প্রসেনজিতের চেতনার রঙে কবিগুরুর জটা হল পরচুলা

সৌজন্যে বিশ্বজিৎ ও প্রসেনজিৎ ঘোষের ‘সিনেমা’ : আমি রবীন্দ্রনাথ

আমারই চেতনার রঙে শনের জটা হল পরচুলা
ব্যান্ডেল চার্চ উঠল বিদেশ হয়ে
আমি চোখ মেললুম ইউটিউবে
কড়কড়িয়ে পতিত হল বাজ
লেফট স্পিকারে, রাইট স্পিকারে 
স্ক্রিনের দিকে চেয়ে বললুম, ‘আমি’,
তারপর এমন বাজ পড়ল যে
মেজাজটাই চটকে গেল, 
‘রবীন্দ্রনাথ’ উচ্চারণ করা হল না।

তুমি এবার বলবে, এ তো রবি ঠাকুরের ‘আমি’ কবিতার চড়াং-চচ্চড়ি প্যারোডি! এ তো যথার্থ প্যারোডি নয়। আমি বলব, বটেই তো! প্যারোডি তো নয়। চড়াং-চচ্চড়ি, বন্ধু, তাই ইহা সিনেমার প্লট! সিনেমার নাম ‘আমি রবীন্দ্রনাথ’। নিচে ট্যাগলাইন– A BOY BECAME A POET! এবাবা, রবি একদিন কবি, কেবলই নয়, কবিগুরু অবধি হবে, সেটা ফাঁস করে দিল সিনেমার আগেই! তাহলে আর সিনেমা দেখব কেন? এত এত বাজ কড়কিয়ে, যত বাজ কালবৈশাখীতেও পড়ে না, তা পঁচিশে-বৈশাখীতে পড়িয়ে, শেষমেশ কিনা সিনেমার শুরুতেই হাঁড়ি ভেঙে দিলে হবে কী করে জনাব!

কিন্তু না! এখানেই তো শুরু। লটারির মতো প্রজাদের গয়না বিলানো দ্বারকানাথ, সেই দেখে মনে হিং লেগে গিয়ে গালে শ্রীরামকৃষ্ণঅলা দাড়ি সাঁটিয়ে পাত্র-পাত্রীর বিজ্ঞাপনের ছেঁড়া খবরকাগজ দেখেই ব্রাহ্মসমাজ বানিয়ে ফেলা দেবেন্দ্রনাথের এই টাইনি টাইনি ক্লিপিংয়ের পরই আবির্ভাব ঘটছে রবিগুরুর। বুঝি বা হরলিক্স খেয়ে ‘এপাং ওপাং ঝপাং’ খেলতে খেলতে বারান্দায় ছড়া বুনছিল খুদে রবি। কিন্তু মন কিঞ্চিৎ সোজারাস্তায় হাঁটতে গিয়েছিল, অমনি, দেখা মিলবে, ঠিক পিছনেই জানলা ঘেঁষে রংচঙে নাইটি মেলে রাখা! আর এমন এক দৃশ্যবন্ধের মধ্যে আচমকা ভয়েস ওভারে, নেপথ্য কণ্ঠ বলে ওঠে– ‘আর তাঁর পুত্র রবীন্দ্রনাথ খুঁজেছিলেন মুক্তির পথ!’ কিঞ্চিৎ পজ। তারপর, ‘কবিতার মাধ্যমে’! ওমনি স্ক্রিনে ফুটে ওঠে হাত ধরাধরি কবীন্দ্রনাথ ও তাঁর নতুন তস্য খুদে বউঠান।

