ মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন। কোনটা আসলে বাড়ি আর কোনটা বহির্বিশ্ব, তার হালহকিকত ডানা মেলেছে তাঁর ঝরঝরে স্মৃতিতে, লেখায়।

শিক্ষায় তাঁর জুড়ি মেলা ভার। তাঁর নাম শোনেননি এমন মানুষ বিশ্বে খুব কমই আছে। কারণ অমর্ত্যবাবুই মানব উন্নয়ন সূচকের উদ্ভাবক। তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি কিনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক না হয়েও ন্যাশনাল হিউম্যানিটিস মেডেলে ভূষিত হয়েছিলেন। কল্যাণ অর্থনীতি, সামাজিক নির্বাচন তত্ত্ব, অর্থনীতিক উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়বিচার, দুর্ভিক্ষের অর্থনৈতিক তত্ত্ব এবং উন্নয়নশীল দেশের নাগরিকদের কল্যাণে নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেনের ভূমিকা কতখানি, তা জানে বিশ্ববাসী; বিশেষত ভারত। অমর্ত্য সেনের আত্মজীবনী পড়তে পড়তে খানিক অবাক লাগে। বিস্ময় জাগে এই ভেবে যে, তিনি কতখানি মাটির মানুষ ছিলেন। আজীবন তিনি নিজেকে শিক্ষার্থী মেনেছেন। অমর্ত্য বলেছেন, “আমার জন্ম একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। সারা জীবনই আমি ঘুরে বেড়িয়েছি এক ক্যাম্পাস থেকে আরেক ক্যাম্পাসে।” – অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনই তাঁর বাড়ি, তাঁর দুনিয়া।

তিনি যতটা না বাড়িতে থেকেছেন, তার চেয়ে জীবনের অর্ধেকের বেশি সময় কাটিয়েছেন শিক্ষাঙ্গনে। একজন আদর্শ এবং সফল শিক্ষার্থীর জীবন যেমন হয় আরকি! কর্মসূত্রে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ক্যাম্পাসের সঙ্গে তাঁর জীবন জড়িয়ে গেলেও, তিনি অনুভব করেছেন শিকড়ের টান। আর সে কথা লিখেছেনও। একদিকে কেমব্রিজে যাওয়ার উত্তেজনা, আরেকদিকে দেশ ছাড়ার বিষাদ – দুইয়ে মিলে কী যেন একটা দলা পাকিয়ে আছে। যা তিনি শুধু নিজের মধ্যে রেখে দিয়েছেন।

১৯৩৩ সালে আজকের দিনে (৩ নভেম্বর) জন্মগ্রহণ করেন। অমর্ত্য, এই নামটি রেখেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অমর্ত্যর মায়ের বাবা ছিলেন আচার্য ক্ষিতিমোহন সেন। সংস্কৃত সাহিত্যের অধ্যাপক, রবীন্দ্রনাথের সহযোগী ও বিশ্বভারতীর দ্বিতীয় উপাচার্য। অমর্ত্যর বাবা আশুতোষ সেন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক। 

অমর্ত্য সেন। একদম শুরুতে ঢাকার সেন্ট জর্জ’স স্কুল। এরপর পাকাপাকিভাবে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসা। শুরু হল তাঁর জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়। পাঠভবন। তারপর প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে বিএ ডিগ্রি। কিন্তু এইসময়েই হল বিপত্তি। অমর্ত্য সেনের ক্যান্সার ধরা পড়ল। চিকিৎসকরা বলেছিলেন, আর মাত্র পাঁচ বছর বাঁচার সম্ভাবনা আছে। যদিও পরবর্তীতে চিকিৎসায় তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। চলে যান কেমব্রিজে। সেখানে ‘পিওর ইকোনমিক্স’ বিষয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে আবার বিএ ডিগ্রি পান। কেমব্রিজে গবেষণা করার সময়েই ডাক পান অধ্যাপনার জন্য। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়-এর নতুন বিভাগ অর্থনীতি। সেখানকার প্রথম অধ্যাপক এবং বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব নিলেন। বলা বাহুল্য, অমর্ত্য সেনই ছিলেন ভারতের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ (২৩ বছর) অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান।

অমর্ত্য সেন তাঁর আত্মজীবনীতে লিখছেন, “আমার পৈত্রিক বাড়ি ছিল পুরোনো ঢাকার ওয়ারি অঞ্চলে- রমনায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের কাছেই। বাবা আশুতোষ সেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমিস্ট্রি পড়াতেন। আমার জন্ম অবশ্য শান্তিনিকেতনে- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতীর ক্যাম্পাসে।”