গ্রটেস্ক এখানেই থামে না। ওই যে বলেছিলাম, হরলিক্স খেয়ে লাফঝাঁপ, তার দয়ায় কয়েক সেকেন্ডে হুশ করে ধেড়ে হয়ে গেলেন কবি, কবির নতুন বউঠান! তাপ্পর, ছাপ্পান্ন ইঞ্চি গাছে আড়াল হয়ে সে কী লুকোচুরি খেলা। এরপর রয়েছে ফাঁকা মাঠে লুকোচুরিও। পিছন থেকে সন্তর্পণে রবিগুরু এসে জংলা পাতা দিয়ে সুড়সুড়ি দিচ্ছেন বউঠানের কানে আর ধাপ্পা! সে এক ভয়ংকর থ্রিলার। আর এমন সময় থ্রিলার তার চূড়ান্ত আকার নিচ্ছে ধেড়ে রবীন্দ্রনাথের চরিত্রাভিনেতার পরিচয়-আলপনায়। ‘ইন্ট্রোডিউসিং প্রসেনজিৎ, অ্যাজ রবীন্দ্রনাথ’। না, বুম্বাদা নন। এ এক বৃহত্তর কম বাজেটের পোয়েনদা! সুধীপাঠক, ‘বডি শেমিং’ বলে দাগাবেন না, কিন্তু এ কেমন কাস্টিং! আপাত দন্তহীন দৃশ্যমান মুখমণ্ডলে এ কোন রবিচ্ছায়া! মাথায় লম্বা গোছের চুলে এ কেমন কপাল কামড়ে ধরা পরচুলা-বিন্যাস! সম্প্রতি ‘নেতাজি’-র মুখের সঙ্গে বুম্বাদার মুখচ্ছবি গুলিয়ে ফেলা নিয়ে যে বিতণ্ডা বেধেছিল, যেন তার স্রডিঞ্জার ক্যাট প্যারাডক্স নিয়ে হাজির আরেক প্রসেনজিৎ, রবি ঠাকুরের ভূমিকায়। এবার কোনও আগামী পোর্ট্রেটে সংশয় দেখা দিলে রক্ষে নেই!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চরিত্রে একালের প্রসেনজিৎ

কিন্তু খেলা আরও বাকি। ব্যান্ডেল চার্চকে বিদেশ বানিয়ে, বলপূর্বক বাবা দেবেন্দ্রনাথ পুত্রকে ব্রিটিশ পোশাক পরিয়ে পাঠিয়ে দিলেন। আর সে কী স্নো ফল, বাপরে বাপ। স্ক্রিনজুড়ে তুষারপাত। বজ্রপাতে কাজ যে হল না, বোঝা গেল। বটে, তা চার্চ চত্বরে কিঞ্চিৎ মর্নিংওয়াক সেরে রবি ফের ফিরে এলেন বউঠানের কাছে। আর ওমনি খুশিতে ডগমগ বউঠান, এক নম্বরে দেওয়া সিলিং ফ্যানের মতো পাক খেতে লাগলেন। ব্যাকে চলছে ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’! তা, এমন আরও অনেক ঘটমানতা, দৃশ্যায়ন চলেছে ৩ মিনিট ১৩ সেকেন্ডের দীর্ঘ ট্রেলার জুড়ে। ক্যামেরার সামনে সিগারেটের লাইটার জ্বালিয়ে চিতার দৃশ্য, স্প্রাইটের বোতল ঝাঁকিয়ে ‘Pawwri হো রহি হে’ ও মদের ফোয়ারা, কোদালের মতো বাঁশি ধরে তাতে ফুঁয়ের ইঙ্গিত, বউঠানের মৃত্যুতে শোকাহত রবি ঠাকুরের কানের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে পদ্মার পানসি এবং এমনকি অমন বিদ্যুৎহীন দিনকালে বাড়িজুড়ে ইলেকট্রিক তারের লাইন। আহা রে! ভাবি, রাজবাড়ি জুড়ে ফ্যান আর লাইট খোলাখুলি করতেই বুঝি বাজেট ফুরিয়ে গেছে!

বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির একটা ক্রান্তিকাল চলছে, বিশেষজ্ঞরা বলছেন। একটা এসপার-ওসপার অবস্থা খেলা করছে, আদৌ এর অস্তিত্ব থাকবে কি না– এমন মতামত ও চায়ের তুফানের শেষ নেই। সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে এই ট্রেলার শেয়ার করে গেল গেল রবের শেষ নেই।