পাঠক, আপনারা লক্ষ্য করুন তিনি লিখছেন, তাঁর জন্ম বিশ্বভারতী ক্যাম্পাসে। একজন ছাত্রের জন্ম তো শিক্ষাঙ্গনেই হবে। একথা স্বীকার করেন অমর্ত্য সেন। এখানেই তৈরি হয়ে যায় মানবিকবোধ, যুক্তি-নিষ্ঠা, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং সংস্কৃতির প্রতি রুচিবোধ। লিখছেন, “শান্তিনিকেতনে প্রধানত রবীন্দ্রনাথের স্কুলেই শিক্ষার ব্যাপারে আমার দৃষ্টিভঙ্গি প্রথম একটা রূপ লাভ করে। সেখানে ছেলে-মেয়ে একসঙ্গে পড়ত, শিক্ষার পরিবেশ ছিল অনেক উদার।”

ভাবলে অবাক লাগে, তিনি বিশ্বের প্রায় ১৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করেছেন৷ অমর্ত্য সেনের শৈশব, বড়ো হওয়া, নোবেল প্রাপ্তি, ভারতরত্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঐতিহ্যবাহী হার্ভার্ড, কেমব্রিজ, অক্সফোর্ড, লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স, যাদবপুর, ম্যাসাচুসেটস, স্ট্যানফোর্ড, ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে, কলকাতা এবং নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়। এই শিক্ষা তিনি কাজে লাগিয়েছেন আজীবন। কারণ শৈশবে তিনি দেখেছেন মিলেমিশে থাকার উদারতা। নিজেই একাধিকবার বলেছেন, প্রতিযোগিতার মনোভাব তৈরি করা বা কে কাকে টপকে যাবে সে ব্যাপারে শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দেওয়ার বদলে তাদের মনে কৌতূহল জাগিয়ে তোলাটাই ছিল শান্তিনিকেতনের শিক্ষাদানের মূল আদর্শ। পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার ব্যাপারে কখনই উৎসাহ দেওয়া হতো না।

পাশাপাশি তাঁর আত্মজীবনীতে বাংলার ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক দিকটিও অন্বেষণ করেছেন তিনি। হিন্দু-মুসলিম বিদ্বেষের নেপথ্যে রাজনৈতিক প্ররোচনার বিষয়টিকে দায়ী করেছেন। আবার ১৯৪৩ সালে বাংলার দুর্ভিক্ষের সাক্ষী ছিলেন। সেই সময় ব্রিটিশ বিরোধিতার জন্য তাঁর পরিবারের সদস্যদের কারাবরণের কথাও তুলে ধরেছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ।

একটি সঠিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে জরুরি কাজ বোধহয় তার উন্মুক্ত শিক্ষা প্রদান। ‘হোম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ – যার বাংলা করলে দাঁড়ায়, পৃথিবীর ঘর বা অন্তর্বিশ্ব। এই বই পড়লে বোঝা যায়, মাটির মানুষ ও শিকড়ের খোঁজে তিনি পৌঁছে গেছেন সমগ্র বিশ্বের বাড়িতে বাড়িতে। লেখা শেষ করি একটা প্রসঙ্গ উত্থাপন করে। বাংলাদেশ থেকে একদল তরুণ সাংবাদিক দুই দিনের জন্য শান্তিনিকেতনে বেড়াতে গিয়ে দেখা করেছিলেন অমর্ত্য সেনের বাড়ি প্রতীচীতে। নোবেলজয়ী তাঁদের বলেছিলেন, “শান্তিনিকেতন কি আর দুই দিনে হয়! শান্তিনিকেতন তো অনুভবের বিষয়।” শিকড়ের টান হয়তো এভাবেই ধ্বনিত হয় প্রতিটা যুগে। অমর্ত্য সেন বিশ্বে রাজ করেছেন, অথচ শিকড় রয়ে গেছে তাঁর অন্তঃস্থলে। এই আদর্শ ফুটে উঠুক প্রতিটা যুগের গোলাপ বাগানে। তারা লাল থেকে আরও লাল হোক। ভালোবাসা ছড়াক।

_____

হোম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড: আ মেময়ার
অমর্ত্য সেন
৮৯৯.০০

Developed by DXDasia