বলা বাহুল্য, ৩ মিনিট ১৩ সেকেন্ডের এই দীর্ঘ দৃশ্যাত্যাচার দেখে সিনেমা হল ছোটার প্রসঙ্গ অহেতুক। একটা ক্যামেরা ঠিকঠাক চলছে, স্ক্রিনের ওপারে মানুষগুলো জ্যান্ত আছে, তারা ডায়লগ দিচ্ছে মানে তাদের মুখস্থ বিদ্যা আছে এবং বাংলা বলছে মানে বাংলাভাষী– এই ক’টি উপলব্ধি ও অনুধাবন ছাড়া আর কিছু পাওয়ার নেই। এবং, একইসঙ্গে এর সঙ্গে বাংলা সংস্কৃতিরও কোনও সরাসরি সম্পর্ক আছে বলে মনে করা সমুচিত হবে না। কারণ, ওই এসএফএক্স-অলা বজ্রপাতের শব্দ, তুষারপাত-অলা এডিট ও ব্যাখ্যাহীন কালার কারেকশন দেখে যেটা টের পাওয়া যায়, তা হল, এই ভিডিওগ্রাফি তুমুলভাবে ‘সিরিয়াল-সন্তান’। বর্তমান বাংলা সিরিয়ালের আষাঢ়ে গপ্প, তিতলির প্লেন চালিয়ে দেওয়ার ঘটনা, বারবার মরে ফিরে ফিরে আসা ও দাদা-বউদির কনস্পিরেসি থিওরি-কপচাকপচি যে ক্ষয় ও উচ্চাশা তৈরি করেছে দর্শক ও মধ্যবিত্ত মনে, সেই দর্শকাসন থেকে উঠে আসা মনন এই প্রয়াসের খেলায় নেমেছে। কোমরে গামছার জায়গায় তোয়ালে বাঁধলে কি পরিশ্রম আধুনিক হয়ে যায়?

একটু ঢুঁ মারলেই দেখা যাবে, যতগুলি শেয়ার হয়েছে সোশ্যাল মাধ্যমে এই ট্রেলারকে বাংলার অবমূল্যায়নের শিরেসংক্রান্তি ঘোষণা করে, শেয়ার করা সেই বর্গের অধিকাংশ জনের ঘরে সন্ধে হলেই সিরিয়াল চলে। যেখানে, রানি রাসমণি থেকে শুরু করে স্বামীজি, শ্রীরামকৃষ্ণ, কাদম্বিনী এবং আরও না জানি কত কী জীবনের বয়ান এপিসোডের পর এপিসোড গেলানো ও গিলতে থাকার কাজ চলে। সেখানে নেই ডকুমেন্টেশনের ঘাম, ইতিহাসের ধার ধারা হয় না সেখানে এবং সর্বোপরি চরিত্র ও চরিত্রাভিনেতার মধ্যে মুখচ্ছবি মেলানোর প্রয়াস বিন্দুমাত্র নেই। তাহলে, সিনেমা বানাতে গিয়ে একদল উচ্চাকাঙ্ক্ষী সাব-অল্টার্ন হঠাৎ সিনেমাশিল্পের কৌলীন্য নিয়ে ভাবিত হবে কোন স্পর্ধা বা স্পৃহায়?

যেখানে মেনস্ট্রিম কালচার অরিজিনালিটির ধার ধারে না, যেখানে পুঁজি ও পুঁজির টার্নওভার ছাড়া আর কোনও দায় থাকে না মাধ্যমটির প্রতি, সেখানে প্যারালাল কালচার মেনস্ট্রিম দর্শকের নিন্দেকে যে ক্যাঁচকলা দেখাবে, এ আর নতুন কী। তাই, অনুরূপভাবেই, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় বা প্রশান্ত কুমার পালের রবীন্দ্রজীবন-গবেষণা ব্যতিরেকে এই সিনেমাপ্রয়াসকে ‘বাংলা কালচারের কী হল মাইরি’ বলে বুক চাপড়ানোও অহেতুক। কারণ, ক’জন সচেতন বাঙালি প্রভাতকুমার বা প্রশান্ত কুমারকে পড়ার আবেদন রেখেছে নিজের মধ্য?

বরং, আমার চেতনার রঙে একটা স্বপ্ন দেখি। এমন দুঃসহ ট্রেলার দেখে টগবগিয়ে উঠল মেনস্ট্রিম মিডিয়া। এবং রীতিমতো ঢেলে বাজেট সাজিয়ে, নিখুঁত কাস্টিং করে রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে তাঁর জীবনস্মৃতি, ছেলেবেলা ও মরণাবধি একখান তুমুল ডকু-ড্রামা সিরিজ নামাতে তোড়জোড় লেগে পড়ল। আর তা শুরু হচ্ছে নোবেল চুরি দিয়ে! একটু বেশিই কি চেতনা রাঙিয়ে দিলাম? মাফ করবেন, আমি রবীন্দ্রনাথ নই।

ছবির ট্রেলার

Developed by DXDasia